অর্থনীতি, কলাম

রাইড শেয়ারিংয়ের অর্থনীতি

আলী নাসিক আইমান

মাত্র এক দশক আগেও কোথাও ‍যাওয়ার জন্য ভাড়ার বিনিময়ে গণপরিবহনের একমাত্র বিকল্প ছিল ট্যাক্সি বা রেন্ট-এ-কার। আমাদের দেশে মাত্র কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল ঠিক একইরকম। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সেই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে ২০১১ সালে, যখন উবার তাদের রাইড শেয়ারিং সেবা শুরু করে। বিশ্বব্যাপী উবার এর মতো এই ব্যবসা পৌঁছে যায় বাংলাদেশেও। বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং সেবা শুরু হয় ২০১৬ সাল থেকে। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত, দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ২০ টির বেশি প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

 

 

সাম্প্রতিক সময়ে রাইড শেয়ারিংয়ের ভবিষ্যৎ এবং অর্থনীতি বেশ আলোচনায় এসেছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান লিফট এবং উবারের নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে প্রবেশ করার কারণে বিনিয়োগকারীসহ সাধারন মানুষের মধ্যে এই ব্যবসার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিষয়টিকে আরও মজাদার করে তুলেছে দু’টি তথ্য। প্রথম হল যে, উবার এবং লিফট, দু’টির একটি প্রতিষ্ঠানও এ পর্যন্ত এক পয়সাও মুনাফা করেনি, যদিও তাদের কোটি কোটি গ্রাহক রয়েছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হল, পুঁজিবাজারে আসার পর থেকেই প্রতিষ্ঠান দুইটির শেয়ার মূল্য নিম্নমুখী রয়েছে। তারই সাথে, রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর চালকদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে এ সেবা প্রদানের মাধ্যমে যথেষ্ট রোজগার না হওয়া সহ লোকসান করার অভিযোগ তো রয়েছেই। এমনকি সে অভিযোগে উবার এর আইপিও আসার পূর্বে নিউ ইয়র্কে চালকদের ধর্মঘট করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এটা যেন কয়েক বছর আগে, রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা শুরু করার পর, রাইড শেয়ারিং সেবার প্রতিবাদে ট্যাক্সি চালকদের ধর্মঘট করার ঘটনার ঠিক উল্টো চিত্র। তাহলে রাইড শেয়ারিং কি আসলেই শুধু লোকসানেরই পথ? নাকি এর মধ্যে আসলেও কোন লাভ আছে? শত বছরের পুরনো ট্যাক্সির সিন্ডিকেটের একচেটিয়া ব্যবসার মডেলটাই কি তাহলে পরিক্ষীত সত্য হয়ে দাঁড়াবে?

 

রাইড শেয়ারিং সারা পৃথিবীতেই নতুন ধরনের একটি ব্যবসা। স্বাভাবিকভাবেই এই ব্যবসা নিয়ে খুব বেশি পূর্বাভাস দেওয়া সহজ বিষয় নয়। তারই সাথে এ বিষয়ে গবেষণার সংখ্যাও খুব কম। বাজার নিয়ে হয়তো প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু রাইড শেয়ারিংয়ের অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা এখনও হাতেগোনা। তাই এই বিষয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা করা বেশ কষ্টসাধ্য বিষয়ই বটে। এই লেখায় তাই তথ্য নয়, বরং তাত্ত্বিক বিষয়গুলোই প্রাধান্য পাবে।

 

কোম্পানিগুলোর ব্যবসা, সার্বিক অর্থনীতিতে রাইড শেয়ারিং এর অবদান ইত্যাদি বিষয়ের চেয়ে মনে হয় চালক ও যাত্রীদের ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি বা ব্যষ্টিক অর্থনীতির (micro economics) বিষয়টিই বেশি মানুষকে ঘোরপাক খাওয়ায়।

 

এ বিষয়টি প্রায় সন্দেহাতীত যে, যাত্রীদের জন্য রাইড শেয়ারিং সেবা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাভজনক। প্রথমেই চলে আসে, রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে যাত্রী, ট্যাক্সি বা সেরকম সেবার তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম খরচে পরিবহন সেবা নিতে পারে। তারই সাথে যোগ হয়ে যায়, বাসায় বসে এ্যাপের মাধ্যমে বাহন খুঁজে পাওয়ার সুবিধা। এর ফলে যাত্রীর পরিবহন খোঁজার সময় ও শ্রম, দু’টোই বাঁচে। আশপাশে থাকা সমস্ত বাহনের তথ্য একসাথে করে সবচেয়ে কাছের রাইডটি পাওয়ার সুবিধাও আসে তার সাথে। এর ফলে, বাজারে ওই মুহূর্তের সর্বনিম্ন মূল্য ও প্রতিযোগিতার ফায়দা যাত্রীর পকেটেই যায়।

