30 C
Dhaka
বুধবার, জুলাই ৬, ২০২২

মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সম্পর্কের গল্প  ‘অযান্ত্রিক’

বিশেষ সংবাদ

ছোট থেকে যখন একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম তখন একটা বাই সাইকেল উপহার পেয়ে ছিলাম। একসময় এই বাইসাইকেল হয়ে উঠলো আমার সাথী। প্রিয় বন্ধু। পড়া লেখার প্রেরণা। সন্ধার পর পড়ার টেবিলের উল্টো পাশে রেখে দিতাম। রাতেও শোয়ার ঘরের আশপাশে রাখতাম। অযান্ত্রিক চলচ্চিত্রটি দেখার পর মনে হলো আমার শৈশবের সাথে কেমন জানি মিল খুঁজে পাই। বলতে গেলে এই সিনেমার মাধ্যমে তাঁকে জানার বা চেনার সুযোগ পাই। তাই চলচ্চিত্রের শিক্ষারথী হিসেবে যে সব বিষয় বা দৃশ্য আমার ভাল লেগেছে সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

- Advertisement -

এই চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধরন, দৃশ্যায়নের কাজ, প্রতিটা চরিত্র, গল্পের অন্তনিহিত অর্থ, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা, সংগীত, চলচ্চিত্রের প্লট, আবহ সংগীত, গল্পের সঙ্গে প্রতিটি দৃশ্যের প্রয়োজনীয়তা ও পরিচালনা অসাধারণ হওয়াতে এটি একটি সফল চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকের কাছে এখনো সমাদৃত। তাই আমি এই চলচ্চিত্রকে একটি আদর্শ চলচ্চিত্র হিসেবে ধরে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিষয়ে গল্পটি বলার চেষ্টা করবো।

১৯৫৮ সালে ঋত্বিক কুমার ঘটকের মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি অযান্ত্রিক’ তৈরী হয়েছে সুবোধ ঘোষের ছোটগল্প অযান্ত্রিক থেকে। সিনেমার ইতিহাসে প্রথম সিনেমাগুলোর একটি যাতে কোন জড় বস্তুর সাথে মানুষের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। এতে বহুদিনের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা জন্মে সেটা উঠে এসেছে। গল্পে বহু পুরনো বস্তুটি একটি ফোর্ড গাড়ি। গাড়ির মালিক বিমল আদর করে গাড়ির নাম রেখেছে জগদ্দল। ক্ষেত্র বিশেষে অযান্ত্রিকে কিছু কল্পবিজ্ঞান থিম ফুটে ওঠে । আধুনিক ডিজনি সিনেমাগুলোতে গাড়ির ওপর যেভাবে প্রাণ আরোপ করা হয় সম্পূর্ণ বাস্তবতাবাদী গন্ডীর মধ্যে থেকেই ঋত্বিক ঘটক সেটি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কল্পবিজ্ঞান বা রূপকথার আবহ তৈরির জন্য তাকে ফ্যান্টাসি সিনেমার ব্যাকরণ প্রয়োগ করতে হয়নি। পোস্ট-প্রোডাকশনে ধারণকৃত বিভিন্ন শব্দ এবং ট্যাক্সির ভেঙে যাওয়া বিভিন্ন অংশের আপাত-অবাস্তব নড়াচড়ার মাধ্যমে গাড়িরও যে প্রাণ আছে তা ভাবতে বাধ্য করেছেন তিনি। 

এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণের এতো বছর পরও বিষয়বস্তুর মৌলিকতার কারণে এখনো চলচ্চিত্রটি দর্শকদের কাছে একটি প্রিয় চলচ্চিত্র।  এই চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধরন, দৃশ্যায়নের কাজ, প্রতিটা চরিত্র, গল্পের অন্তর্নিহিত অর্থ, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা, সংগীত, চলচ্চিত্রের প্লট,  গল্পের সঙ্গে প্রতিটি দৃশ্যের প্রয়োজনীয়তা ও পরিচালনা অসাধারণ হওয়াতে এটি একটি চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের কাছে এখনো সমাদৃত। আমার মতো নবীশ চলচ্চিত্রের ছাত্রের কাছেও এটি একটি মিথ।

চলচিত্রের কাহিনী:

বিমল- একজন ট্যাক্সি চালক এবং অযান্ত্রিক চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান চরিত্র। অন্যান্য সব ট্যাক্সি ড্রাইভারের হালের নতুন ট্যাক্সি গাড়ি থাকলেও বিমলের রয়েছে বেশ পুরোনো ট্যাক্সি; যার নাম ‘জগদ্দল’। শহরতলীতে বাস করা বিমলের একমাত্র সঙ্গী জগদ্দল। শুরুতেই দুই যাত্রী বিমলের গাড়িতে যাত্রার মাধ্যমে পর্দায় দেখানো হয় জগদ্দলকে। প্রায় ভাঙ্গাচোরা একটি ট্যাক্সি হচ্ছে জগদ্দল। বিমল আর তার জগদ্দলকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করে সবাই। জগদ্দলকে ঠাট্টা করে সবাই তাই ‘বুড়ি’ ডাকে; কিন্তু জগদ্দলকে বাদ দিয়ে নতুন কোন গাড়ি বিমল কিনতে চয়না। এমনকি কোন যাত্রী যদি জগদ্দলকে নিয়ে কোন কটুক্তি করে তাহলে বিমল সে যাত্রীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেন।

