বাংলাদেশ, শিল্প সাহিত্য, স্মরণ

‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’

মৃত্যুর পাঁচ মাস আগে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল লেখেন, ‘কোনো সরকারি সাহায্য কিংবা শিল্পী, বন্ধুবান্ধবের সাহায্য আমার দরকার নাই। আমি একাই যথেষ্ট। শুধু অপারেশনের আগে ১০ সেকেন্ডের জন্য বুকের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা আর কোরআন শরিফ রাখতে চাই।’

 

এই হলো বীরমুক্তিযোদ্ধা, গীতিকবি, সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের শেষ ইচ্ছা। অনেকটা নীরবে নিভৃতে মঙ্গলবার ভোর চারটায় রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সাধক। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

দীর্ঘদিন ধরে অসুখে ভুগছিলেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি জানান, ‘একটি ঘরে ছয় বছর গৃহবন্দী থাকতে থাকতে আমি আজ উল্লেখযোগ্যভাবে অসুস্থ। আমার হার্টে আটটা ব্লক ধরা পড়েছে। এরইমধ্যে কাউকে না জানিয়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে সিসিইউতে চার দিন ছিলাম। আগামী ১০ দিনের মধ্যে হার্টের বাইপাস সার্জারি করানোর জন্য প্রস্তুত আছি।’

 

১৯৭০ দশকের শেষ ভাগ থেকে অমৃত্যু বাংলাদেশ চলচ্চিত্রসহ সংগীতশিল্পে সক্রিয় ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তার নিয়মিত পথচলা শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। তিনি অসংখ্য গানে সুর করেছেন, যার অধিকাংশই তার নিজের রচনা। ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

 

বুলবুলের উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে আছে  ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেললাইনের ধারে, সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন।’ ‘আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি’, ‘ও আমার মন কান্দে, ও আমার প্রাণ কান্দে’, ‘আইলো দারুণ ফাগুনরে’, ‘আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা’, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকব’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়’, ‘বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম’,  ‘আম্মাজান আম্মাজান’ ‘পড়ে না চোখের পলক’, ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে’, ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা, হৃদয়ে সুখের দোলা’, ‘তুমি আমার এমনই একজন’ প্রভৃতি।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জন্ম ঢাকার পল্টনে। ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি। পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালির বেগমগঞ্জ। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। সে সময় ঢাকার আজিমপুরে ওয়েস্টটেন্ট হাইস্কুলে পড়ালেখা করতেন তিনি। তার পিতা মৃত ওয়াফিজ আহমেদ ও মাতা ইফাদ আরা নাজিমুন নেসা। স্নাতক ডিগ্রিধারী বুলবুল দেশের সুপরিচিত গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক।

 

তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, শিখা অনির্বাণ পদক এবং রাষ্ট্রপতির পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করে দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথমটি ছিল ২০০১ সালে ‘প্রেমের তাজমহল’ আর দ্বিতীয়টি ছিল ২০০৫ সালে ‘হাজার বছর ধরে’ ছবির জন্য। এছাড়াও ২০১৪ সালে শহীদ আলতাফ মাহমুদ পদক, বাচসাস পুরস্কার, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস।

 

 

১৫ বছর বয়সে স্কুলছাত্র থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন বুলবুল। প্রথমে বন্ধু সজিবের নেতৃত্বে বিহারিদের অস্ত্র ছিনতাই করে একটি ছোট মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করেন তারা। জিঞ্জিরায় প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ঘাঁটি তৈরি করে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বেশ কিছু প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। পরে বুলবুল তার বড় ভাই ক্র্যাক প্লাটুনের বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ টুলটুলের সঙ্গে ঢাকায় বেশ কিছু গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন। ওয়াই বা ইয়াং প্লাটুনের বীর এ যোদ্ধা কয়েকবার পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে আটক হয়ে পাশবিক ও রোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার হন।

 

সবশেষে তিনি ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ফের বন্ধু সজিবের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সশস্ত্র যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন।

 

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সাক্ষ্যদানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকেসহ কয়েকজনকে আটক, কয়েকজনকে হত্যা এবং তার নিজের ওপর লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দেন। বর্ণনা করেন, দেশীয় দোসরদের সেইসব ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতনের কথা।  সাক্ষী ও সকলের নীরব কান্নায় বেদনাবিধূর হয়ে পড়ে ট্রাইব্যুনালের পরিবেশ।

 

১৯৭১ এ ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় বুলবুল শহীদ সিরু মিয়া দারোগা, তার সন্তান শহীদ কামাল আনোয়ার ও শহীদ নজরুলসহ ৩৮ জনকে ঈদের দিন রাতে কারাগার থেকে বের আনার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ওই ৩৮ জনকে পরে হত্যা করে গণকবর দেয় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা, যে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১১তম সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন আহমেদ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৈরতলা দক্ষিণপাড়া গ্রামের সোনা মিয়া। ১৪তম সাক্ষী হিসেবে নির্মম সে গণহত্যার আরো বিস্তারিত বর্ণনা করেন বুলবুল।

 

এই বীরমুক্তিযোদ্ধ ও সংগীত সাধকের  আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

ফই/আনি/ফই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LIVE

হেঁচকি ওঠার কারণ ও কমানোর উপায়
মশা তাড়াতে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা যায়
গ্রিন টির ভালো-মন্দ
পাহাড়ের ভাষা, সমতলের ভাষা