কলাম

আকাশের আত্মহত্যা ও পুরুষতান্ত্রিক তসলিমা নাসরিন

জব্বার হোসেন

নারীবাদ মানে এই নয়, যুক্তিহীনভাবে নারীর সবভালো, পুরুষের সবই মন্দ। পুরুষ মানেই বর্বর, অসভ্য, লম্পট, বদমাস। আর নারীই কেবল মহৎ-মহান। নারীবাদ বরং ন্যায্যতা, নৈতিকতার বিবেচনা, সততা, সমতা, সম্মান, অধিকারের প্রশ্নে কেউ যে কারো চেয়ে ছোট নয়, বড় নয়, মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ সকলেই সমান – আমার কাছে এমনই মনে হয়।

 

ডা. আকাশের আত্মহত্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে অনেক স্ট্যাটাস পড়ছি। ভিডিও ক্লিপ দেখছি। ইউটিউব ভরে আছে অসংখ্য ভিডিওতে। যদিও এসব ভিডিও ছড়াবার মূল কারণ বাণিজ্যিক। তবে এত শত স্ট্যাটাস, লেখা, ভিডিও’র মাঝে যার লেখাটা পড়ে ভীষণ মন খারাপ হয়েছে তিনি তসলিমা নাসরিন। মানবতাবাদী, নারীবাদী লেখক হিসেবে যার আন্তর্জাতিক পরিচিতি। যিনি নিজেও নির্যাতিত, নির্বাসিত হয়েছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রোষানলে, নারী অধিকারের পক্ষে বলবার কারণে। সম্মান করেই বলছি, সেই তাকেই মনে হচ্ছে, তিনি মানসিকভাবে আটকা পড়েছেন পুরুষতন্ত্রের জালে।

 

অনেক কম বয়সী, মাঝ বয়সী, বেশী বয়সী নারীরা বুঝে বা না বুঝে পুরুষতন্ত্রের পৃষ্টপোষকতা করেন, তসলিমা নাসরিনের অসার যুক্তিগুলোকেও তাই মনে হয়েছে। তিনি ডা. মিতুর বহুগামিতাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিতে গিয়ে, সমর্থন করতে গিয়ে, সমাজের নষ্ট, নোংরা, পরস্ত্রী নিয়ে ফস্টিনষ্টি করা পুরুষদেরই সুবিধে করে দিচ্ছেন।

 

শুধুমাত্র আকার ইঙ্গিত করবার কারণে, মৌখিকভাবে উত্ত্যক্ত করবার কারনে যখন কোন মেয়ে ‘ইভটিজড’ হয়ে আত্মহত্যা করে, তখন যেমন সেই ছেলেকে দায়ী করি, তেমনি আকাশের জীবনকে দুঃর্র্বিসহ করে তোলা মিতু- কেন আকাশের মৃত্যুর জন্য দায়ী হবে না? মিতুতো স্বীকারও করে নিয়েছে যৌন উশৃঙ্খলার কথা, বহুগামিতার কথা।

 

আমি অনেকদিন ধরে যৌনমনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছি। এসএমসি’র মনোযৌন সংকট সমাধান সেল ‘টেলি জিজ্ঞাসার ডেস্ক’ এর সঙ্গে, যৌনতার নিরীক্ষা, গবেষণা, পর্যবেক্ষনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। ফ্রয়েড এবং লাকাঁ অধ্যায়ন করছি অনেককাল, মানুষের যৌন আচরণ বুঝতে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সেক্সুয়াল ভেরিয়েশন আর সেক্সুয়াল পারভার্সনের পার্থক্য বেশ বুঝতে পারি। সেক্সুয়াল পারভার্সনের সঙ্গে প্রফেশনের কোন সম্পর্ক নেই। যৌন বিকৃতি ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব। কে ডাক্তার, কে প্রকৌশলী, কে সাংসদ, কে লেখক, কে বিজ্ঞানী, কে আইনজীবী- তাতে কি আসে যায়?

 

মিতুর রতিক্রিয়ার ধরন, যৌন আচরণ, যৌন চাহিদা, যৌন আনন্দ-সবকিছু পর্যবেক্ষন করে, দায়িত্ব নিয়েই বলছি, তিনি যৌনবিকৃত একজন মানুষ। মনে রাখতে হবে, যৌন বিকারগ্রস্থতার সঙ্গে বিবাহিত কি অবিবাহিতের কোন সম্পর্ক নেই। নারী-পুরুষের সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে সাইকিক স্ট্রাকচারের, পাভার্ট স্ট্রাকচারের, প্লেজার প্রিন্সিপালের।

 

বহু বিবাহিত নারী আছেন, পুরুষ আসেন- যৌন বিকৃত। এর একটিও আমার মনগড়া কথা নয়, ফ্রয়েড এবং লাকাঁর কথা। আমি আশা করেছিলাম, তসলিমা নাসরিন এক সময় চিকিৎসক ছিলেন, বুঝবেন। তা না করে তিনি রীতিমত আমাকে হতাশ করেছেন।