বিমল একবার যাত্রী হিসেবে সঙ্গী পেলো এক নব-দম্পতিকে। সেখানে নববধূকে দেখে বিমলের মুগ্ধতা তৈরি হয়।  যা দেখে জগদ্দলের ঈর্ষা তৈরী হয়। যা যন্ত্র হিসেবে বেশ আশ্চর্যজনক। পুরানো মডেলের বয়স এবং বিমলের আঘাত মানতে না পেরে জগদ্দল একসময় ভেঙ্গে পড়ে। অবশেষে, জগদ্দল চলে যায় চিরতরে কিন্তু তার হর্ণ বাজাতে থাকে একটি শিশু। পুরো চলচ্চিত্রে স্পষ্টভাবেই দেখানো হয় জগদ্দল, বিমলের কাছে শুধুমাত্র একটি গাড়ি নয় বরং এক বন্ধু,  একজন সঙ্গী।

ক্রেডিট লাইন:
পরিচালক: ঋত্বিক ঘটক
রচয়িতা সুবোধ ঘোষ (ছোটোগল্প)
ঋত্বিক ঘটক (গল্প পরিবর্ধন)
অভিনেতা: কালী বন্দ্যোপাধ্যায়
ক্রীমান দীপক
কাজল গুপ্ত
কেষ্ট মুখোপাধ্যায়
সুরকার: আলী আকবর খান
চিত্রগ্রাহক: দীনেন গুপ্ত
সম্পাদক: রমেশ যোশি
স্টুডিও: এল. বি. ফিল্মস ইন্টারন্যাশানাল
মুক্তি: ২৩ মে, ১৯৫৮
দৈর্ঘ্য: ১০৪ মিনিট
দেশ: ভারত
ভাষা: বাংলা
শ্রেষ্ঠাংশে
কালী বন্দ্যোপাধ্যায় – বিমল
গঙ্গাপদ বসু
সতীন্দ্র ভট্টাচার্য
তুলসী চক্রবর্তী
অনিল চট্টোপাধ্যায়
শ্রীমান দীপক
কাজল গুপ্ত
জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় মিস্ত্রি
কেষ্ট মুখোপাধ্যায়
সীতা মুখোপাধ্যায় বুলাকি

প্লট বিভাজন: মোট এক ঘন্টা সাঁইত্রিশ মিনিটের চলচিত্র ‘অযান্ত্রিক’- মোট পাঁচটি প্লটে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি প্লটকে একটি নামে ভাগ করে তার শুরু ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাক্রমকে লেখা হয়েছে। নিচের চার্টে অযান্ত্রিকের প্রট বিভাজন দেখানো হলোঃ

বিমল ও জগদ্দলের পর্দায় প্রবেশঃ
-ষ্টেশন থেকে যাত্রী আসে বিমলের কাছে
-বিমল পাঁড় মদ্যপ এবং জীর্ণ দশায় বসবাস করছে
-দামাদামী করে যাত্রীসহ জগদ্দলকে নিয়ে প্রথম যাত্রা
-জগদ্দলকে দেখে যাত্রীদের চোখ কপালে উঠার জোগাড়
-প্রায় ভগ্ন পুরানো শেভরোলেট জেলোপি গাড়িই জগদ্দল

দোঁহে মিলে প্রাণ সাজাইঃ
-জগদ্দলকে যাত্রী গালমন্দ করলে নামিয়ে দিচ্ছে অবলীলায়
-ফটোগ্রাফার ভাঁড়া করে বিমল ধোপ-দূরস্ত সাজে তার জগদ্দলকে নিয়ে ছবি তুলতে চায়
-মানুষ তার প্রিয় সঙ্গীদের সাথেই তার স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলে; যা বিমল চেয়েছিলো রাখতে জগদ্দলের সাথে
-তৃষ্ণার্ত জগদ্দলকে তৃপ্তি নিয়ে জল খাওয়ায় বিমল
-বিমলের নববধূঁর প্রতি মুগ্ধতা জগদ্দলকে ঈর্ষান্বিত করে; যেমনটা ঘটে প্রেমিকের অন্য নারীর প্রতি মুগ্ধতায় অভিমানী প্রেমিকার
-ঈর্ষাপরায়ন জগদ্দল দ্বিগবিদিক ছড়িয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল শুরু করে

মানবের তরে জগদ্দল ও বিমলঃ
-বিমলের ফিরতি পথে এক নারীকে অসহায়ভাবে বসে থাকতে দেখে
-কোন ভাড়া ছাড়াই ঐ নারীকে বিমল আর জগদ্দল পৌঁছে দেয় রেল ষ্টেশনে
-যাত্রা পথে যেখানেই কোন অসহায় বা দরিদ্র যাত্রী দেখতে পায় সেখান থেকেই তাদের পৌঁছে দেয় নিজেদের গন্তব্যে

