ফিচার , , , , , , , , , , ,

সেন্টিনেলিজ: রহস্যময় দ্বীপের অধিবাসীরা

জাহাঙ্গীর হোসেন

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে একটি দ্বীপ উত্তর সেন্টিনেল, এটি বঙ্গোপসাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। প্রশাসনিকভাবে, দ্বীপটি ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ আন্দামানের অন্তর্গত।

আন্দামান নিকোবর অঞ্চলের এ দ্বীপটি দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপের ওয়ানডুর শহর থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার ও পোর্ট ব্লেয়ারের ৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং দক্ষিণ সেন্টিনেল দ্বীপের ৫৯.৬ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। দ্বীপটির বাইরের সীমা মূলত বর্গাকার। পুরো দ্বীপটি গভীর সবুজ ঘন বনভূমি দিয়ে  ঘিরে আছে। সেন্টিনেল দ্বীপটির চারপাশে প্রবাল প্রাচীর সমুদ্র সৈকত থেকে ০.৯৩ এবং ১.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।

উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ

এই দ্বীপে বসবাস করে রহস্যময় আদিবাসী জনগোষ্ঠী সেন্টিনেলিজরা। দ্বীপের নামানুসারেই তাদের নাম রাখা হয়েছে। প্রায় ৬০ হাজার বছর ধরে সেন্টিনেলিজরা এই দ্বীপে বসবাস করছে বলে নৃতাত্ত্বিকগণের অভিমত।

এই দ্বীপটির সঠিক জনমিতি ও বৃক্ষ পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়নি! মধ্যযুগে এ দ্বীপের অধিবাসীদের ‘নরখাদক’ মনে করতেন অনেকেই!

ধারণা করা হয়, উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপের অধিবাসীর সংখ্যা সর্বনিম্ন ৩৯ থেকে ২৫০ এর মধ্যে এবং সর্বোচ্চ তা ৫০০ পর্যন্ত হতে পারে। ২০০১ সালে উপগ্রহ পরিচালিত ভারত সরকারের শুমারি অনুসারে ৩৯ জন মানুষের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়। যাদের মধ্যে ছিলেন ২১ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী। তবে পর্যবেক্ষণকারীদের ধারণা দ্বীপে আরো অনেক বসবাসকারী থাকতে পারে।

লতাপাতা দিয়ে নির্মিত সেন্টিনেলিজদের কুঁড়েঘরগুলোর কোন দেয়াল নেই, মাথার ওপর ছাউনিটি মাটি পর্যন্ত প্রসারিত থাকে। মাছ ধরে এবং শিকার করেই তারা বেঁচে থাকে।

সেন্টিনেলিজদের ধর্ম সম্পর্কে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট কোনো ধারণাই পাওয়া যায়না। তবে আন্দামানের আরেক আদিবাসী ‘ওঙ্গে’দের সঙ্গে এদের ভাষার কিছুটা মিল পাওয়া যায়।

দ্বীপের বাইরের মানুষদের প্রতি তাদের আচরণ বেশ রক্ষণশীল। দ্বীপের বাইরের মানুষের সংসর্গ তাদের খুব একটা পছন্দ নয়।

এ আদিবাসীদের সাথে মানুষের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১৮৮০ সালে। ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ এমভি পোর্টম্যানের নেতৃত্বে একটি দল ঐ দ্বীপে গিয়ে আদিবাসীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি এই জনগোষ্ঠীর এক প্রৌঢ় দম্পতি এবং তাদের চার শিশুকে তুলে নিয়ে আসেন আন্দামানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। তাদের নতুন পোশাক ও খাবার দেয়া হয়। কথা বলানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু, কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যু হয় প্রৌঢ় দম্পতির। বাকিদের কাছ থেকে কোন তথ্য না পেয়ে আবার দ্বীপে রেখে আসা হয়। এ ঘটনায় পর ‘সভ্য মানুষদের’ প্রতি সেন্টিনেলিজদের আক্রোশ আরো বহু গুণে বেড়ে যায়।

১৯৭৫ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একজন চিত্রগ্রাহক প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উদ্দেশে যান সেন্টিনেল দ্বীপে। আদিবাসীদের বিষাক্ত তীরের আঘাতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।

