বাংলাদেশ

অর্থনীতিতে চামড়ার ভূমিকা

ফরহাদ হোসেন

দেশের চামড়ার বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গেছে। লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র তিন শ টাকায়। এমনকি ন্যায্য দাম না পেয়ে কোরবানির পশুর ৯০০টি চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। মঙ্গলবার বিকেলে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে এমনটি ঘটে।

ছবি, প্রথম আলো।

চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ায় পুরো লাভটাই যাচ্ছে আড়তদার, ব্যবসায়ী আর ট্যানারি মালিকদের পকেটে। এদিকে উপযুক্তমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর আগে ৬ আগস্ট কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ঢাকায় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকা ছাড়া সারা দেশে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার।

তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য চামড়া। কর্মসংস্থান তৈরি ও শিল্পায়নে এ খাতের ভূমিকা পুরোনো। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী চামড়া শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও সেভাবে অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারছে না। যদিও এ খাতে বড় ধরনের সম্ভাবনা দেখছেন গবেষক, উদ্যোক্তা ও সরকার। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে চামড়ার অবদান এখন মাত্র ০.৩৫ ভাগ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রম জরিপ বলছে, ২০১৬ সালে এ খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার, যা মোট কর্মসংস্থানের ০.২২ ভাগ।

 

এ খাতের সম্ভাবনা বাড়লেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় সেই অর্থে বাড়ছে না। গেল কয়েক অর্থবছরে উল্টো পথে হাঁটছে এ শিল্প। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১১২ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ তে এসে তা বেড়ে ১২৩ কোটি ডলার হয়। তবে পরের দুই অর্থবছরে চামড়া শিল্পের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যহারে কমছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১০৮ কোটি ডলারে। গেল অর্থবছরে তা আরো কমে হয়েছে ১০২ কোটি ডলার।

 

রপ্তানিকারকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে পণ্য উৎপাদনে তাদের খরচও বাড়ছে। চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহার হওয়া লবণ ও রাসায়নিকের দাম বাড়ার কথা বলছেন তারা। তবে গেল কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমছে কাঁচা চামড়ার দাম। তাহলে উৎপাদন খরচ বাড়ার দাবি কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। ২০১৩ সালে যেখানে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা এই বছর তা প্রায় অর্ধেক কমে নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়।

প্রতি বছর কোরবানির ঈদেই সিংহভাগ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এভাবে দাম কমে যাওয়া হতাশ চামড়ার আড়তদাররা। দাম না বাড়লেও চামড়া সংগ্রহের জন্য ট্যানারি মালিকরা প্রতি বছরই ব্যাংক ঋণ পেয়ে থাকেন। এবারের কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে তাদেরকে নতুন করে সাড়ে ৫শ কোটি টাকা দেয়া হবে। যদিও আগের ঋণ তারা পরিশোধ করেননি। পুরোনো ঋণ নিয়মিত করে এবারে তারা ১ হাজার ৮শ কোটি টাকা পাবেন।

 

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আগের বছর কেনা চামড়ার দাম এখনো আড়তদারদের শোধ করেননি ট্যানারি মালিকরা। এবারের ঈদে নতুন চামড়া সংগ্রহে আড়তদাররা অর্থ কোথা থেকে পাবেন তা নিয়ে বিপাকে আছেন। সার্বিকভাবে অন্য শিল্পের মত চামড়াখাতও ঋণ নির্ভর। আবার এখাতে ঋণের প্রায় পুরোটাই খেলাপি। এখন পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকাই খেলাপি।

 

চামড়া শিল্পের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে সাভারে গড়ে ওঠেছে আধুনিক চামড়া শিল্প নগরী। হাজারীবাগের আড়াইশ কারখানার মধ্যে এখানে দেড়শ কারখানাকে স্থানান্তরিত হয়েছে। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পার করে নগরীটি গড়ে তোলা হলেও এখনো কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি চালু না হওয়া এবং কঠিন বর্জ্য খোলা আকাশের নীচে ফেলায় বুড়িগঙ্গার পর এখন দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী।

 

প্রত্যাশা ছিল সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে কারখানাগুলো উৎপাদনে গেলে রপ্তানি আয় বাড়বে। তিন বছর আগে কারখানগুলো স্থানান্তর হলেও এই সময়ে উল্টো রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সবগুলো কারখানা স্থানান্তর না হওয়ায় তার প্রভাব পড়ে থাকতে পারে। আরো ট্যানারি শিল্প গড়ে তুলতে আরেকটি চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলার কথা জানিয়েছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন-বিসিক।

 

সম্ভাবনাময় চামড়াখাত তৈরি পোশাকের মত সরকারের আনুকূল্য পেলে আরো দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে বলে মনে করে অর্থনীতিবিদ ও এ খাত সংশ্লিষ্টরা। চামড়া শিল্পের ভ্যালু এডিশন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে যে আয় হয় তার বিপরীতে এই খাতে ব্যবহার করা রাসায়নিক ছাড়া আর তেমন কিছু আমদানি হয় না। যদিও তৈরি পোশাকে ১০০ টাকা রপ্তানি হলে ৫০ টাকার বেশি চলে যায় এই খাত সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে।

 

বাংলাদেশের চামড়ার মানও অন্যান্য দেশের তুলনায় উন্নত। বিশ্লেষকরা বলছেন, চামড়া খাতের উন্নয়নে দরকার একটি শিক্ষিত উদ্যোক্তা শ্রেণী। আশির দশকে যাত্রা করে তৈরি পোশাক অর্থনীতির অন্যতম ভিত হত পেরেছে, শিক্ষিত ও স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা শ্রেণীর জন্য। অথচ ষাটের দশকে যাত্রা করা চামড়া শিল্প আগের অবস্থানেই পড়ে আছে। এর বাইরে শ্রমিকরা যাতে এ খাতে কাজে আগ্রহী হয়, সেজন্য নিরাপদ কর্মপরিশে তৈরি ও ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ফহো/তুখ/মার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LIVE

হেঁচকি ওঠার কারণ ও কমানোর উপায়
মশা তাড়াতে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা যায়
গ্রিন টির ভালো-মন্দ
পাহাড়ের ভাষা, সমতলের ভাষা