জগদ্দলের অসুস্থতায় বিমলের অসহায়ত্বঃ
-জগদ্দলের প্রতি বিমলের রাগ দেখানোয় জগদ্দলের যন্ত্রাংশ ভেঙ্গে পড়তে থাকে
-এর মাধ্যমে জগদ্দলের মন ভেঙ্গে যাওয়াকেই দেখানো হয়েছে
-বিমল মনে প্রাণে খাটতে থাকে জগদ্দলকে সারিয়ে তুলতে
-প্রচুর অর্থ ব্যয় করলেও জগদ্দলকে আর সারিয়ে তুলতে পারে না বিমল

পুরাতনের বিদায়ে নতুনের যাত্রাঃ
-জগদ্দল ভেঙ্গে গেছে একেবারেই
-জগদ্দলের ভাঙ্গা যন্ত্রপাতি ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
-পুরাতনের বিদায় হচ্ছে
-জগদ্দলের হর্ণের শব্দ শুনে ছুটে যায় বিমল
-একটি শিশু হাস্যরত অবস্থায় জগদ্দলের হর্ণ বাজাতে থাকে
-স্তব্ধ বিমলের চোখে জল
-পুরাতন সরে গিয়ে নতুনের হাতে আসছে সমাজের হাল

চরিত্রাঙ্কন
অযান্ত্রিক চলচিত্রের পুরো ঘটনাক্রম আবর্তিত হয়েছে মূলত দুইটি চরিত্র নিয়ে। প্রথমটি- ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমল আর অন্যটি- তার গাড়ি জগদ্দল।

অযান্ত্রিকের মূল চরিত্র বিমল- অকৃতদার, অগোছালো এবং মদ্যপ। তার সমস্ত জগত এবং অস্তিত্ব জুড়ে রয়েছে তার ১৯২০ সালের Chevrolet jalopy মডেলের ভগ্নপ্রায় গাড়িটি। বিমলের একাকিত্ব ফুটে উঠেছিলো তার অসামাজিক মনোভাব ও জীবন যাপনের চালচিত্রের মাধ্যমে। নিঃসঙ্গ বিমলের একমাত্র সঙ্গী তার ট্যাক্সি জগদ্দল।

বিমল
মূলত বিমলের চরিত্রের মধ্য দিয়ে নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকেরই অনেকাংশে পরিচয় পাওয়া যায়। বিমল বেশ একগুঁয়ে এবং অসামাজিক। সামাজিকতার ধার খুব একটা ধারে না। অর্থলোলুপ মনোভাবও তার মধ্যে নেই। সামাজিক সম্পর্কের মানুষদের সাথে প্রায়শ উগ্র, রূক্ষ ব্যবহার দিয়ে থাকে বিমল। কিন্তু এই মানুষটিই আবার অসহায়, দলিত, প্রতারিত কিংবা নিম্নবিত্তের মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে। তার সাধ্যানুযায়ী বিমল এমন কাউকে পেলে বিনা ভাড়াতেই পৌঁছে দেন তাদের গন্তব্যে। এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সমাহার দেখা যায় বিমলের একই চরিত্রে।

জগদ্দল
আপাতদৃষ্টিতে জগদ্দল যদিও একটি যান্ত্রিক গাড়ি কিন্তু পুরো চলচিত্রে তার চরিত্র মানুষের মতই গুরুত্বপূর্ণ। জগদ্দল একটি ট্যাক্সি কিন্তু তাকে মানুষের অনুভূতির মতো উপস্থাপন করা হয়েছে অযান্ত্রিকে। তৃষ্ণার্ত জগদ্দল পানি খাবার সময় ঢোক গেলার শব্দ করে। বিমলের কোন নারীর প্রতি মুগ্ধতা জগদ্দলকে ঈর্ষান্বিত করে। ঈর্ষাকাতর জগদ্দল তার ঈর্ষার বহিঃপ্রকাশ করে ব্রেক নষ্ট করে এলোপাথারি চলাচলের মাধ্যমে।

বিমল যখনই জগদ্দলকে ভালোবেসে আদর করে কিংবা কথা বলে- তখনই সে অনুযায়ী জগদ্দল কাজ করে। জগদ্দল বিমলের জন্য অযান্ত্রিকে প্রধান সঙ্গী হিসেবে এসেছে। বিমল ভালোবেসে আদর করলে জগদ্দল প্রফুল্ল মনেই বিমলের মতো করে নিজেকে চালিয়ে নেয়।

অন্যদিকে, বিমল রেগে গিয়ে আঘাত করলে জগদ্দল অভিমানি মর্মাহত প্রেমিকার মতোই রাগে, দুঃখে মাথা হেট করে নিজেকে গুটিয়ে নেবার মতো করে সামনের লাইট দুটিকে হেলে দেয় নিচের দিকে। অপদস্থ মানুষ যেমন আর নিজেকে সামলিয়ে উঠতে পারে না সহজে তেমনি করে বিমলের এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে জগদ্দলও নিজেকে শেষ করে দেয়। নানা চেষ্টা চরিতের পরও জগদ্দল আর আগের মতো সেরে উঠতে পারে না। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয় নিজেকে; যেন নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে হলেও বেঁচে থাকবে বিমলের কাছে, নতুন প্রজন্মের মাঝে।  

