ফিচার

দুধের ঘোল এবং তামাশা

তাহমিনা সংগীতা

আদরের সন্তানকে রোজ এক গ্লাস করে দুধ পান করাতে হবে। সারাদিন কত পরিশ্রম করে! পরীক্ষার আগেতো কথাই নেই। কারণ দুধ যে সুষম খাবার। ছোটবেলায় দেখেছি মা গোয়ালার কাছ থেকে রোজ করে দুধ রাখতো।

 

যেদিন দুধ একটু পাতলা হতো বা বোঝা যেতো এতে পানি মেশানো হয়েছে, সেদিন গোয়ালার সাথে কত চিৎকার চেঁচামেচি! সন্তানকে তার সেরাটাই দিতে হবে। বর্তমানে শহুরে জীবনে রোজ করে দুধ রাখাটা আকাশকুসুম চিন্তা। শেষ ভরসা প্যাকেটজাত দুধ।

 

কিন্তু যে তামাশা চলছে চারিদিকে তাতে এই আপাত ধবধবে দুধের রং বিষাক্ত কালো হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের কাছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দুধের ননী তুলে রাখার বদলে ডিটারজেন্ট তুলে রাখা যেতে পারে পরবর্তী ব্যবহারের জন্য অথবা বিজ্ঞাপন তৈরি করা যেতে পারে ‘ধবধবে দুধে কাপড় কাঁচা, সেই দুধেই এন্টিবায়োটিক সহ আরও নানা ব্যবস্থা’। এবারে দুধ নিয়ে কি হলো- চলুন আরেকবার ঝালিয়ে নেই।

 

গেল ২৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদ ও বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার বাজার থেকে দুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন, যা তারা গেল এক মাস ধরে করেছেন। ফলাফলে জানানো হলো দুধের নমুনায় তারা ডিটার্জেন্ট ও তিন ধরনের এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পেয়েছেন, রয়েছে সীসাও। ঠিক সেদিনই হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দেয় বিএসটিআই, জানা গেলো তাদের পরীক্ষায় দুধে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান মেলেনি। আবারো পরীক্ষা চালালো ঢাবি গবেষকেরা, ফলাফল এলো একই। তারপর চারটি ল্যাবরেটরিতে পাস্তুরিত দুধ প্রস্তুতকারী ১৪টি কোম্পানির দুধের নমুনা পরীক্ষার হাইকোর্টের নির্দেশ, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দুধ উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞাসহ আরো কতো কি! উল্লেখ্য, নিষেধাজ্ঞা একদিনের বেশি টিকে থাকে থাকতে পারেনি।

 

এখন আসুন গল্পের আরেকটু গভীরে। মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক বিশ্বাস করবো কাকে? ঢাবি গবেষক নাকি বিএসটিআই? ১৪ টি কোম্পানিতো বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়েই দিব্যি ব্যবসা করছে। তারাইতো সাধারণ জনগণের ভরসা। জেনেশুনে বিষ তারা নিশ্চই অনুমোদন দেয়নি। আবার এটাও চিন্তার বিষয় যে, ঢাবি তাহলে কি পরীক্ষা করলো? কোথা থেকে নমুনা সংগ্রহ করলো? পড়লো মাথায় বাজ? আসুন তাহলে আবার পরীক্ষা নিরীক্ষার বিষয়ে।

 

দুধ পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলো  ১৭ বছর আগে। দুঃখের বিষয় হলো উন্নয়নে আমরা অনেক এগিয়ে গেলেও বেচারা বিএসটিআই এখনো সেকেলে রয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলো যেখানে ২৫ এর অধিক মানদণ্ডে দুধ পরীক্ষা করে থাকে সেখানে তারা করে শুধু মাত্র নয়টি মানদণ্ডে। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে দুধে এন্টিবায়োটিক বা কীটনাশক আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করার উপযোগিতা নেই বিএসটিআই এর। সেটা না করেই তারা হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং বলেছে দুধে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান তারা খুঁজে পাননি।

 

