কলাম

দক্ষ হব, কিন্তু কিসে?

আলী নাসিক আইমান

ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার দিন আজ। গত এক মাস বিশ্বকাপ চলাকালীন সারা বিশ্বের মানুষই ফুটবলের আনন্দে মজে কিছুটা হলেও যুবক বয়সের উচ্ছ্বলতায় ফিরে গিয়েছিলেন। অনেককেই দেখা গেছে সেই যুবক বয়সের মাঠ দাপিয়ে খেলার স্মৃতি রোমন্থন করতে। আবার অন্য অনেকের আক্ষেপ জেগে উঠেছে, ‘বৈষয়িক কাজের তাগিদে মাঠ না ছাড়লে আজকে হয়ত থাকা হত এমন কোন খেলায় তারকা হয়ে’। মোটের উপর নিজের যুবক বয়সের ফুটবল দক্ষতাই প্রচার করতে ব্যস্ত ছিল অনেকে। আর সেই বিশ্বকাপের ফাইনালের দিনই কাকতালীয়ভাবে (?) এ বছরের বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস (World Youth Skills Day)। দিবসটি জাতিসংঘ কতৃক প্রথম স্বীকৃত ও উদযাপিত হয় ২০১৫ সালে।

 

আমাদের বাংলাদেশের জন্য কিন্তু দিনটির গুরুত্বই অন্যরকম। এক হিসাবে দেশের তুলনায় বাংলাদেশ নিজেই হয়তবা কৈশোর ছেড়ে যুবক বয়সে গড়াচ্ছে মাত্র। আবার অন্য হিসাবে দেশের জনসংখ্যার গড় বয়স যেখানে মাত্র ২৬.৭ বছর সেখানে এই জাতিকে যুবক জাতি বললেও হয়ত ভুল হবে না। অতএব, বুঝাই যাচ্ছে যে যুব দক্ষতার উপর দেশের অর্থনীতি ও প্রগতি কতটা নির্ভরশীল।

 

কিন্তু এসব তো গেল গথবাঁধা কিছু কথা। আজকের দিবসটি পালনে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও হয়ত বক্তারা এ ধাঁচের তাত্ত্বিক বুলিই আওড়াবেন। কিন্ত এতসব কথার পর সকলের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, তাহলে যুবসমাজ কিসে দক্ষতা অর্জন করবে? এমন প্রশ্নে অনেকেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে উত্তর দিবেন, কম্পিউটার অথবা তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতাই সবচেয়ে বেশী জরুরী। আবার অনেকের মতে হয়ত কারিগরী শিক্ষায় দক্ষ হয়েই দেশের উন্নয়ন সম্ভব। কারো মত আবার ভাষায় দক্ষতা বা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির পক্ষে। তারা কেউ যে ভুল,  এমনটি নয়। তবে প্রশ্ন থাকে যে, সকলেই কি একই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন জরুরী? আবার, সকলে একই বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের পর চাকরির বাজারে অথবা কাজের ক্ষেত্রে সেই দক্ষতার মূল্যই বা কতটুকু থাকবে? তাহলে কি এমন কোন দক্ষতাই নেই, যা কিনা সকলের জন্যই জরুরী, যেই দক্ষতা রপ্ত করে সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফলভাবে অবদান রাখতে পারবে?

 

আশ্চর্যজনকভাবে, সবচেয়ে উপেক্ষিত এবং অবহেলিত দক্ষতাটাই সেই প্রশ্নের উত্তর। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই দক্ষতাটি হল নেতৃত্ব বা leadership।

 