অযান্ত্রিকের অডিও- ভিজ্যুয়াল উপকরণ সমূহ

অযান্ত্রিক চলচিত্র মুক্তির বয়সকাল পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেলেও তার আবেদন বরাবরই দর্শকদের কাছে একই রকম রয়ে গেছে। তার অন্যতম প্রধান কারন নির্মাণ শৈলীতে ব্যবহৃত অডিও- ভিজ্যুয়াল উপকরণগুলো বেশ প্রশংসনীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এই চলচিত্রে। নিম্নে এর উপাকরণগুলো আলোচিত হলোঃ

আলো-ছায়া
সাদাকালো চলচিত্র হওয়াতে আলো-ছায়া নিয়ে বেশ রসিয়ে খেলেছেন পরিচালক। বিমল আর্থিকভাবে অসচ্ছ্বল একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার। তার বাসস্থান এবং আশপাশের পরিবেশেও রয়েছে এর প্রকট প্রভাব। তাই যতবারই বিমলের ঘরের ভেতরকার কোন দৃশ্যপট বা ঘটনাক্রম দেখান হয়েছে ততবারই তাতে প্রকটভাবে ছিলো অন্ধকারের প্রভাব। ছায়া ও অন্ধকারের প্রভাবে দর্শকের অবচেতনেই চলে যায় বিমলের সার্বিক দুরাবস্থার পরিস্থির কথা।

অপরিচিত নারীটি যখন রেলষ্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় ছিলো তখন ক্যামেরা নারীর মুখে থাকলেও ট্রেনের উপস্থিতি বোঝা যায় যখন একে একে আলো এবং ছায়া পরপর তার মুখে এসে পড়ে আর চলে যায়। নারীটি ট্রেনে উঠে চলে গেলে দৌড়িয়েও যখন বিমল তার সাক্ষাত পেলো না তখন হাই-কি ব্যবহার করেছেন পরিচালক। হাই-কি’র মাধ্যমে বিমলের অসহায়ত্ব ও মনের নিঃসঙ্গতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন নিদারুনভাবে।

শেষ দৃশ্যে, বিমল যখন আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে শিশুটির হর্ণ বাজানো দেখছে তখন সফট আলো ফেলা হয়েছে বিমলের মুখে। সফট আলোতে বিমলের মুখের ও মনের তৃপ্তি এবং স্বর্গীয় ভাব দর্শকের মনেও ছড়িয়ে যায়। 

রঙ বিন্যাস
অযান্ত্রিক চলচিত্রটি পুরোটাই সাদাকালোতে নির্মিত; তাই এখানে অন্যান্য রঙ্গিন রঙের ব্যবহার থাকা অবাঞ্চনীয়। সাদাকালো সত্বেও বেশ প্রানবন্তভাবেই নির্মাতা ঘটনাক্রম ফুটিয়ে তুলেছেন দক্ষভাবে। জগদ্দলের রঙ কালো। বিমল যখন জগদ্দলকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে তখন জগদ্দলের চাকচিক্যভাব ফুটিয়ে তুলতে আশপাশের সাদা বেশ বাড়িয়ে তুলে জগদ্দলের কালোকে গাঢ় করে দেখানো হয়েছে। এছাড়াও যখনই জগদ্দলকে প্রধান ফোকাসে রাখা হয় তখনই সাদা-কালোর বৈপরীত্য তীব্রভাবেই ফুটে উঠে।

ফ্রেমিং
বিমল এবং জগদ্দলের অন্তরঙ্গতা বোঝাতে সাধারনত তাদের দু’জনকেই খুব ক্লোজ শর্টের ফ্রেমিং-এ দেখানো হয়েছে। বিমল যখন জগদ্দলকে আদর করে কিংবা কথা বলে তার যত্ন নেয়-তখনই খুব কাছাকাছিতে দু’জনকে রাখা হয়েছে ফ্রেমিং-এ।

অন্যদিকে, অপরিচিত নারীটির জিনিস পৌঁছে দিতে বিমল যখন বারবার জগদ্দলকে ষ্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করলেও ষ্টার্ট নিচ্ছিল না তখন বিমল রাগ করে জগদ্দলকে সজোরে লাথি মারে। বিমলের রাগ এবং জগদ্দলের অভিমান দেখাতে মিডল শর্টের ফ্রেমিং এ দুজনকে দেখান হয়। এই ফ্রেমের সাসপেন্স বোঝাতে একটু উপর থেকে ক্যামেরা ধরা হয় অনেকটা তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে এই ঘটনাকে নিজের মত করে দেখার জন্য বেশ উপযুক্ত ছিলো এই ফ্রেমিং।

বিমলের অপরিচিত নারীর সাথে শেষ বিদায় জানাতে না পারার অসহায়ত্বকে তুলে ধরতে ওয়াইড এঙ্গেলের একটি বড় ফ্রেম ব্যবহার করা হয়। যার মাধ্যমে এই বিস্তৃত পরিবেশে বিমলের অসহায়ত্ব দর্শককেও অসহায় করে দেয়। 

বুড়ি জগদ্দলের নানা যন্ত্রাংশ ঠিক করতে চেষ্টা করছে বিমল। তখন জগদ্দলের ভাঙ্গা জানালার ভিতর দিয়ে ফ্রেম ধরা হয়; যেখানে পিছনেই এসে থামে একটি নতুন ঝাঁ চকচকে সাদা ট্যাক্সি গাড়ি। চমতকার এ ফ্রেমিং এর মাধ্যমে পরিচালক দূর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন জগদ্দলের দৈণ্যতা এবং নতুন গাড়ির দৌরাত্ম্য।

শব্দ
জগদ্দলকে নিয়ে বিমল যখনই যাত্রা শুরু করে তখনই ব্যকগ্রাউন্ডে অনেকটা টপ্পার মতো করে একটি ‘টং টং টং’ শব্দ দেয়া হয়েছে। এ শব্দের মাধ্যমে একরকমের হাস্যরসের ভাবনা আসে। অর্থাৎ জগদ্দলকে নিয়ে বিমলের এ যাত্রা যে খুব দেখার মত কিছু হবে তাই এই শব্দের মধ্যে ফুটে ওঠে। মূলত, তাদের যাত্রা দৃশ্যের সঙ্গে এই শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালক দর্শককে পরবর্তী দৃশ্যে প্রবেশের জন্য এক ধরণের মানষিক প্রস্তুতি ও আগ্রহের তৈরীর চেষ্টা করেছেন; এবং ঋত্বিক ঘটক তার এ চেষ্টায় যথেষ্ট সফলও হয়েছেন। কেননা, জগদ্দলের সব যাত্রাতেই যাত্রীদের অবস্থা হয়েছিলো প্রায় নাজেহাল। এছাড়াও, চলতি পথে জগদ্দল এবং বিমলের প্রায় যুদ্ধ করেই পথ চলতে হয়েছে।

অযান্ত্রিক চলচিত্রের প্রায় পুরোটা সময়েই বিশেষত যেখানে চরিত্রদের মুখে তেমন কোন সংলাপ নেই সেখানেই তবলা, বাঁশি ও সেতারের অপূর্ব ব্যবহার লক্ষনীয়। বাংলার গ্রামীন দৃশ্যপট এবং মানুষের জীবন ঘনিষ্ট বাদ্যযন্ত্র বাঁশি, তবলা। তাই গ্রামীন বিস্তৃত পথে জগদ্দলের ছুটে চলাতে সেতার, বাঁশি এবং তবলার ব্যবহার মনে করিয়ে দেয়- এই দৃশ্যপট চিরায়ত বাংলার। একইসাথে বিমল এবং জগদ্দল এই অঞ্চলের মানুষ ও তাদের আবেগকে প্রতিনিধিত্ব করে।

জগদ্দল তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তাকে পানি দেয়ার সময় ঢক ঢক শব্দ দর্শকে মুহুর্তেই মনে করিয়ে দেয় জগদ্দল এই চলচিত্রে যন্ত্র নয় বরং মানুষ হিসেবেই উপস্থাপিত হচ্ছে। এমনকি জলপানের পর তৃপ্তির ঢেকুর তোলার মত চমকপ্রদ শব্দও এখানে পরিচালক ব্যভার করেছেন।

সর্বোপরি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অযান্ত্রিকে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ এবং ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিকের মধ্যে সামঞ্জস্যতা ছিলো বেশ প্রশংসনীয়। শুধু শব্দের উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমেই ঐ ঘটনার আবেগ দর্শকের পৌঁছে যায় মুহুর্তেই।      

অযান্ত্রিকের অর্থের দ্যোতনা

প্রতিটি চলচিত্রেরই নিজস্ব কিছু অর্থ থাকে। নির্মাতা সাধারনত এই চলমান দৃশ্য মাধ্যমের দ্বারা দর্শকের কাছে কিছু অর্থবহ বার্তা পৌঁছাতে চান। সামগ্রিক এ অর্থগুলোকে কয়েকটিভাগে ভাগ করা হয়। অযান্ত্রিক চলচিত্রের ক্ষেত্রেও পরিচালক ঋত্বিক ঘটক দর্শককে কিছু অর্থপূর্ণ বার্তা দিতে চেয়েছেন। সেসব অর্থগুলোকে নিয়েই এই পর্বের আলোচনা। নিচে অযান্ত্রিকের জন্য প্রযোজ্য অর্থসমূহ আলোচিত হলোঃ

শাব্দিক অর্থ
শাব্দিক অর্থে অযান্ত্রিকের ধারণা এমন- মানুষ বিমলের প্রিয় ট্যাক্সির নাম জগদ্দল; যার অবস্থা বেশ পুরানো এবং ভগ্ন দশা। ট্যাক্সির এই দৈন্যদশার জন্য বিমলের প্রায়ই কাষ্টমার পায় না; তা সত্বেও বিমল কোনরকমেই জগদ্দলের বদলে নতুন কোন গাড়ি কিনছে না। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় জগদ্দলের প্রতি বিমলের ভালোবাসা খুব প্রকট। এ ভালোবাসা শুধুমাত্র মালিকের তার গাড়ির প্রতি।

বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে ছাড়া বিমল সাধারনত নামীদামি বা বড় কোন যাত্রী পায় না। বিমলের অধিকাংশ যাত্রীই নিম্নবিত্ত কিংবা অবহেলিত মানুষেরা। এ থেকে বোঝা যায়, বিমল মুখে যতই কাটখোট্টা ধরণের কথা বলুক না কেন তার মন খুবই নরম। সে অবহেলিত, দলিত মানুষেরই একজন। এর অন্য আরেকটি অর্থও বিশেষভাবে নজর কাড়ে; তা হলো- অর্থবান যাত্রীদের হাতে সাধারনত ভালোমন্দ যাচাইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বেছে নেয়ার স্বাধীনতা থাকে তাই তারা অর্থের বিনিময়ে ভালো জিনিস পেতে পারে। কিন্তু নিম্নবিত্তের অর্থাভাবে যা খুশি তাই বেছে নেবার স্বাধীনতা থাকে না; তাই তার ক্ষমতায় যা কুলোবে তাই নিতে হয় অথবা তাকে যাই দেয়া হয় তাতেই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়।  

বিমল রাগের চোটে জগদ্দলকে লাথি দেয় এবং জগদ্দলের সামনে থাকা লাইটগুলো ঝুলে পড়ে। খোলা চোখে মনে হয় বিমলের শক্তিশালী লাথির আঘাত সহ্য করতে অক্ষম জগদ্দলের লাইট ঝুলে গিয়েছে।

অন্তর্নিহিত অর্থ
সাদাচোখে যা দেখা যায় তার ভিতরেও থাকে অন্য কোন হাজারো ভাষা। বাংলা ভাষার আদত প্রকৃতি বিশ্লেষন করে একে বলা হয় সন্ধ্যা বা সান্ধ্যভাষা অর্থাৎ যে ভাষার কিছু অর্থ আলোকিত বা প্রাকাশ্য থাকে অন্যদিকে কিছু অর্থ অন্ধকারে লুকানো থাকে। আর লুকিয়ে থাকা এ অর্থই তার অন্তর্গত অর্থ। অযান্ত্রিকের পরিচালক ঋত্বিক ঘোটকের মধ্যেও এই আলো- আঁধারিতে খেলা করার প্রবণতা বেশ প্রকট। এই চলচিত্রের সাদাচোখের বাইরেও অন্ধকারে লুকিয়ে রয়েছে হাজারো অর্থ। সেসবই আলোচিত হচ্ছে এই অংশে-

বিমলের যাত্রীদের লক্ষ্য করলে দেখা যায় তাদের অধিকাংশই নিন্মবিত্ত, অবহেলিত ও দলিত শ্রেণীর মানুষ। যেহেতু পরিচালক ব্যক্তিগত জীবনে বরাবরই অবহেলিত গণ-মানুষের জন্য লড়ে গেছেন, বেঁচে গেছেন সেহেতু তার চলচিত্রে গণ মানুষের চিন্তা উঠে আসাটাই স্বাভাবিক। তাই, বিমলের যাত্রীদের দেখে অনুমান করা যায়- বাংলার গণ মানুষেরাই হাজার বছর ধরেই এর প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কার ও রীতিনীতি বয়ে চলেছেন তাদের অভ্যাসে, কাজে, চিন্তায় এমনকি জীবন যাপনের ক্ষেত্রেও। অন্যদিকে, সামর্থবানেরা সময়ের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের নিজস্বতাকে হারিয়ে ময়ূরপুচ্ছে সেজে উঠে নিজেদের আধুনিক করার চেষ্টায় মত্ত হচ্ছে। অবলীলায় অর্থবানেরা খারিজ করে দিচ্ছে বাংলার চিরায়ত সত্য, সরল ও স্বাভাবিকতাকে।

এক্ষেত্রে আরো লক্ষ্যনীয়, বিমল- মূলত গণ মানুষদেরই একজন। সে তাদের সাথেই আত্মিক বন্ধন অনুভব করে। শেষদৃশ্যে, দেখানো হয় একটি ছোট্ট শিশুর হাতে জগদ্দলের ভাঙ্গা হর্ণটি। নির্মল আনন্দের সাথেই শিশুটি বাজাতে থাকে হর্নটি। এর মাধ্যমে পরিচালক এক অসম্ভব স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেছেন দর্শকদের। পরিচালকের শেষাঙ্কের এই দৃশ্য বার বার নিয়ে যায় সুকান্তের কাছে- ‘এসেছে নতুন শিশু/ তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’। প্রতিটি সংস্কার ও রীতির নিজস্বতার সাথে কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে। নতুনের হাতে তোরন তুলে দিয়ে নতুন তার মত করেই সীমাবদ্ধতাকে জয় করে নিজস্বতাকে নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে সামনের দিকে। অসংখ্যা হতাশা আর হেরে যাওয়ার মধ্য দিয়েও নতুনের জয়গান এবং স্বপ্নের দিশা দেখিয়ে দিতে পারা ‘অযান্ত্রিকের’ প্রধানতম সাফল্য।     

বিমলের লাথিতে লাইট ঝুলে পড়া জগদ্দলের গূঢ় অর্থ হচ্ছে, জগদ্দল বিমলের এই আঘাত কিংবা অপমান নিতে পারেনি। ভালোবাসার মানুষের এই আঘাত মুষড়ে দেয় জগদ্দলকে। অনেকটা পরাজিতের মতোই মেনে নেয় বিমলের এই আঘাত। তাই মাথা হেট করে ফেলার মত করেই নত হয়ে আসে সামনের জোড়া লাইট।