 

একই কারণে চালকরাও একই ধরনের সুবিধা ভোগ করেন। এ্যাপের ফলে তারা বসে থেকেই যাত্রী নিশ্চিত করতে পারেন। যার কারণে, ট্যাক্সি বা আগের অন্যান্য পরিবহনের মতো অফ-পিক সময়ে তাদের যাত্রীর জন্য তেল পুড়িয়ে ঘুরতে হয় না।

 

রাইড শেয়ারিংয়ের একটি বড় সুবিধা হল, এটি গাড়ির মালিকদের মালিকানার ব্যয় কমিয়ে দেয় যাকে cost of ownership বলে। তবে এই সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের জন্য যাদের গাড়ী বা মোটরসাইকেল মূলত ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্য এবং যারা সেই গাড়ী রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য খন্ডকালীন ব্যবহার করেন। তাত্ত্বিকভাবে সেবাটি শুধুই রাইড শেয়ারিং এর জন্য, বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহনের জন্য তৈরি নয়। অতএব, যিনি রাইড দিচ্ছেন, তিনি যাত্রীর গন্তব্যের দিকেই যাচ্ছিলেন এবং বাড়তি সুবিধা হিসেবে একজন যাত্রী নামিয়ে তিনি টাকা আয় করছেন। এই তত্ত্ব মেনে যদি কেউ রাইড শেয়ারিং করে থাকেন তাহলে তার পুরো টাকাটাই আসলে বাড়তি আয়, যেটি কিনা তার ওই গাড়ি বা মোটরসাইকেলের নিয়মিত খরচ কিছুটা মিটিয়ে দিচ্ছে।

 

কিন্তু যিনি বানিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন করে লাভ করতে চেষ্টা করছেন, তাকে এই সুবিধার বাইরে রাইড শেয়ারিং এর মাধ্যমে বেশ কিছু খরচেও পড়তে হয়। সেই খরচগুলোর প্রথমেই আসে তার গাড়ীর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। বানিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে তিনি গাড়িটি সাধারন ব্যক্তিগত ব্যবহারের চেয়ে কয়েকগুন বেশি ব্যবহার করছেন। স্বাভাবিকভাবেই, ওই গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কয়েকগুন বেড়ে যায়। যেহেতু তিনি গাড়িটি বানিজ্যিকভাবে লাভের জন্য ব্যবহার করছেন, তাই এই বাড়তি খরচ মেটাতে হবে রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া ভাড়া থেকেই।

 

তারই সাথে যোগ হয় গাড়ির অবচয় বা depreciation ব্যয়। অবচয় এমন একটি খরচ যেটি সচরাচর সাধারন মানুষ হিসাব করে থাকেন না কিন্তু এই হিসাব না করার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই লোকসানে পড়তে হয়। মনে করুন, আপনি ১০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে একটি গাড়ি কিনলেন। গাড়িটি হয়ত ১০ বছর চালানোর যোগ্য থাকবে। অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে গাড়িটির মূল্য ১ লক্ষ টাকা করে কমে যাচ্ছে। এই খরচটিই অবচয়, যেটি আপনি হিসাব করছেন না কিন্তু ১০ বছর পরে যখন আপনি নতুন আরেকটি গাড়ি কিনবেন তখন এই টাকা প্রয়োজন হয়ে পড়বে।

 

এখন যদি রাইড শেয়ারিং এর কারণে গাড়িটি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে, ১০ বছরের জায়গায় ৫ বছর পরেই গাড়িটি চালানোর অযোগ্য হয়ে পড়ে তাহলে কিন্তু আপনার অবচয় খরচ বেড়ে গেল। এখন আপনাকে প্রতি বছর ১ লক্ষ টাকা বাড়তি অবচয় হিসাব করতে হবে এবং এই টাকা ওই রাইড শেয়ারিং থেকেই আয় করতে হবে। তা নাহলে আপনি আসলে আপনার গাড়িটির আয়ু কমিয়ে যাত্রীকে তার গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন। এই লোকসান আপনার নজরে আসবে তখন, যখন ১০ বছরের স্থলে মাত্র ৫ বছর পর আপনি নতুন গাড়ি কিনতে বাধ্য হবেন।

 