আপনারা অনেকে এর মধ্যেই বিভ্রান্ত (confused) হয়ে গিয়েছেন। অন্য অনেকে আবার বেশ বিরক্ত। আমাদের দেশে অনেক সময়ই নেতৃত্ব প্রদানকারী মানুষ অর্থাৎ ‘নেতা’ শব্দটি নেতিবাচক (negative) আবার কখনওবা ব্যঙ্গাত্মক অর্থেই ব্যবহৃত হয় বেশী। যুব সমাজ আর দক্ষতার মত আশাদায়ক শব্দের সাথে একই কলামে এই শব্দটি অনেকেরই অপছন্দ। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনে আমি বলতেই পারি, ভেবে দেখুন, এই নেতিবাচক মনোভাবের জন্য কি ‘নেতৃত্ব’ দায়ী নাকি ‘নেতৃত্বের অভাব দায়ী’? বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করে বুঝাতে গেলে ভেঙে বলতেই হয়।

 

আমাদের চিরাচরিত ধারণা, নেতৃত্ব বা নেতা শব্দগুলো রাজনীতির সাথে জড়িত। জড়িত, অবশ্যই। তাই কেউ কোন কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করলেই তার কাজকে ‘পলিটিকস’ বলে ব্যঙ্গ করতে বা তার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান হতে কয়েক সেকেন্ডের বেশী সময় লাগে না। আসলেও কি তাই? নেতৃত্ব বলতে আমরা যা বুঝি তা আসলে জাতীয় নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে বা কাজের ক্ষেত্রে ‘নেতৃত্ব’ শব্দটির সাথে আমরা বিশেষ পরিচিত বা আগ্রহী কোনটাই নই। তবে ১৬ কোটিরও বেশী জনসংখ্যার দেশে শুধুমাত্র যোগ্য জাতীয় নেতৃত্বই যে উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়, তা নিশ্চিত।

 

তবে, এর অর্থ এই নয় যে সকলেই পরিবারের বা অফিসের লোকজনকে একত্র করে আজ থেকেই দৃঢ় গলায় ভাষণ শুরু করে দিব। জাতীয় বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে কিন্তু ব্যক্তি নেতৃত্বের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। তারই সাথে রয়েছে উদ্দেশ্যেরও তারতম্য।

 

প্রথমেই, ব্যক্তি নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিজের স্বার্থে। অন্যকে নেতৃত্ব প্রদানের চেয়ে নিজের কাজটা সাফল্যের সাথে করতে পারাই এ নেতৃত্বের উদ্দেশ্য। তবে যেহেতু বেশিরভাগ কাজই এককভাবে করা সম্ভব নয়, তাই সফলভাবে কাজ করতে নেতৃত্বে দক্ষতা দরকার। ব্যক্তি নেতৃত্বের বিশেষজ্ঞ জন সি ম্যাক্সওয়েল (John C Maxwell) এর মতে নেতৃত্বের দক্ষতা আপনার অন্য দক্ষতাকে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি করে। মনে করুন, আপনার কাজে আপনি ১০ এ ১০ নম্বর পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আপনার দক্ষতা ১০ এর মধ্যে ১। অর্থাৎ আপনি শুধু নিজের গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ। তাহলে আপনার সার্বিক সক্ষমতা শুধু ১০। কিন্তু আপনার নেতৃত্বের দক্ষতাকে যদি আপনি বৃদ্ধি করে মাত্র ২ করতে পারেন তাহলে কিন্তু আপনার সার্বিক কার্যকারিতা হয়ে যাবে ১০ * ২ = ২০। অর্থাৎ নেতৃত্বের দক্ষতায় মাত্র ১ ধাপ এগিয়েই আপনি কাজের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ প্রভাব রাখতে পারবেন। আবার, অন্যদিকে ধরুন অন্য একজনের কাজের দক্ষতা মাত্র ৬ কিন্তু নেতৃত্বের দক্ষতা ৫। তার সার্বিক প্রভাব কিন্তু ৬ * ৫ = ৩০। অর্থাৎ কাজের ক্ষেত্রে কম দক্ষ হয়েও অন্যদেরকে নেতৃত্বের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করে তিনি আপনার থেকে বেশী সফল ও কার্যকরভাবে কাজটি করতে সক্ষম।

