কলাম

শবে মিরাজের উদ্দেশ্য কি? 

মো. মাসুম বিল্লাহ বিন রেজা

মহানবীর (সা.) মিরাজ কেন হয়েছিল? মি‘রাজের নিগূঢ় রহস্য কি? এসব প্রশ্নের জবাব একমাত্র মহান আল্লাহই ভাল জানেন। এরপরেও পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদীস, ইতিহাস এবং সমসাময়িক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে কতগুলো কারণ বের হয়ে আসে। যেমন-

 

* মহানবীর (সা.) জন্মের পূর্বেই পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। জন্মের ৫ কিংবা ৬ বছর পরে মাতা আমিনার মৃত্যু হয়। পিতা-মাতার ইন্তেকালের পর তিনি দাদা আব্দুল মুত্তালিবের কাছে লালিত-পালিত হন। মহানবীর (সা.) বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন হলো, তখন দাদাও মৃত্যুবরণ করলেন। এরপরে তিনি চাচা তালিবের কাছে লালিত-পালিত হন। মহানবী (সা.) যুবক হলে খাদিজার (রা.) সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ৪০ বছর বয়সে মহানবী (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্ত হলেন।

 

১০ বছর গোপন ও প্রকাশ্যে ওহীর দা‘ওয়াত প্রদান করলেন। নবুওয়াতের ১১তম বছরে কাফিরেরা মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি করলো। এ কঠিন সময়ে মহানবীর (সা.) ঢাল ছিলেন চাচা আবু তালিব। তিনি স্বীয় ক্ষমতার প্রভাবে কাফিরদের অত্যাচার হতে মহানবীকে (সা.) রক্ষা করতেন। ঘরের ভেতরে খাদিজা (রা.) মহানবীর (সা.) দুঃখ দূর করার জন্য বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতেন।

 

মহান আল্লাহর কি ইচ্ছা! এ বছরে অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে আবু তালিব ও খাদিজা (রা.) মৃত্যুবরণ করলেন। এঁদের মৃত্যুতে রাসূল (সা.) শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। হৃদয়ের সুপ্ত বেদনাগুলো দূর করার জন্য তখন আল্লাহ মহানবীকে (সা.) তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে নিয়ে আসেন।

 

আল্লামা সফিউর রহমান মুবারকপুরী (র.) বলেন, ‘একদিকে নবীর (সা.) দা‘ওয়াতী কাজের সফলতা আর অন্যদিকে নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের চরম পর্যায় অতিক্রম হচ্ছিল। এ দু’য়ের মাঝামাঝি অবস্থায় দূরদিগন্তে মিটমিট করে জ্বলছিল তারকার মৃদু আলো, এমনি সময়ে মি’রাজের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল।’

 

* সূরা ইসরার শুরুতে মাত্র একটি আয়াতে আল্লাহ পাক ইসরা ও মি‘রাজের এ ঘটনা এবং তার উদ্দেশ্য অতীব সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। ইহুদীদের অপকীর্তিসমূহের ভবিষ্যৎ পরিণাম (ফল) বর্ণনা করেছেন। এখানে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস ভ্রমণ করানোর তাৎপর্য হতে পারে এই যে, অতিসত্বর পৃথিবীতে ইহুদীদের কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বায়তুল মুকাদ্দাসে ও পৃথিবীতে সর্বত্র মুসলিমদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৫ হিজরীতে এটি বাস্তবায়িত হয় ওমর ফারুকের (রা.) হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের মাধ্যমে রাসূলের (সা.) মৃত্যুর চার বছরের মাথায়। উল্লেখ্য যে, ইহুদী থেকে মুসলমান হওয়া সাহাবী কা‘ব আল আহবাবের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে ছাখরাকে পেছনে রেখে সলাত আদায় করেন, যেখানে মি‘রাজের রাতে রাসূল (সা.) সলাত আদায় করেছিলেন। (আহমাদ, ইবন কাছীর)

 

অতঃপর তৎকালীন বিশ্বের সকল পরাশক্তি মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকারে বাধ্য হয়। এরপর উমাইয়া ও মিসরের ফাতেমীয় খেলাফাত সারাবিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে।

 

সর্বশেষ তুরস্কের ওসমানী খেলাফাত বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মাত্র ১৯২৪ খৃষ্টাব্দে শেষ হয়। মুসলমান আবারো তার হারানো কর্তৃত্ব ফিরে পাবে যদি সে ইসলামের পথে ফিরে আসে। সূরাহ ইসরায় বিশ্ববিজয়ের এই ইঙ্গিতটি দেয়া হয়েছিল এমন একটি সময়ে যখন রাসূল (সা.) জনগণ কর্তৃক নিন্দিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় মক্কার পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। এতে বুঝা যায় যে, মূল বিজয় নিহিত থাকে সঠিক আক্বীদা ও আমলের মধ্যে, অর্থ-বিত্ত ও জনশক্তির মধ্যে নয়।

 