প্রতীকী অর্থ
‘জগদ্দল’ শব্দটি বাংলার প্রচলিত প্রবাদ ‘জগদ্দল পাথর’ এর সমার্থক হিসেবে এসেছে। পুরাতন, প্রথা কিংবা চিরায়ত রেওয়াজ- রীতি সবকিছুই বোঝান সম্ভব এই ‘জগদ্দল’ শব্দের মাধ্যমে। এই প্রচলিত প্রবাদের মতই অবস্থা বিমলের ১৫ বছরের বেশি বয়সী সঙ্গী জগদ্দলের। জীর্ণ হোক কিংবা শীর্ণ দশা- বিমল তাকে ছাড়তে বা হারাতে রাজি নন।

পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের কাছে নারী মানে বরাবরই আরাধ্য। তার প্রভাব দেখা যায় অযান্ত্রিকেও। অযান্ত্রিকে নারী চরিত্রে আসে কেবলমাত্র একজন নারী। তার সাথে বিমলের প্রথম দেখা তাদের বিয়ের দিনে পালিয়ে আসার মুহুর্তে; যখন নববধূঁ হয়ে বিমলের যাত্রী হয়েছিলো। তারপরে নারী চরিত্রের সাথে দেখা হয় বেশ কিছু সময় পরে- যখন তার প্রেমিকটি মেয়েটির সব অর্থ ও গয়না চুরি করে পালিয়ে যায়। সেখানে মেয়েটির অসহায়ত্ব ও যন্ত্রণা দেখা যায় চোখে-মুখে। নারীর প্রতি বিমলের টান আসলে নাড়ীর বন্ধনকেই প্রতীকী অর্থে উঠে এসেছে। নাড়ী অর্থে মাটি, দেশ। তাই অসহায়, অপরিচিত নারীটি যখন ট্রেনে করে চলে যায়- তখন বিমলের কাছে মনে হয় তার মা-  মাটি- দেশও তার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে ক্রমাগত। 

শেষদৃশ্যে আসা শিশুটিও বেশ শক্তিশালী প্রতীক হিসেবেই এসেছে এ চলচিত্রে। শিশু মাত্রই নতুনের প্রতীক। আর হাস্যজ্জ্ব্যোল শিশু মানে অনাবিল আনন্দ ও সুখময় আগত ভবিষ্যত।

রেফারেন্সিয়াল অর্থ
অযান্ত্রিক চলচিত্রে রেফারেন্সিয়াল অর্থ নিয়ে পরিচালক খুব একটা খেলা করেন নি। আরোপিত করতে চাননি তিনি কোনকিছুকেই। বরঞ্চ স্বাভাবিকভাবেই যে অর্থ ও অনুভুতি ধরা দেয় গণ মানুষের কাছে তাকেই চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন নির্মাতা অপরাপর অর্থের মধ্য দিয়ে।

অযান্ত্রিকের মূলনীতি:

প্রতিটি চলচিত্র এবং পরিচালকের কিছু নিজস্বতা থাকে। আর নিজস্বতা প্রকাশে ব্যবহৃত হয় কিছু প্যাটার্ণ, রূপরেখা ও গঠনশৈলী। প্রতিটি গল্পের নিজস্বতা বজায় রেখে চলচিত্র হয়ে ওঠার এ প্রক্রিয়াকেই বলা হয় তার মূলনীতি। অযান্ত্রিকেরও রয়েছে তেমন সব মূলনীতি; যা এ পর্বের মূল আলোচ্য। পর্যায়ক্রমে এর বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচিত হলোঃ  

পৌনঃপূনিকতা
ষ্টেশন থেকে জগদ্দলের বের হবার সময় বারবারই একটি দৃশ্য ঘুরে ফিরে আসে। একটি দাঁড় করানো ছাতার নিচে খানিকটা দূরে বসে থাকা এক ভিক্ষুক বেশ তটস্থ হয়ে পড়ে জগদ্দলের শব্দ শুনে। প্রায় এদিক-সেদিক নিজেকে বাঁচিয়ে চিৎকার করে বলে ‘ওরে বাবারে! ওরে মারে’। ভিক্ষুকের তটস্থতা ও উদ্ভ্রান্তের মতো গুটিয়ে পড়ার চেষ্টা দেখলে সহজেই বোঝা যায়- জগদ্দলের ব্রেক এবং সার্বিক নিয়ন্ত্রনের অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়। এই পৌনঃপুনিক দৃশ্যের মাধ্যমে পরিচালক সফলভাবে বুঝিয়েছেন যে, ‘জগদ্দল’-এর অবস্থা বেগতিক এবং বেসামাল। দৃশ্যমাধ্যমে পুরানো মডেলের বাতিলযোগ্য গাড়ির বেহাল দশা বোঝাতে এ পৌনঃপুনিক দৃশ্যটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

জগদ্দলকে নিয়ে বিমলের পথ চলাতে একটু কৌতুকপূর্ণ তবলা ও সেতারের শব্দ ঘুরে ফিরে গোটা চলচিত্রেই ছিলো। এর ফলে তাদের যাত্রা পথের নানা হাস্যকর কান্ডকারখানা দেখানো হয়েছে। এই শব্দের পৌনঃপূনিকতা তাদের পথচলাতে বিড়ম্বনা ও প্রতিকূলতাকে নিয়ে আসে বারবার।

