একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে খালাস পাওয়া জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম কারামুক্ত হয়ে বলেন, আমি এখন মুক্ত, আমি এখন স্বাধীন। আমি এখন স্বাধীন দেশের একজন স্বাধীন নাগরিক।
বুধবার (২৮ মে) কারামুক্তির পর রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর পর আমি আজ ছাড়া পেয়েছি। আমি এখন মুক্ত, স্বাধীন আলহামদুলিল্লাহ। আমি এখন স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আল্লাহ তৌফিক দিলে অবশ্যই বাকি জীবন আপনাদের সঙ্গেই থাকব। ইনশাল্লাহ।
মঙ্গলবার (২৭ মে) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে খালাসের আদেশ দেন।
কেরানীগঞ্জ কারাগারের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম। আদালতের খালাসের রায়ের অনুলিপি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর পর আজ (বুধবার) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে কারামুক্ত হন তিনি।
নেতৃবৃন্দদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আমি শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভালো আছি। বয়সে বার্ধক্যে উপনীত হলেও আমি চিন্তায় চেতনা এখনো যুবক।
তিনি আরও বলেন, আমি চিন্তাও করিনি আপনাদের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলবো। আমি সেরকম বক্তাও নই দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারবো। আগে জানলে বুঝলে হয়ত বক্তব্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি বা নোট নিয়ে আসতাম।
এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, ২০১৯ সালে আদালত যখন ফাঁসির হুকুম দিলেন তখন থেকেই আমি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম আল্লাহর কাছে হাজির হব। আর এটাই আমার জন্য সহজ পথ। কোনো ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই আমি সবার কাছ থেকে কিন্তু বিদায় নিয়েছিলাম। আমার কাছে যার যে আমানত ছিল দিয়ে দিয়েছি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের দিকে যখন করোনার মধ্যেই যেন আল্লাহর করুনা হলো। দেরি হতে হতে ৫/৬ বছর তো কেটে গেল। কনডেম সেলে ছিলাম। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে দুই নম্বর ফাঁসির সেলে ১০ মাস থাকার সময়। এরপর ৪ নম্বর সেলে আনা হয়। সেখানে অনেক রেস্ট্রিকশন থাকলেও ভালোই ছিলাম।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের সকাল পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল যেহেতু আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাসটা আমার জানা, যে ৫-১০-২০ হাজার মানুষ মরলেও তারা ক্ষমতা ছাড়বে না। ৫ আগস্ট সকালের দিকে প্রিজন সেল থেকে আমি তাকিয়ে দেখি যে, শাহবাগ টিএসসির দিকে অনেক লোক। আমি দেখছি ছোট একটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকে ঘুসি মারতেছে। তখন আমি বলছিলাম এই সরকার আর থাকতে পারবে না। মানুষের মধ্যে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এরপর তো সবই আপনাদের জানা। আজকে মুক্ত হলাম।
কী কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? এমন প্রশ্ন তুলে আজহারুল ইসলাম বলেন, আমার তো জমি-জমা সম্পত্তি নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। আমি আসলে ইসলামী আন্দোলন করি, এটাই অপরাধ। নিজামী, মুজাহিদ ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার পরে আমি দেড় বছর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছি। তখন পর্যন্ত আমি ভাবি নাই যে আমাকেও জেলে যেতে হবে। কিন্তু জেলে যেতে হয়, তবে তারা আটকাতে পারেনি আমি বের হয়ে আসি। এরপর আমাকে আটকানোর জন্য আবারো জেলে পাঠাতে যুদ্ধাপরাধের এই মামলা দেওয়া হয়। তবে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী বলেই এই দীর্ঘ সময়ে আমি সমস্যা বোধ করিনি।
আজহারুল ইসলাম বলেন, আমি ইসলামী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থাকার সময়ে আমি না লেখাপড়া ভালো জানা ছাত্রছিলাম, স্বাস্থ্যও ভালো ছিল না। কিন্তু আমার বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ইসলামী আন্দোলনে যুক্ত থাকলে জেল-জুলুম নির্যাতন, ফাঁসি হবেই। এটা নিয়ে তাই কখনো চিন্তা হতো না। আমার যারা সাবেক সহকর্মী কর্মী আছেন তারা সেটা জানেন।
তিনি আরও বলেন, যে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের জন্য আমাদের নিজামী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, মোল্লা ভাইদের সরাসরি ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, আরও সিনিয়র যে নেতারা সুচিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলেন, তারা নিশ্চয় শহীদের মর্যাদা পাবেন। তাদের কোনো অপরাধ ছিল না।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আমাদের মুক্তির পথ ইসলাম। দুনিয়া কিন্তু ইসলামের পথে ধাবিত হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন একটা শক্তি। যে জন্য এই আঘাত চলতেই থাকবে। তবে সব বাধা বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যাবে।
গত ১৩/১৪ বছরে এতো এতো জেল জুলুম বেআইনি ঘোষণা করেও জামায়াতের অগ্রযাত্রাকে ঠেকানো সম্ভব হয়েছে? সম্ভব হয়নি। আমাকে গ্রেপ্তারের পর কেন্দ্রীয় অফিস পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিবাদী কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছে। নেতাকর্মী বেড়েছে। এই সময় যারা ইসলামী আন্দোলনে যুক্ত হন তারা সাহসী, কিন্তু কখনো ভীতু হন না।
পড়ুন: এটিএম আজহারুল ইসলামের রায়ে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটেছে
দেখুন: জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের আপিল শুনানি দুই মাস পর
এস


