নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও একই বিদ্যালয়ে ৩৭ বছরেরও বেশি সময় থাকা শিক্ষিকা রওশন আরা বেগম এবার চাকরী জীবনের ইতি টানলেন। তিনি পীর মহসীন উদ্দিন পৌর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ হতে অবসরে গেলেন।
১১ নভেম্বর মঙ্গলবার নিজের অবসরে যাওয়ার কথা নিশ্চিত করেন রওশন আরা বেগম নিজেই। চাঁদপুর শহরের তালতলায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি হতে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটানা শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষক পদেই তিনি দায়িত্বে ছিলেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৮ সনের ২১ জুন অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়টিতে চাকরী শুরু করেন রওশন আরা। পরে ১৯৯৩ সালে ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়ে চূড়ান্তভাবে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক হন। এরপর থেকে একটি টিনের বিদ্যালয় হতে ক্রমান্বয়ে এটির অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তা ৪ তলা বিশিষ্ট ভবনে রূপ দিয়ে যেতে সক্ষম হন।
জানা যায়, রওশন আরা বেগম হচ্ছেন এ জেলার ফরিদগঞ্জের ১০নং রামপুর ইউনিয়নের চরভাগল গ্রামের মরহুম অ্যাড. জাবেদ আলী এবং আমিরুনন্নেছা দম্পতির ৪ মেয়ে ও ৩ ছেলের মধ্যে ষষ্ঠ সন্তান। তার পিতা মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরবর্ততীতে তিনি চট্টগ্রাম কাস্টমে কর্মরত ছিলেন। এরপর অ্যাডভোকেট হয়ে আইনীজীবী পেশায় নিযুক্ত হন এবং ব্যবসায় জড়িত হন। এছাড়াও একটি রাজনৈতিক দলেরও তৎকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অপরদিকে তাঁর মা আমিরুনন্নেছা বেগম চট্টগ্রামের কাজীর দেউরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন এবং ২০১৬ সালে সফল জননী হিসেবে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরুষ্কার লাভ করেন।
আরও জানা যায়, রওশন আরা বেগমের বড় ভাই ডা. শাহলম মনছুর আহমেদ ঢাকায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ২য় বোন মনোয়ারা বেগম বিমান বাহিনীর একটি ক্লাবে সুপারভাইজার ছিলেন, ৩য় ভাই শাহজাহান ফিরোজ বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের উপ-পরিচালক, ৪র্থ বোন দিলোয়ারা বেগম শহরের কদমতলা গার্লস হাই স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষিকা, ৫ম ভাই ড. মনিরুল ইসলাম একজন অনুবিজ্ঞানী এবং অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন প্রবাসী, ৬ষ্ঠ বোন রওশন তিনি নিজে শিক্ষিকা এবং ৭ম বোন শাহানাজ সুলতানা ঢাকার মহিসুন্ধী গার্লস বালিকা
উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষিকা ছিলেন এবং বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী।
আরও জানা যায়, রওশন আরা ১৯৬৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরে বিএএসসি বিএড শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন। তার স্বামী অ্যাড. সলিমুল্লাহ সেলিম চাঁদপুর জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের ২ কন্যা সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে শাওমুন খেয়া এমবিএ শেষ করে ব্যাংকার হিসেবে স্বামীসহ কর্মরত রয়েছেন এবং ছোট মেয়ে তাসনিম তাহসিন পিউ সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে স্বামীসহ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী।
রওশন আরা বেগম বলেন, সুনাম ও দক্ষতার সাথে প্রায় ৩৭ বছর ৭ মাস একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরী জীবন শেষ করলাম। এরমধ্যে বিগত ১৭ বছর আওয়ামীলীগের শাসনামলে শুধুমাত্র আমার স্বামী একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ায় অনেক প্রতিবন্ধকতা সহ্য করতে হয়েছে। তবে আমার সাথে যে যা করেছে আমি মন থেকে তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমি বিদ্যালয়টির দায়িত্ব নেয়ার পর এটি অষ্টম শ্রেণী হতে ধীরে ধীরে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছিয়েছি। সেই একচালা টিনের ঘর থেকে ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি’র এমপি এস এম সুলতান টিটুর মাধ্যমে ২ তলা ভবনে উন্নিত করি। পরে বিদ্যালয়টির এসএসসির ফলাফল পৌর এলাকার অন্য বিদ্যালয়গুলোর চেয়ে এটাতে তুলনামূলক ভালো রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেই এবং সফল হই। ২০২০ সালে এই বিদ্যালয়টিতে আরেকটি ১ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন করাতে সফল হই এবং এরপর ২০২২ সালে ওই ভবনটি নির্মিত হয়। ২০২৩ সালে ভবনটির ৪ তলার উর্দ্ধমুখী নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ এ এসে আমি দায়িত্বে থাকাকালীন শেষ করি। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুরো বিদ্যালয়ের ২ দিকে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ কাজ শেষ করে দিয়ে যাই।
বাকি জীবন নিয়ে রওশন আরা বেগম নিজের ইচ্ছে সম্পর্কে বলেন, আমি চাকরীজীবনের পাশাপাশি বেশকিছু সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম। তখন সেগুলোতে খুব একটা সময় দিতে না পারলেও এখন জীবনের বাকিটা সময় সেসব নিয়ে এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ও সবুজায়ন ও ধর্মীয় কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে সময় কাটাতে চাই। আমি আমার জীবনের অর্জিত অর্থ দিয়ে আমার স্বামীকে একটা গাড়ী কিনে দিতে চাই। যেটা দিয়ে আমরা ঘুরে ঘুরে অসহায় মানুষের জন্য সামাজিক কর্মকান্ডে অনেকটা সময় নিয়ে নিবেদিত হয়ে দুজনে একসাথে কাজ করতে পারবো। আমি সবার কাছে আমার ও আমার পরিবারের জন্য দোয়া চাই। যাতে জীবনের বাকি সময়টাও সম্মাণের সাথে এ দুনিয়ায় কাটিয়ে যেতে পারি।
পড়ুন: নোয়াখালীতে ছাত্রদল নেতার লিফলেট বিতরণ
দেখুন: কিছুই দমাতে পারেনি ৪ ফুট লম্বা ২১ বছরের নাহিদকে
ইম/

