আলোচিত, লাইফস্টাইল

বাবা, তুমি জানোতো!

তাহমিনা সঙ্গীতা

বছর ঘুরে আবারো চলে আসলো জুন মাসের তৃতীয় রবিবার। এই দিনটি বাবাদের জন্য বিশেষভাবে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। মা দিবসে আমি ঠিকই মাকে ফোন করে বলতে পারি, মা তোমাকে মা দিবসের শুভেচ্ছা। কিন্তু বাবা, তোমাকে কেন জানি কখনোই এই কথাটা বলতে পারিনা, বাবা, তোমাকে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা।

 

তোমার মনে আছে বাবা, ছোটবেলা যখন আমার দাঁতগুলো খুব করে নড়াচড়া করতো কিন্তু তাও আমি কাউকে ফেলতে দিতাম না। তুমি ঠিকই কৌশলে আমার সবকটা দাঁত ফেলে দিয়েছিলে। আর আমার সেকি আঁকাবাঁকা দাঁতের বাহার। সামনের দিকটাও উঁচু হয়ে উঠলো। একটু যখন বুঝতে শিখলাম আর সবাই যখন আমার দাঁত নিয়ে হাসাহাসি করতো, তখন খুব খারাপ লাগতো বাবা। তোমাকে বার বার বলেছিলাম, আমার দাঁতে ক্লিপ বসিয়ে দাওনা। আমার বান্ধবীদের দাঁত একদম ঠিক হয়ে গেছে বাবা, আমাকেও দাও প্লিজ!!!!! তুমি তখন বলেছিলে- প্রকৃতি প্রদত্ত জিনিস যত সুন্দর দেখায়, তা কৃত্রিমভাবে যত সুন্দরই করিস না কেন, তা আর স্বাভাবিক থাকে না।  বাবা, তোমার সেই কথার মর্ম এখন আমি বুঝতে পারি। বিশ্বাস করো এখন এই দাঁত নিয়ে আমার কোনো খারাপ লাগা নেই। এখন আমি বুঝি তুমি কতটা ঠিক ছিলে।

 

প্রতি বছর তুমি যখন বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল আনতে স্কুলে যেতে, খুব আশা করতে যে এইবার বুঝি আমি ফার্স্ট হবো। কিন্তু আমি দুঃখিত বাবা, কখনোই আমি স্কুলে ফার্স্ট হতে পারিনি। আবার যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উন্নীত হলাম, তোমার মন মতো সাব্জেক্টও পেলামনা তখনও তোমার মন খুব খারাপ হয়েছিল আমি জানি। কিন্তু আমি কি আর ইচ্ছা করে এগুলো করি বলো। তবে হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ফার্স্ট হয়েছিলাম তখন তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে যে অনেক খুশি হয়েছিলে সেটাও আমি জানি। সাবজেক্ট পছন্দ না বলে খুশিটা আমাকে দেখাওনি।

 

আর সেই স্কুল আর কোচিংয়ে যাওয়ার কথা মনে আছে তোমার? তোমার মেয়ের হাঁটতে কষ্ট হবে, বৃষ্টি পড়লে সর্দি লেগে যাবে, বেশি রোদে অসুস্থ হয়ে যাবো আরো কতো কি। রিক্সা ছাড়া এক পা ও কোথাও দেয়া যাবে না। তখন এটা খুব অসহ্য লাগতো বাবা। বান্ধবীদের সাথে স্কুলে হেঁটে গেলে কি এমনটা হতো? কিন্তু এখন বুঝি, তুমি আমাকে নিয়ে কতো চিন্তা করতে।

 

নিজের পছন্দের মানুষটিকে বিয়ে করার কথা কিভাবে তোমাকে বলবো বুঝতে পারছিলাম না। তুমি তো আমাকে সেদিন প্রায় বিয়ে দিয়েই দিয়েছিলে। বাধ্য হয়ে বলেই ফেললাম। আর সেই যে কাপড় ধুঁতে গেলাম, একদম দেড় ঘন্টা কাটিয়ে দিলাম, যদি তোমার মুখোমুখী হতে হয়? ভেবেছিলাম তুমি খুব রাগ করবে। কিন্তু না, আমাকে অবাক করে দিয়ে তুমি বললে, ছেলেটাকে বাসায় আসতে বল। মনে হয়েছিল বাংলা ছবির দৃশ্য চলছে। নিজের পছন্দে একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিতে না পারার কষ্ট এখনো তোমার মাঝে আছে আমি জানি।

 

এখন আর তোমাকে জ্বালাতে পারি না বাবা। মন চাইলেও তোমার সাথে দেখা হয় খুব কম। শশুর বাড়ি, চাকরি সব কিছু মিলিয়ে তোমার মেয়ে এতো ব্যস্ত যে তোমাকে দেখার সময়টা তার হয়না। বাস্তব যে এতো কঠিন বাবা, আমি তোমার কাছে থাকতে বুঝি নাই। বুঝবো কিভাবে বলো! তোমার মতো কি আর কেউ আগলে রাখতে পারে? এখন যখন বাসায় যাই, তুমি অনেক চাও আমি যেন কয়েকটা দিন তোমার কাছে থাকি। কিন্তু আমার আর থাকা হয় না। বাড়ি থেকে ফেরার সময় আড়ালে চোখ মোছো সেটাও বুঝি। কখনো তোমাকে কাঁদতে দেখিনি। এখন যখন কাঁদো তখন মনে হয় তুমি এখন একটা বাচ্চা ছেলে।

 

জীবন এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন বাবা। তবে একটা জিনিস তোমার মেয়েকে তুমি খুব ভালো শিখিয়েছো। নিজেকে শক্ত করে তোলা। আর সবার সাথে, সব রকম পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেয়া, খুব ভালো করে মিশে যাওয়া।

 

এখনো আমার বৃষ্টিতে ভিজলে সর্দি লেগে যায়, বেশি রোদে হাঁটলে মাথা ব্যথা করে। এগুলো নিয়েই আমি চলতে শিখে গেছি বাবা। আর তুমি এখন বয়সের কারণে নানা সমস্যায় আক্রান্ত। আর আমি এখন তোমার পাশে থাকতে পারি না বাবা। যেভাবে ছোট বেলায় তুমি পাশে থাকতে। জ্বর আসলে সারারাত মাথা নেড়ে দিতে। কি খাবো বার বার জিজ্ঞেস করতে। আর আমি? তোমাকে দেয়ার মতো সময় আর আমার হয়ে উঠে না। কিন্তু তুমি তো জানো বাবা আমি, আমরা সবাই বাস্তবতার কাছে বন্দী। এটাও তো জানো, যা কিছুই হোক, বাবা আর সন্তানের সম্পর্কের গভীরতা পৃথিবীর কিছু পরিমাপ করতে পারেনা।

তাই শুধু বাবা দিবসই তোমার জন্য বিশেষ না বাবা, সব সন্তানের কাছে তার বাবা সব সময়ই বিশেষ। তোমাকে সব সময়ই ভালোবাসি বাবা। যা কোনোদিন তোমাকে বলতে পারিনি, আদৌ পারবো কিনা জানি না। আর হ্যাঁ, সবার কাছে বড় হয়ে গেলেও আমি কিন্তু এখনো তোমার সেই ছোট্ট টুনি। তোমার দেয়া আদরের সেই নাম আমি ভুলে যায়নি বাবা। তুমি জানো তো?

LIVE
বুনোপ্রাণীর দেশ গাম্বিয়া
অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে অভিনব প্রতারণা
কলার দাম ১ কোটি ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা!
বিশ্বের কয়েকটি নান্দনিক সড়ক