ফিচার

ভারত সরকার কি মিথ্যা বলছে?

আলী নাসিক আইমান

অরবিন্দ সুব্রামানিয়াম ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ভারত সরকারের প্রধান অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ২০১৯ এর জুন মাসে হার্ভার্ড সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত তার এক গবেষণা পত্রে তিনি দাবি করেছেন যে ভারত সরকারের প্রকাশিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সঠিক না। অর্থাৎ সহজ ভাষায় তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে মোদি সরকার ভারতের অর্থনীতি বিষয়ে একপ্রকার মিথ্যাচার করছে।

 

ভারত সরকারের দাবি ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের অর্থনীতি গড়ে ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সুব্রামানিয়াম এর দাবি সেই হিসাব ভুল। এ সময় ভারতের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির হার আসলে ছিল মাত্র ৪.৫ শতাংশ। ভারত সরকার ২০১১ সাল থেকে নতুন এক পদ্ধতি অনুসরণ করে জিডিপি হিসাব করে আসছে। আর সুব্রামানিয়াম এর মতে সেই পদ্ধতি সঠিক হিসাবটা দিতে পারছে না। অন্যদিকে সুব্রামানিয়াম এর হিসাবের পদ্ধতিও সর্বজন স্বীকৃত কোন পদ্ধতি নয়।

 

তবে, গত কয়েক মাস ধরেই ভারতের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জুনের শুরুতে সরকার স্বীকার করে নেয় যে, ২০১৮ এর জুন থেকে ভারতীয় অর্থনীতি শ্লথ হতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ভারতে বেকারত্বের হার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

 

সুব্রামানিয়াম তার গবেষণায় তুলনা করে বলেছেন যে, ভারতের অর্থনীতি যদি এত দ্রুত গতিতেই বৃদ্ধি পায় তাহলে গাড়ি, ভোগ্যপণ্য, ঋণ বা বিনিয়োগ এত ধীর গতিতে বা কোন কোন ক্ষেত্রে পেছনে এগোচ্ছে কেন? একই সূত্রে অভিযোগ অবশ্য এর আগেও উঠেছিল। ইতোপূর্বে সিনিয়র অর্থনীতিবিদরা সরকারের বিরুদ্ধে বেকারত্বের হার গোপন করার অভিযোগ এনে পদত্যাগ করেছেন। অর্থাৎ সরকারের নিজেদের লোকরাই অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত সরকারী তথ্যের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। আশঙ্কা রয়েছে, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নয়ন না করতে পারলে হয়ত অদূর ভবিষ্যতে কেউই ভারতের সরকারের অর্থনৈতিক উপাত্ত বিশ্বাস করতে পারবে না।

 

ভারত দীর্ঘদিন ধরে তাদের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও উপাত্তের গুণগত মান নিয়ে গর্ব করে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশও তাদের মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশংসা করেছে। তবে বর্তমানে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ভারতের দীর্ঘদিনের সেই সুনাম ধুলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। তাই অনেকেই মনে করছেন, যে কোন রাজনৈতিক মূল্য দিয়ে হলেও সরকারের উচিৎ হবে এ পরিস্থিতিকে পূর্বের মত বিশ্বাসযোগ্য অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। তবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ ইতোমধ্যেই সুব্রামানিয়াম এর গবেষণাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিটি বিষয়ে বিতর্কের জন্য প্রস্তুত বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ভারত সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টা ইতিবাচক দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

 

একই সাথে, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের জিএসপি সুবিধা বাতিল ও পাল্টা জবাব হিসেবে জুনে ভারতে মার্কিন পণ্যের উপর করারোপের মত বিষয়গুলো যে উদ্ভূত পরিস্থিতির খুব একটা অনুকূলে যাবে না তা বলাই বাহুল্য।

 

অর্থনীতি নিয়ে মোদি সরকার মিথ্যাচার করছে নাকি না, অথবা এটা নিতান্তই একটা হিসাবের পদ্ধতির গলদ কিনা, সেই বিতর্ক হয়ত আরও অনেক দিন চলবে। তার সাথেই হয়ত চলতে থাকবে মোদির বিরোধী পক্ষের এই বিষয়টাকে রাজনীতিকীকরণের চেষ্টা। তবে একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মোদি সরকার এ মেয়াদে শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক প্রকার বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া এবং তার পরপরই অর্থনৈতিক তথ্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন, সরকারের এই মেয়াদকে অনেক কঠিন করে তুলবে। তারই সাথে মোদি এবং বিজেপির ভাবমূর্তিকেও গভীর সঙ্কটে ফেলবে। তবে, সবকিছু মিলিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে মোদি সরকারের এই মেয়াদে রাজনীতি, ধর্ম, সবকিছু ছাপিয়ে অর্থনীতি হয়ে উঠবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

লেখক: গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী
LIVE
Play
ছাত্র সংগঠনগুলোর আয়ের উৎস কী?
হলুদের গুণাগুণ
ভয়ঙ্কর গ্যাস এসএফ-সিক্স
বোকা পাখি ডোডো