কাশ্মির ঘিরে টানা উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে হঠাৎ করেই শনিবার সন্ধ্যায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে এ ঘোষণা দিয়ে দাবি করেন, মার্কিন মধ্যস্থতায় দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প শনিবার এই খবর দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধ বন্ধের কৃতিত্ব দাবি করলেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আসলে কতটা ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্যও আসছে। আবার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে, যা এই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের পেহেলগামে গত ২২ এপ্রিল বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর নয়াদিল্লি-ইসলামাবাদ যে উত্তেজনা চলছিল, তা যুদ্ধের দিকে গড়ায় দুই সপ্তাহ পর গত ৮ এপ্রিল ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে সামরিক অভিযান চালালে। তারপর দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তেজনার পারদ যখন চরমে ওঠে, তখন তিন দিন পর যুদ্ধবিরতির খবর আসে।

যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা!
কীভাবে যুদ্ধবিরতি হলো : ভারত-পাকিস্তানে যখন শনিবার বিকাল, তখন ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ রাতের আলোচনার পর আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে ভারত ও পাকিস্তান একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ পরিস্থিতি উপলব্ধি করে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি উভয় দেশের নেতাদের অভিনন্দন জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ভারত ও পাকিস্তান কেবল যুদ্ধবিরতিতেই সম্মত হয়নি, নিরপেক্ষ কারও মধ্যস্থতায় বিস্তৃত আলোচনা শুরু করতেও রাজি হয়েছে।
রুবিও দাবি করেন, তিনি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত দুদিন ধরে ভারত-পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঘোষণা আসার পরপরই পাকিস্তান নিশ্চিত করে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এরপর ভারতও নিশ্চিত করে। তবে ভারতের তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধবিরতির সমঝোতাটি সরাসরি দুটি দেশের মধ্যে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার দাবিটি অনেকটা খাটো করা হয়। সেই সঙ্গে বলা হয়, আরও আলোচনার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নয়াদিল্লির এই বক্তব্য এলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের উদ্যোগের কথা বলা হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, আমরা এই অঞ্চলে শান্তির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্ব এবং সক্রিয় ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। এই আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পাকিস্তানি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে রুবিও চুক্তিটি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
কেন এই দ্বৈত বর্ণনা : কালের পর কাল ধরে বৈরী সম্পর্কে থাকা ভারত-পাকিস্তানের পরস্পরবিরোধী বিবরণ নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে দেখে বলে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার বিরোধী। অন্যদিকে পাকিস্তান বৈদেশিক সাহায্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বলে এ ধরনের প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানায়। ওয়াশিংটন ডিসির হাডসন ইনস্টিটিউটের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষণা ফেলো ড. অপর্ণা পাণ্ডে বলেন, ভারত-পাকিস্তান বা ভারত-চীন বা অন্য কোনো বিরোধে কখনোই মধ্যস্থতা মেনে নেয়নি নয়াদিল্লি। অন্যদিকে পাকিস্তান সবসময় আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা চেয়েছে তাই তারা এর প্রশংসা করবে।
শনিবারের যুদ্ধবিরতির আগের লড়াই উভয় পক্ষের দাবি, পাল্টা দাবি এবং ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়েছিল। এখন যেহেতু সংঘাত থেমেছে, উভয় পক্ষ কী অর্জন করেছে এবং কীভাবে শেষ হয়েছে, সেই সম্পর্কে এখন কৌতূহল তৈরি করেছে।
শনিবার কী ঘটেছিল : শনিবার সকালেও যখন লড়াই তীব্র ছিল, তখন বিকালে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা বেশ আশ্চর্য ঠেকেছে অনেকের কাছে। শনিবার ভোরে পাকিস্তান বলেছিল, ভারত তাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। সেই হামলা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির থেকে শুরু করে রাজধানী ইসলামাবাদের কাছে একটি সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। জবাবে ভারতের সামরিক বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলার কথাও জানায় ইসলামাবাদ। সেই সঙ্গে বলেছিল, ‘চোখের বদলে চোখ’।
কয়েক ঘণ্টা পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের শ্রীনগর ও জম্মু শহরে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। শেহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তান ভারতীয় আগ্রাসনের জোরালো জবাব দিয়েছে। অন্যের ভূখণ্ডে চার দিনের সরাসরি সামরিক হামলার পর সবারই আশঙ্কা ছিল, সংঘাত বাড়তেই থাকবে।

যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা!
যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে জড়াল : মাত্র দুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত-পাকিস্তান সংঘাত প্রশমনে ওয়াশিংটনের ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা নিয়ে তেমন জোর দিয়ে কিছু বলেননি। তিনি বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে বলেন, আমরা যা করতে পারি তা হলো উত্তেজনা কমাতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা। কিন্তু আমরা এমন কোনো যুদ্ধে জড়াব না, যা আমাদের কোনো বিষয় নয়, আর ওয়াশিংটনের এটি থামানোর কোনো সামর্থ্যও নেই।
তবে বাস্তবে ভ্যান্সের সেই কথার বিপরীত ঘটনা প্রমাণ করে যে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রও কতটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সিএনএনকে বলেন, সংঘাত কতটা তীব্র হতে পারে, শুক্রবার সে সম্পর্কে উদ্বেগজনক গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর ওয়াশিংটনের এতে ঢুকে পড়া ছাড়া বিকল্প ছিল না।
যুদ্ধবিরতি কি টিকবে : যদি ভারত ও পাকিস্তান আপাতত বিপজ্জনক অবস্থান থেকে সরে এসেছে, তবে যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, তা এখনও দেখার বাকি। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি শনিবার উভয় কাশ্মিরেই বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর বারবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছেন। পাকিস্তানও ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। তবে জোর দিয়ে বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির বিশ্বস্ত বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভারত-পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কাশ্মির দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রে। দুই প্রতিবেশী দেশ কয়েকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে। এবার পেহেলগামে হামলার পর নয়াদিল্লি সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ তোলে ইসলামাবাদে দিকে। তারা বলে, পাকিস্তান থেকে এই হামলার মদদ দেওয়া হয়েছে। সেই হত্যাকাণ্ডের পর দুটি দেশ প্রতিশোধমূলক নানা পদক্ষেপ নেয়। তার মধ্যে রয়েছে ভিসা স্থগিত করা, বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা, সিন্ধুর পানি চুক্তি স্থগিত করা ইত্যাদি। যুদ্ধবিরতি হলেও এখনও স্পষ্ট নয় যে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাহার করা হবে কি না? সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের মতে, যদিও যুদ্ধ এড়ানো গেল, স্থায়ী শান্তি আনতে গেলে দ্বিপক্ষীয় আস্থা ও বাস্তব অগ্রগতি জরুরি।