এ সকল খরচের বাইরে আয়কর, ইন্স্যুরেন্স, সরকারী ফি সহ অন্যান্য ব্যয় তো রয়েছেই। আর উপরের এই সকল খরচ বাদ দেয়ার পর যা থাকবে, সেটাই হয়ে দাঁড়াবে আপনার পরিশ্রম ও সময়ের মূল্য।

 

তবে, গাড়ির বয়স, মডেল, অবস্থা ইত্যাদির কারণে এই হিসাবের বিস্তর তারতম্য হয়ে থাকে। পশ্চিমা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই চালক যে অর্থ উপার্জন করে তাতে তাদের লোকসান হয়ে থাকে। যদিও আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় যে চালক নগদ টাকা লাভ করছে, তবুও অবচয়সহ অন্যান্য যে সকল খরচ নগদ নয় বরং হিসাবের খাতায় জমতে থাকে, সেই খরচগুলোকে যদি হিসাবের মধ্যে আনা হয় তাহলে লাভের অঙ্কটা অনেক সময়ই লোকসানের দিকে চলে যেতে পারে।

 

বানিজ্যিকভাবে যে সকল পরিবহন চলে, তাদের ভাড়ার হিসাবের ক্ষেত্রে এ সকল বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই কারণেই বানিজ্যিক পরিবহনের ভাড়া রাইড শেয়ারিংয়ের তুলনায় খানিকটা বেশি হয়ে থাকে।

 

তবে, রাইড শেয়ারিং কোম্পানীগুলো আত্মরক্ষায় বলে থাকে যে তারা কোনো বানিজ্যিক পরিবহন প্রতিষ্ঠান নয়। শুধু আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে যাওয়ার পথে অন্য কাউকে নিয়ে রাইড শেয়ার করে বাড়তি আয় করার সুযোগ করে দেয় তারা এবং এ যুক্তিটিই মনে হয় সবচেয়ে সঠিক।

 

তাছাড়াও, রাইডের পাশাপাশি খাবার ও অন্যান্য পণ্য ডেলিভারি, একই পথে একসাথে একাধিক যাত্রী পরিবহন (pooled ride), কোম্পানির দেওয়া বোনাস ও অফার ইত্যাদির মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলো নানাভাবে চালকদের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে, যাতে কাউকেই লোকসান না করতে হয়।

 

কিন্তু শেষে বলতেই হয় যে, গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে তার চালকের চালানোর দক্ষতা থেকে শুরু করে বাহনটির অবস্থা ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক সকল বিষয়ই লাভ হবে না লোকসান সেটি নির্ধারনে ভূমিকা রাখে। বেশিরভাগ গবেষণায়ই দেখা গেছে হাজার হাজার ডলার লোকসান থেকে শুরু করে প্রতি মাসে কয়েক হাজার ডলার আয়, উভয়ই করছেন রাইড শেয়ারিং চালকরা। তবে আপনি যাতে দীর্ঘ সময় রাইড শেয়ারিং করার পর লাভ বা লোকসানের বিষয়টি উপলব্ধি না করেন, সে উদ্দেশ্য থেকেই এই আলোচনা। তাই রাইড শেয়ারিং করলে জানা-অজানা সকল আয় ও ব্যয়ের বিষয়গুলো হিসাব করেই শেষ হিসাবটা কষতে হবে।

 

তবে, রাইড শেয়ারিং যে দীর্ঘদিন ধরে একচেটিয়া পরিবহন ব্যবস্থায় অধিকতর ও সহজতর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরিবহন খাতকে আরও গতিশীল করে তুলছে তাতে সন্দেহ নেই। একই সময়ে, সার্বিক অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান তৈরি, পরিবহন ব্যয় হ্রাস, সাময়িক ও সহজ নগদ আয়ের সুযোগ তৈরি ইত্যাদির মাধ্যমে অর্থনীতিতে একটি ভিন্ন আঙ্গিক তৈরি করেছে রাইড শেয়ারিং এ্যাপগুলো। সার্বিক অর্থনীতিতে এগুলোর প্রভাব পুরোপুরি বুঝতে হয়ত আরও কয়েক বছর সময় চলে যাবে। কিন্তু সে পর্যন্ত অনেকের ভাগ্যই যে রাইড শেয়ারিং প্রযুক্তি বদলে দিবে তা কিন্তু বলাই যায়।

লেখক: উদ্যোক্তা ও গবেষক
LIVE
Play
রাইড শেয়ারিংয়ের অর্থনীতি
প্রাণি নির্যাতন- মানুষ নির্যাতনের প্রাথমিক পর্যায়
প্রতিরোধ করো!
আজি হতে শতবর্ষ আগে