 

তসলিমা, আপনাকে মানবিক মানুষ বলে জানি। কিন্তু ডা. আকাশের মৃত্যুর যে চিত্রকল্প আপনি একেঁছেন তা বড় নিষ্ঠুর, অমানবিক। মনে হয়েছে আকাশের মৃত্যু নিয়ে আপনি বড় হেলাফেলা করছেন, খেলোভাবে দেখছেন, ছেলেখেলা করছেন, তামাশা করছেন। তা না হলে আকাশ খুব শখে, সুখে মরেছে প্রায় এমন কথা কি করে বলতে পারেন? কি করে জানেন, মৃত্যু যন্ত্রনা ভোগ করেনি আকাশ? প্রতিটি মানুষই তো জগতে বাচঁতে চায়। আপনার মত বরেণ্য, খ্যাতিমান মানুষ আর পথের ভিখেরি কারো বাচাঁর ইচ্ছেয় কি একবিন্দু পার্থক্য আছে? ঘুমিয়ে যাওয়া আর রেসপিরেটরি সিস্টেমকে প্যারালাইজড করে মৃত্যুর মুখ গহবরের দিকে যাওয়া কি কোনভাবে এক?

 

শুধু তাই নয়, আপনি বলেছেন, ধরা যাক আকাশ যৌনতায় অক্ষম বা অপারদর্শী। মেডিকেল সায়েন্সে কোন ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস ছাড়া এমনভাবে ‘ধরা যাক’, ‘মনে হয়’ প্রকারের কিছু বলবার কি কোন সুযোগ আছে? কে বলেছে আপনাকে আকাশ অক্ষম? যদি তাই হবে ২০০৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত চুটিয়ে প্রেম করে, মিতু কেন আকাশকে বিয়ে করতে গেলো?

 

যে আপনি মেয়েদের ‘যৌনবস্তু’, ‘সেক্সুয়াল অবজেক্ট’ হিসেবে দেখবার ঘোরবিরোধী, সেই আপনি পুরুষের বেলায় যখন সক্ষমতা, অক্ষমতা, পারা, না পারা, করা, না করা নিয়ে চিন্তিত তখন তো মনে হতে বাধ্য, আপনিও পুরুষদের সেক্সুয়াল অবজেক্ট হিসেবেই দেখেন, দেখতে অভ্যস্ত। কেন পুরুষকে যৌনবস্তুর বাইরে মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে আপত্তি? আপনি তৃতীয় আরেকজনকে এনে থ্রিসাম করার পরামর্শও দিয়েছেন। অথচ ইউরোপেই দেখেছি, যৌন সম্পর্ক নেই, কিন্তু ভালোবেসে একত্রবাস করছে দিনের পর দিন-অনেকেই। হ্যাঁ, শুধু ভালোবেসেই। মনে রাখতে হবে, সেক্স সবসময় সেক্সুয়ালও নয় কিন্তু।

 

বলেছেন, ‘মিতুকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করেনি আকাশ। ভালোবেসে মানুষ যেমন সহায় সম্পত্তি দিয়ে থুয়ে যায়।’ আরও বলেছেন, ‘দেনমোহরের ৩৪ লাখ টাকা শোধ না করেই মরেছে।’ ভালোবাসা কি বস্তুগত? ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ির চাবি এসব বস্তুগত সামগ্রীই কি ভালোবাসা? দেনমোহরতো একটি ধর্মীয় রীতি। যে ধর্মের প্রতি আপনার বিশ্বাস আস্থা সম্মান কোনটিই নেই বলে অনেকবার জানিয়েছেন, সেই ধর্মের শুধু ‘দেনমোহর’ রীতির উপর আপনার বিশ্বাস ও আগ্রহ, আপনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে, ভেবে দেখেছেন কি?

 

আপনি পুরুষের পতিতাগমন, ধর্ষণ, বহুগামিতার কথা বলেছেন। অস্বীকার করছি না, এসব বদ স্বভাব অনেক পুরুষে লক্ষনীয়। তবে ‘অনেক’ পুরুষতো সব পুরুষ নয়। বেশ্যালয়গমন, ধর্ষণতো নিন্দনীয়, কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষই এসব বদ স্বভাবকে, বহুগামিতাকে, বিকৃতিকে ভালো চোখে দেখে না। দেখবার সুযোগও নেই। সমাজে তো খুনও হয়, হচ্ছে। তাই বলে খুন দিয়ে কি হত্যাকে জাস্টিফাই করা যাবে? একটি অন্যায় ঘটে বলে কি আরেকটি অপরাধকে সমর্থনের কোন সুযোগ আছে। একটি অপকর্ম দিয়ে কি আরেকটি বদকর্ম জাস্টিফাই করতে হবে? তা নয় নিশ্চয়ই।

 