গল্পের এই অংশে রয়েছে আরো একটি চমক। দেশে যখন এতো লেজেগোবরে অবস্থা তখন দেশের বাইরে আস্থা অর্জনে যাওয়া হলো। ভারতের চেন্নাইয়ের এসজিএস থেকে পরীক্ষা করানো হলো দুধ। ফলাফল একদম ফকফকা। দুধ পান নিরাপদ এবং খাওয়ার যোগ্য। এখন বাকি কোম্পানির দুধও সেখানে পাঠানো হবে পরীক্ষার জন্য। দেশে আর নয়! কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন বাংলাদেশে যে কয়েকটি পরীক্ষাগার আছে তার বেশির ভাগেই ভারী ধাতু, ডিটারজেন্ট ও অ্যান্টিবায়োটিক পরীক্ষা করার সক্ষমতা নেই। তাহলে এই কাঠামো সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গুলোর দরকার বা কাজ কি বলুনতো? আম জনতা কি সেটা জানতে চাইতে পারে?

 

ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (ফাও) এর মতে দুধের গুণগত মান পরীক্ষা করার জন্য শুধু নমুনা দুধ নয়, পুরো ডেইরি চেইন থেকে পরীক্ষা করা উচিৎ। যদি তাই হয় তাহলে আগে গরুকে মানুষের এন্টিবায়োটিক খাওয়ানো বন্ধ করতে হবে, কিভাবে পালন করা হচ্ছে, কি খাওয়ানো হচ্ছে, বাজারে আসার পর কিভাবে প্যাকেটজাত হচ্ছে এসবই তখন পরীক্ষার আওতায় চলে আসবে। তা এসজিএস বা অন্যান্য গবেষণারগার কোন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে জানি না।

 

এদিকে, আবার শোনা যাচ্ছিলো যে দেশীয় দুধ উৎপাদক ও কোম্পানিগুলোকে বিপদে ফেলার জন্য এটা কোনো ষড়যন্ত্র কিনা। আবার অধ্যাপক আ ব ম ফারুকও বিপাকে আছেন। তাকে নিয়ে হচ্ছে নানা রকম সমালোচনা। তবে তিনি জানিয়েছেন তার জায়গায় দৃঢ় আছেন তিনি।

 

গল্পের ক্লাইমেক্স হচ্ছে, তবে দেশীয় গবেষণার এই অবস্থা কেন? খাদ্যের মান পরীক্ষা বা ক্ষতিকারক দিক পরীক্ষা করার সামর্থ কেন নেই? সামর্থের অভাব নাকি স্বদিচ্ছা? নাকি ব্যবসায়ী স্বার্থ চিরতার্থ করার পায়তারা? আর বিএসটিআই এর যদি ক্ষতিকারক উপাদান পরীক্ষা করার যন্ত্র নাই থাকবে তাহলে এই ১৪ টি প্রতিষ্ঠানকে তারা অনুমোদন দিয়েছে কিসের ভিত্তিতে? ১৭ বছর আগের মানদণ্ড কেন আপগ্রেটেড হয় না? বাকি খাদ্যের মান সম্পর্কে কিভাবে জনগণ নিশ্চিত হবে? সব কি বিদেশ থেকে পরীক্ষা করে আনতে হবে? দেশ কি তাহলে মেধাবী লোকজন বা গবেষক খুঁজে পাচ্ছে না, না কি কাজ করার মতো জায়গা তৈরি করে দিতে পারছে না?

 

প্রশ্নের সঠিক উত্তর কে বা কারা দেবেন বা এই জবাবদিহিতার দরকার আছে বলে কেউ মনে করছেন কি না, কে জানে। গল্পে ট্র্যাজেডিরতো আর শেষ নেই, এখন আবার শুনছি বিদেশ থেকে ডেঙ্গু নিধনের ওষুধ আসবে। একবার শুনলাম চীন থেকে আবার শুনলাম ভারত থেকে আসবে। কবে আসবে বা আদৌ আসবে কি না জানা নেই। আরো কত মৃত্যু হলে আর কত ‘সরল মনে’ জনতার সাথে প্রতারণা করলে, কারো বিবেক বা টনক নড়ে জানা নেই। তবে আশা করতে দোষ কি? মাছে ভাতে বাঙালি পাক দুধ ভাতেরও স্বাদ- গল্পের শেষটা এমনই হোক।

 

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

 

 

LIVE
Play
গাণিতিকভাবে সবচেয়ে নিখুঁত সুন্দরী বেলা হাদিদ!
স্পেনের জানা-অজানা
টিকটকের মধুবালা
ফোর্বসের তালিকায় ২০১৯ সালে ভারতের শীর্ষ ধনী