মি‘রাজের ঘটনা সংঘটিত হয় ১২ নববী বর্ষের হজ্জের মওসূমে আক্বাবায়ে উলার কিছু পূর্বে অথবা ১৩ নববী বর্ষের হজ্জের মওসূমে অনুষ্ঠিত আক্বাবায়ে কুবরার পূর্বে। অর্থাৎ মি‘রাজের ঘটনার পরপরই ইসলামী বিপ্লবের পূর্বশর্ত হিসেবে ইমারাত ও বায়‘আতের ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয় মিনা প্রান্তরে এবং তার পরেই তিনি মদীনায় হিজরত করেন। অতঃপর সেখানে ইসলামী সমাজের রূপরেখা বাস্তবায়িত হয়।

 

* মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ দ্বীন হল, ইসলাম। দ্বীন (ইসলাম) প্রচার করা ছিলো নবীর (সা.) দায়িত্ব। তিনি মানুষ ও জিনজাতিকে জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ভয় দেখিয়েছেন অর্থাৎ যারা দ্বীন গ্রহণ করবে তারা আখিরাতে জান্নাত লাভ করবে, আর যারা দ্বীনকে অস্বীকার করবে তারা আখিরাতে জাহান্নামে যাবে। রাসূলের (সা.) ঈমান সুদৃঢ় ও মজবুত করার জন্য মহান আল্লাহ তাঁকে স্বচক্ষে জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, হাওযে কাওছার ইত্যাদি দেখিয়েছেন। কেননা সংবাদ কখনো স্বচক্ষে দেখার মতো হয় না। অদৃশ্য জগতের যেসব খবর নবীদের মাধ্যমে জগদ্বাসীর নিকটে পৌঁছানো হয়, অহির মাধ্যমে প্রাপ্ত সেসব খবর এর সত্যতা স্বচক্ষে যাচাইয়ের মাধ্যমে রাসূল (সা.)সহ বিশ্ববাসীকে নিশ্চিতভাবে আশ্বস্ত করা হলো।

 

* রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রাসূল হলেন, হযরত মুহাম্মাদ (সা.)। এ শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য আল্লাহ তাঁকে মিরাজে নিয়েছেন। পূর্বে ইব্রাহীম ও মূসা (আ.) কে দুনিয়াতেই আল্লাহ স্বীয় কুদরতের কিছু নমুনা দেখিয়েছেন। (সূরা আনয়াম, ৭৬; ত্বহা, ২৩) আর আমাদের নবী (সা.) আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এ রাসূলদের মধ্য হতে আমি কাউকে কারো ওপর প্রাধান্য দিয়েছি।’ (সূরা বাকারাহ, ২৫৩)

 

শুধুমাত্র আমাদের নবীকে আখিরাতের দৃশ্য স্বচক্ষে দেখিয়ে প্রমাণ করা হল যে, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী। পূর্বে কেউ এ সুযোগ পায়নি এবং কখনোও পাবে না।

 

* পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস গবেষণা ও অনুসরণের মধ্যেই দুনিয়ায় সর্বোচ্চ উন্নতি এবং আখিরাতে মুক্তি ও সম্মান পাওয়া সম্ভব। অন্য পথে মানব জাতির সত্যিকারের উন্নতি ও মঙ্গল নিহিত নেই। বস্তুতঃ মি‘রাজের পথ ধরেই মানুষ দুনিয়াতে কেবল চন্দ্রবিজয় নয় বরং এর চেয়ে বড় বিজয় এর পথে উৎসাহিত হতে পারে। একইভাবে সে আখিরাতে জান্নাতুল ফিরদাউস লাভে ধন্য হতে পারে।

 

* মিরাজ প্রমাণ করেছে, আল্লাহ নিজ সত্তায় নিজ আরশে সমাসীন। (সূরা ত্বহা, ৫) তবে তাঁর ইলম ও কুদরত সর্বত্র বিরাজমান। (সূরা ত্বলাক, ১২; বাকারাহ, ১০৮) তিনি নিরাকার নন, বরং তাঁর নিজস্ব আকার রয়েছে। (সূরা ছোয়াদ, ৭৫; মায়েদাহ, ৬৪) তবে তাঁর তুলনীয় কিছু নেই। (সূরা শূরা, ১১) তিনি কথা বলেন, শোনেন এবং দেখেন।

 

* মিরাজে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত উপহার দেয়ার মাধ্যমে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও ভীতিপূর্ণ ভালবাসার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত সৎ মানুষ তৈরি হতে পারে এবং প্রকৃত অর্থে সামাজিক শান্তি, উন্নতি ও অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।

 

অতএব সমাজ বিপ্লবের আবশ্যিক পূর্বশর্ত হল, মানুষের মধ্যকার আত্মিক ও নৈতিক বিপ্লব সাধন। সলাতই হল, আত্ম সংশোধনের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান। অনেকে মনে করে, সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতি সম্ভব। এটি ভুল ধারণা। কারণ ইসলামে জিহাদ (প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা) স্বীকৃত, জঙ্গিবাদ (সন্ত্রাসবাদ) নয়।

 

লেখক: প্রভাষক, শাহ মখদুম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, লেখক, টিভি ও রেডিও আলোচক
LIVE
Play
ভারত সরকার কি মিথ্যা বলছে?
ভারতকে কি হারাতে পারবে নিউজিল্যান্ড?
কতটা কঠিন হবে বাংলাদেশের সেমিফাইনাল?
রাইড শেয়ারিংয়ের অর্থনীতি