আকাশ তার স্ত্রীর ‘পরপুরুষের সঙ্গে রসাত্ত¡ক কথাবার্তা, অর্ধ উলঙ্গ ছবি সবই পাবলিক করেছেন’- বলে আপনার আপত্তি। নারী হোক বা পুরুষ, এসব প্রতারকের চরিত্র কি উন্মোচন করা উচিত নয়? আপনার আত্মজীবনী ‘উতল হাওয়া’, ‘ক’-তে আপনার সঙ্গে প্রতারণা করা প্রেমিকদের, স্বামীদের নষ্ট চরিত্রের কথা, বহুগামিতার কথা পাবলিক করে আপনি যদি নৈতিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তবে আকাশেরও তো প্রশংসাই পাওয়া উচিত। তবে কেন আকাশকে প্রশংসা না করে ভর্ৎসনা করছেন? প্রতারকের চেহারা উন্মোচনের সাহস, সেতো আপনার কাছ থেকেই আমরা শিখেছি।

 

আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসায়, সম্পর্কের সততায়, যৌনতার অধিকারে। একজনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন, অন্য আরেকজনকে ছুঁতে চাই না, শুতেও আমার আপত্তি। হোক সে পুরুষ, সে নারী। তাই তো হওয়া উচিত। প্রেম-কাম সবই হতে পারে, তবে তা একই সঙ্গে অনেকের সাথে হলেই তা বিকৃতি। কারো প্রতিই সেটি প্রেম নয়, টান নয়, বিকারগ্রস্থতা। বুঝতে হবে এটি তার সংখ্যাবৃদ্ধির আনন্দমাত্র। নট লাভ, লাভ মেইকিং, সেক্স গেইম। ডা. মিতু যা করেছে তা প্রতারণা, অন্যায়, অবিচার-আকাশের প্রতি। আকাশ নিজেও তার সুইসাইড নোটে লিখেছে ‘ভালো না লাগলে আলাদা হয়ে যাও, চিট করো না, মিথ্যা বলো না।’

আমাদের একটি দার্শনিক দারিদ্র রয়েছে। কোন ঘটনাকে বোধ দিয়ে বিবেচনা করি না, আতঁশ কাচেঁর নিচে ফেলি না। কেবল একপাক্ষিকভাবে কারো পক্ষ নিতে চাই। নারী বা পুরুষের। কিন্তু এই পক্ষ নিতে গিয়ে অন্যকারো সুবিধে করে দিচ্ছি কিনা, ভেবে দেখা উচিত। আপনি গুগল করতে বলেছেন, ‘মারডারাস হু কমিটেড সুইসাইড’ অথবা ‘ক্রিমিনালস হু কমিটেড সুইসাইড।’

 

আকাশ তো কোন ক্রিমিনাল ছিল না, খুনিও না, তবু তাকেই খুন হতে হলো নিজের হাতে, অন্যের অপরাধে। কী ভয়ংকর! আর সার্চ স্ট্রিং দিতে বলেছেন যেভাবে সেভাবে কিছুই প্রমানিত হয় না। আপনি সার্চ দেন, পারভার্ট রাইটার্স লিখে, দেথেন কত লেখকের নাম আসে। আপনিও লেখক, তার মানে কি আপনি পারভার্ট হয়ে যাবেন? পারভার্ট ডক্টরস লিখে সার্চ দেন। আপনিও ডাক্তার। আপনি কি পাারভার্ট? আকাশ তো খুন করে সেই অনুশোচনায় আত্মহত্যা করে নাই, সে খুনের পরিকল্পনাও করে নাই। আপনি ঢালাওভাবে তাকে খুনী বলে দিলেন, খুন করতে পারে নাই বলে সে আত্মহত্যা করেছে বলে দিলেন।

 

আকাশের জন্য আপনার এতটুকওু মায়া হয়নি, কষ্ট হয়নি, না হতেই পারে। কিন্তু আপনার জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, মায়া হচ্ছে, করুণা হচ্ছে। এই ভেবে যে, আপনি এতকাল নারীবাদের জন্য সংগ্রাম করে, এখন মিতুদের অন্যায়কে, অপরাধকে, যৌন অনাচারকে, বহুপুরুষগমনকে সমর্থন করছেন। সমাজের লম্পট,অন্যায় নারীভোগী, নারীলিপ্সু, পরস্ত্রীগামী পুরুষদের সুবিধে করে দিচ্ছেন।

 

তসলিমা নাসরিন, নিজের অজান্তেই এখন আপনি প্রচন্ড পুরুষতান্ত্রিক, আটকা পড়েছেন পুরুষতন্ত্রের জালে! ছড়াচ্ছেন যুক্তিহীন বিদ্বেষ।

 

লেখক : সম্পাদক, আজ সারাবেলা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র।

LIVE
Play
ভারত সরকার কি মিথ্যা বলছে?
ভারতকে কি হারাতে পারবে নিউজিল্যান্ড?
কতটা কঠিন হবে বাংলাদেশের সেমিফাইনাল?
রাইড শেয়ারিংয়ের অর্থনীতি