মোটিফ
পরিচালক ঋত্বিক ঘটককে বাংলার গন মানুষের আবেগ, অনুভূতি সর্বোপরি বাংলা টেনেছে বরাবরই গভীরভাবে। তাই তার অযান্ত্রিকেও এর প্রভাব রয়েছে প্রকটভাবে। মোটিফের ব্যবহার মূলত বেশি চোখে পরে চরিত্রদের নামকরনের মধ্যে-জগদ্দল, বুড়ি ইত্যাদি শব্দের মধ্যেই রয়েছে গ্রামীণ বাংলার মোটিফের দূর্দান্ত ব্যবহার।

প্যারালালিসম
অযান্ত্রিক চলচিত্র আসলে তেমন কোন রকমের প্যারালালিসম চোখে পড়ে না। তবে অর্থের দিক থেকে দেখতে গেলে বোঝা যায়, একই দৃশ্যে পরিচালক তার বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যতকে একত্র করে এগিয়ে নিয়ে যাবার পদ্ধতিতে প্যারালালিসমের কিছুটা আভাস মেলে।   

ইউনিটি বা সামঞ্জস্যতা
অযান্ত্রিকের পুরো গল্পটিকে ফুটিয়ে তুলতে নির্মাতা একই সাথে শব্দ, আলো- ছায়া ও ঘটনাক্রমের মধ্যে বেশ রসাত্মকভাবেই সামঞ্জস্যতা দেখিয়েছেন। পুরো চলচিত্রের কোথাও দর্শককে ক্লান্ত হতে দেন নি তিনি। একটি দৃশ্য থেকে অপর দৃশ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিচালক তাই দৃশ্যের আবেগ অনুযায়ী কোথাও ফেড আউট আবার কোথাও ডিসল্ভ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ফেড আউট কিংবা দিসলভ পদ্ধতি তিনি এতোটাই মুন্সিয়ানার সাথে এনেছেন যে তাতে দর্শকের মনে হয় না হুট করে কোথায় চলে এলাম।

কার্যকারিতা/ সার্থকতা
শেভরোল্ট জেলোপি গাড়ী ব্যবহারের সাথর্কতা:

অযান্ত্রিক নির্মিত হয়েছে ১৯৫৮ সালে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে। কিন্তু পুরাতন, জীর্ণ ও ঐতিহ্যের ধারক বোঝাতে পরিচালক এখানে ব্যবহার করেছে ১৯২০ সালের একটি গাড়ি। দীর্ঘ ত্রিশ বছরে গাড়ির মডেল ও ব্যবহারে এসেছে নতুনত্ব। তাই দর্শকের কাছে প্রাচীনতাকে বোঝাতে নির্মাতার শেভরোল্ট জেলোপির ব্যবহার যথার্থই সার্থক হয়েছে। 

নামকরণের সাথর্কতা:

জগদ্দল যন্ত্র কিন্তু বিমল মানুষ। সাধারন দৃষ্টিতে মানুষের প্রেম অপরের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এ চলচিত্রে যন্ত্র এবং মানুষের প্রেমের অসামান্যতা মূল ভূমিকায় রয়েছে। যন্ত্রের প্রতি বিমলের এই প্রেম যান্ত্রিকতার উর্ধে উঠে এসেছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে এই ভালোবাসা যান্ত্রিক মনে হলেও মূল চরিত্র বিমলের কাছে তা ‘অ-যান্ত্রিক’ রূপেই ধরা দেয়।

এছাড়াও (English and Bengali online Dictionary and Grammer) অনুসারে ‘জগদ্দল’ শব্দটি বাংলায় ‘অনড় পুরাতন গুরুভার পাথর’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেদিক থেকে ‘জগদ্দলের’ প্রতি বিমলের অন্ধ ভালোবাসাও অনড় এবং একরৈখিক। তাকে সরিয়ে নতুন কোন গাড়ি বিমলের চিন্তাতেই আসতে পারে না। কারন, ‘জগদ্দল’ বিমলের কাছে মানুষেরই প্রতিরূপ। পিছিয়ে পড়া, দলিত মানুষকে যেমন চাইলেই অনেকে সহজে ঠেলে ফেলে দিতে পারে না- তেমনটাই ঘটেছে এখানেও। সে হিসেবেও, গাড়ির মাধ্যমে দেখানো হলেও আসলে বলা হয়েছে মানুষের কথা।

উপোরক্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে বলা যায়, চলচিত্রের ‘অযান্ত্রিক’ নামকরণ যর্থাথই হয়েছে। শুধু চলচিত্রেরই নয় বরং তার চরিত্রগুলো বিশেষত ‘জগদ্দল’- শব্দের সার্থক ব্যবহার ঘটেছে। গোটা কাহিনীর বিন্যাস এবং দৃশ্যায়নের সাথে প্রতিটি নামের সার্থক ব্যবহার বেশ প্রশংসনীয়।

- Advertisement -
- Advertisement -

আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

সর্বাধিক পঠিত