ভারতের প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক ও ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক টিএন পণ্ডিত সেন্টিনেলিজদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য বেশকিছু অভিযান পরিচালনা করেন। যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা হিসেবে দ্বীপটির তীরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপহার যেমন- খাবার, পোশাক ইত্যাদি রেখে আসা হতো। কিন্তু অপর দিক থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

সেন্টিনেলিজদের একজনকে নারকেল দিচ্ছেন টিএন পন্ডিত

সুনামির পর ২০০৪-সালে হেলিকপ্টারে উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু, দ্বীপের অধিবাসীরা ত্রাণকর্মীদের ওপর উল্টো আক্রমণ চালায়। অবশেষে তাদের বিরক্ত না করে ফিরে আসে তারা।

২০০৬ সালে দুই জেলে সেন্টিনেল দ্বীপে অনুপ্রবেশ করলে তাদের হত্যা করা হয়। এরপর সেন্টিনেলিজরা মরদেহ উদ্ধারে আসা হেলিকপ্টারটিকেও তীর নিক্ষেপ করে দ্বীপে নামতে দেয়নি।

হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে তীর ছুড়ছেন একজন সেন্টিনেলিজ

তারপর ধীরে ধীরে ঐ দ্বীপের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ভারত সরকার। নিষিদ্ধ দ্বীপের তকমা এঁটে যায় উত্তর সেন্টিনেলের গায়ে। দ্বীপের চারপাশে তিন নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সীমানা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয় ভারত সরকার কর্তৃক।

দ্বীপটি ভারতীয় সুরক্ষার অধীনে কার্যকরভাবে একটি সার্বভৌম অঞ্চল। ২০১৮ সালে, পর্যটনকে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টায়, ভারত সরকার, ২০২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর অবধি, সীমাবদ্ধ অঞ্চল হুকুমনামা (আরএপি) শাসন থেকে ২৯ টি দ্বীপকে বাদ দিয়েছে; যার মধ্যে উত্তর সেন্টিনেল আছে। তবে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে, সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে নিষেধাজ্ঞার শিথিলকরণ কেবল প্রাক-অনুমোদিত ছাড়পত্রের সাথে, গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদদের অনুমতি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল, সেন্টিনেল দ্বীপগুলি ঘুরে দেখার জন্য।

২০১৮ সনের ১৭-নভেম্বর মার্কিন ধর্মপ্রচারক ও পর্যটক জন এলেন চাও উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে গিয়েছিলেন খৃস্ট ধর্ম প্রচারের জন্য। কিন্তু সেখানে দ্বীপটির অধিবাসীদের হাতে মৃত্যু হয় তার। অবৈধভাবে যে ছয়জন মৎস্যজীবীর সহায়তায় এই তরুণ মার্কিন যাজক সেখানে পৌঁছেছিলেন, তাদের গ্রেপ্তার করে ভারত সরকার। জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারা গেছে, সেই যাজক দ্বীপে নামার পরপরই তীর ছুটে আসতে থাকে। এরপর সেন্টিনেলিজরা তাকে বেঁধে টেনে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে দেখেছেন মৎস্যজীবীরা।

সেন্টিনেলিজদের ওপর গবেষণা করছেন, এমন নৃতত্ত্ববিদরা লক্ষ্য করেছেন যে, মৃতদেহ পুঁতে দেওয়ার কয়েক দিন পরে এরা সেই জায়গাতে ফিরে এসে কবর খুঁড়ে সেই দেহ বের করে। তারপর মৃতদেহকে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে সমুদ্রের ধারে দাঁড় করিয়ে রাখে। এ ভাবেই তারা বহিরাগতদের ইঙ্গিত দেয়; অনুপ্রবেশকারীরা সাবধান! আমাদের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে এখানে এলে তোমাদেরও এই পরিণতি হবে।

দ্বীপটি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের অনেকে মনে করেন দ্বীপবাসীদের সাথে যোগাযোগের উদ্যোগ শুরু করা উচিত। তবে তাদের বিরক্ত করা অবশ্যই উচিত হবে না। তারা আলাদা থাকতে চাইলে সেটিকে সম্মান জানানো উচিত।

LIVE
বাংলাদেশে ২০১৯ সালের সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা
বুনোপ্রাণীর দেশ গাম্বিয়া
অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে অভিনব প্রতারণা
কলার দাম ১ কোটি ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা!