বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুর গল্প ৩…

শুভ কিবরিয়া

 

 

ফেরেশতা কো তোমলোক খুন কিয়া

বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার দুই দিন পর। বঙ্গবন্ধু একদিন পুরোনো গণভবনে আমাকে বললেন, হ্যাঁ রে সবাইকে দেখলাম বদরুদ্দিন ভাই কোথায়? বদরুদ্দিন মানে তৎকালীন পাকিস্তানি মালিকানার ট্রাষ্টের পত্রিকা মর্নিং নিউজ-এর সম্পাদক। পত্রিকাটি অহর্নিশ তাঁর কুৎসা গেয়েছে, আগরতলা মামলার সময় তাঁর ফাঁসি দাবি করেছে। এই সেই পত্রিকা যার অফিস বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনগণ পুড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর সম্পর্কে অহর্নিশ বিষোদগারকারী সেই পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গেও তাঁর ব্যাক্তিগত সম্পর্কেও কমতি ছিল না। তাঁর নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে আমাকে বললেন, ‘কোথায় আছেন বদরুদ্দিন ভাই? খুঁজে নিয়ে আয়। ভালো আছেন তো? কোন অসুবিধায় নেই তো?’

বঙ্গবন্ধুর আদেশে বদরুদ্দিনকে খঁজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম, লালমাটিয়ার একটি বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন তিনি। বহু কোশেশ করে দেখা করলাম। বললাম, ‘মুজিব ভাই আপনাকে খুঁজছেন। চলুন আমার সঙ্গে।’ বদরুদ্দিন ভাইয়ের চোখমুখ যেন ঝলসে উঠল, ‘ক্যায়া, শেখ সাব মুঝে বোলায়া, আই ক্যান গো টু হিম, সি হিম? নিয়ে এলাম তাঁকে গণভবনে, যেন দুই বৈরী নয়, যেন দুই বন্ধুর মিলন দেখলাম। বুকে জড়িয়ে ধরলেন, পাশে বসালেন। নেতা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ। আপনি কী করতে চান? কাঁহা যাতে চাহেঁ? কোন বিপদে নেই তো? আবেগময় প্রশ্নগুলো শুনে বদরুদ্দিন আধো কান্না আধো খুশি মেশানো কন্ঠে বললেন, ‘পাকিস্তানে যেতে চাই, মে আই লিভ ফর করাচি? বঙ্গবন্ধু একান্ত সচিব রফিকউল্লাহকে ডাকলেন, ‘বদরুদ্দিন ভাই যা চান, তা-ই করে দাও।’ উল্লেখ করা প্রয়োজন পাকিস্তান তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের সঙ্গেও নৌ-স্থল-বিমান যোগাযোগ নেই। কিছু অবাঙালি গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত ও কাঠমান্ডু হয়ে তারপর পাকিস্তানে যাচ্ছেন।

তার পরের কাহিনি। বদরুদ্দিন ভাইয়ের আরেকটি প্রার্থনা, আসাদ অ্যাভিনিউয়ের বাড়িটি বিক্রি করবেন, সেই টাকাও তিনি সঙ্গে নিয়ে যাবেন। বাহাত্তরে সেই সময়ে একজন বিহারির এহেন একটি আবদার কেউ কল্পনাও করতে পারত না। কিন্ত বঙ্গবন্ধু বলেন তথাস্তু, তা-ই হবে।

ক্রেতা ঠিক হলো আতাউদ্দিন খান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, পরবর্তী সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুর সচিব রফিকউল্লাহ চৌধুরীর সহায়তায় সচিব আতা সাহেব বাড়ি কিনে যে টাকা দিয়েছিলেন তা বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তরিত করে বাইরে নেওয়ার অনুমতি দিয়ে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর (বর্তমানে প্রয়াত) হামিদুল্লাহ সাহেবকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন। অত:পর বদরুদ্দিন স্বচ্ছন্দে নেপাল হয়ে পাকিস্তানে চলে গেলেন।

পঁচাত্তরের অনেক বছর পর লাহোরে বদরুদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন। বলছিলেন, ‘আল্লাহর শোকর, শেখ সাহেব ফিরে এসেছিলেন। তাই তো বেঁচে আছি। এখনো বহাল তবিয়তে আছি ‘

তারপরই মাথা থাবড়াতে থাকলেন, ‘ইয়ে ফেরেশতা কো তোমলোক খুন কিয়া?’

শেখ মুজিবের বিশাল হৃদয়ের বহুমাত্রিক উদারতার এই প্রত্যক্ষ বয়ান লিখেছেন সাংবাদিক এবিএম মূসা তাঁর ‘মুজিব ভাই’ নামের এক ক্ষীণকায়া বইয়ে।

 

অন্যায় আবদার প্রত্যাখান

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলাম এবং নির্বাচিত হলাম। নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াতের জন্য একটি গাড়ী দরকার। এ সময় একদিন দেখা হলো কর্নেল জাফর ইমামের (বীর উত্তম) সঙ্গে। তিনি তখন মিলিটারি পুলিশের প্রধান , মার্শাল জেনারেল অথবা এ ধরণের একটা নাম ছিল তাঁর সেই পদবির। তখন, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পর সামরিক পুলিশের উদ্যোগে পরিত্যক্ত বাড়িঘর ও বেওয়ারিশ গাড়ি উদ্ধার অভিযান চলছিল। জাফর ইমাম ওরফে সম্পর্কে হুমায়ুন মামা আমাকে জানালেন, সেনাবাহিনীর বেওয়ারিশ গাড়ি উদ্ধার অভিযানে পাওয়া একটি জিপ আছে অর্ডন্যান্স ডিপোতে। দেখা করলাম (পরে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার) অর্ডন্যান্সের পরিচালক কর্নেল শওকতের সঙ্গে। আগরতলা মামলা চলাকালীন অন্যতম আসামি কর্নেল শওকতের সঙ্গে আদালতেই পরিচয় , তারপরে একাত্তরে কলকাতায় পাশাপাশি থাকার কারণে ঘনিষ্ঠতা। শওকত ভাই বললেন, ‘ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তথা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে।’

অতঃপর গণভবনে প্রধানমন্ত্রী সমীপে হাজির হলাম। হাতে জিপটির বরাদ্দ চেয়ে আবেদনপত্র। তিনি এবার বুকপকেট থেকে ঝরনা কলম বের করে আবেদনপত্রে লিখলেন, ‘ জীবনে কখনো কোন অন্যায় আবদার প্রশ্রয় দিই নাই, ভবিষ্যতেও দিব না। আপনার প্রার্থনা মঞ্জুর করিতে পারিলাম না বলিয়া দুঃখিত।’

এ ঘটনায় আমরা দেখিতে পাচ্ছি প্রশাসক, রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুকে। যিনি নিয়মকেই আশ্রয় দিচ্ছেন সর্বাগ্রে। বন্ধুত্ব, প্রিয়তা এসবের চাইতে তখন তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছে প্রশাসকের ন্যায্যতা আর নীতিনিষ্ঠাতা। চেনা মানুষের ক্ষেত্রেও নিয়মের ব্যতয় ঘটাতে চান না । কোন অনুরোধ বা স্বজনতোষণে পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে না তাঁর প্রশাসকের ন্যায্যতার দন্ড। এই ঘটনার বয়ানও এসেছে উপরে উল্লিখিত বই থেকে।

জহুরের কাঁধে জন্মনিয়ন্ত্রণ

নিজের মন্ত্রীদের নিয়ে মাঝে মধ্যেই রসিকতা করতেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু ১১ জানুয়ারি (১৯৭২) সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর বিকেলবেলা সংবাদ সম্মেলন করার পর যথারীতি আমাদের সঙ্গে সান্ধ্য আড্ডায় বসলেন। তখনো মন্ত্রীদের দপ্তর বন্টন হয়নি। এ নিয়ে আমরা একটুখানি কৌতূহল প্রকাশ করায় তিনি কৃত্রিম গম্ভীরতার সঙ্গে জানালেন, ‘সব এখন বলব না, একটু পরেই জানতে পারবা। উপযুক্ত ব্যাক্তিকেই যথাযথ দায়িত্ব দিয়েছি। তবে একটা দপ্তর নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। অনেক ভেবেচিন্তে সেটা জহুরের কাঁধে চাপালাম। দপ্তরটি হচ্ছে স্বাস্থ্য ও জন্মনিয়ন্ত্রণ ( পরবর্তীকালে পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়)। ভেবে দেখলাম, আমার মতো সারা জীবন জেল খাইটা তার শরীরডা খ্যাংরা কাঠির মতো হইয়া গেছে। সব ডাক্তারকে সে মাইনষের স্বাস্থ্য ভালো করার তাগিদ দিতে পারব। সে আবার দুই বউয়ের ১৪ টি বাচ্চা নিয়ে হিমশিম খাইতাছে। বেশি  বাচ্চা হওয়ার জ্বালা সে-ই ভালো বোঝে। তাই তারে জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছি।’

এই ‘জহুর’ হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর জহুর আহমদ চৌধুরি। জহুর আহমদ চৌধুরিকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিচ্ছেন যোগ্যতম মানুষ ভেবেই। কিন্তু তাঁকে নিয়ে রঙ্গরস করতেও ছাড়েন নাই।  এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমরা খুঁজে পাই অতুলনীয় আরেক বঙ্গবন্ধুকে। ব্যাক্তি , প্রশাসক, রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা-সর্বক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধু এই জাতির আশা-আকাংখার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন এভাবেই।

আরও পড়ুন
বঙ্গবন্ধুর গল্প ২…
বঙ্গবন্ধুর গল্প ১…

 

3 responses to “বঙ্গবন্ধুর গল্প ৩…”

  1. […] বঙ্গবন্ধুর গল্প ৩… […]

  2. […] বঙ্গবন্ধুর গল্প ৩… বঙ্গবন্ধুর গল্প ২… বঙ্গবন্ধুর গল্প ১… […]

  3. […] বঙ্গবন্ধুর গল্প ৩… বঙ্গবন্ধুর গল্প ২… বঙ্গবন্ধুর গল্প ১… […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LIVE

স্যানিটাইজার ব্যবহারে বাড়ছে শিশুদের চোখের সমস্যা
অনলাইন আড্ডায় রুবানা হক
উচ্চ রক্তচাপে করণীয়
দ্রুত চুল লম্বা ও ঘন করার সহজ উপায়