 

ইতোমধ্যে বিষয়টি বেশ পরিষ্কার, নেতৃত্বের দক্ষতার মাধ্যমে নিজের সীমিত দক্ষতার কার্যকারিতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। অর্থাৎ, আপনি তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরী বা অন্য যে বিষয়েই দক্ষ হন, নেতৃত্বের দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথেই আপনার অন্য দক্ষতাগুলোর কার্যকারিতা বহুগুণে বাড়তে থাকবে। তাই, যুবসমাজ অন্য যে বিষয়েই দক্ষ হোক না কেন, তার প্রভাব কিন্তু বৃদ্ধি করা সম্ভব যদি সবাই নেতৃত্বে দক্ষতা অর্জন করে।

 

তাই বলে কি সবাই নেতা হয়ে যাব? এখানেই রয়েছে দ্বিতীয় পার্থক্য। রাজনৈতিক নেতার পেছনে থাকে অনুসারীরা। কিন্তু এই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, যে নেতৃত্বে দক্ষ সে অনুসরণেও দক্ষ। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে, অবস্থার প্রেক্ষিতে কখনও আপনি নেতৃত্ব দিবেন, আবার কখনও অন্যের নেতৃত্ব অনুসরণ করবেন। এক্ষেত্রে, নেতৃত্ব দেওয়ার চেয়ে কিন্তু কোন কাজ সফলভাবে করাটাই মূল উদ্দেশ্য। কারো যদি নেতৃত্বে দক্ষতা থাকে, তাহলে নেতৃত্বের গুরুত্ব তিনি বোঝেন। আর ঠিক সেই কারণেই প্রয়োজনের সময় অন্যের নেতৃত্ব অনুসরণে খুব একটা দ্বিধাবোধ তিনি করেন না।

 

এগুলো ছাড়াও নেতৃত্বের দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তি সহজেই নিজের মতামত অন্যকে সফলভাবে বোঝাতে পারেন। তিনি পারেন দলগতভাবে কাজ করতে এবং করাতে, যাকে আমরা teamwork বলি। সাথে সাথে তিনি উদ্দেশ্য নির্ধারণ (goal setting), নিজের স্বার্থ এবং কাজের স্বার্থের পার্থক্য করার মত বিষয়গুলোতেও দক্ষ হয়ে থাকেন।

 

কিন্তু এত কথার পর আসে, এতসব দক্ষতার দরকার কি? সবাই নিজের নিজের কাজ করলেই তো হল। একটু ভেবে দেখুন, কর্মক্ষেত্রে আপনার উর্ধ্বতন যদি আরেকটু দক্ষতার সাথে আপনাদের পরিচালনা করতেন তাহলে কি আপনি আরেকটু বেশী কার্যকরভাবে কাজ করতে পারতেন না? আপনার অধস্তনও হয়ত সেই একই কথাই ভাবেন। আবার, যে কোন সামাজিক বা দাতব্য (charitable) কাজ করার ক্ষেত্রেও কিন্তু কাউকে সফল নেতৃত্ব দিতেই হবে। মোটের ওপর, নেতৃত্বের দক্ষতা ছাড়া কিন্তু অন্য সকল দক্ষতাই সীমাবদ্ধভাবে কাজে লাগানো যায় মাত্র। আর এই দক্ষতাই এমন একমাত্র দক্ষতা যা কিনা সকলেরই প্রয়োজন, সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

 

তাহলে এখন শেষ প্রশ্ন, কিভাবে অর্জন করব এই দক্ষতা? এটি এমন একটি দক্ষতা যার কিনা কোন সনদপত্র বা সার্টিফিকেট নেই। এটির জন্য দরকার সময় ও চেষ্টা। দরকার নিয়মিত চর্চার। একটু personal leadership skills শব্দগুলো গুগল করলেই আপনি পেয়ে যাবেন কিছু তথ্য ও চর্চার উপায়। সাথে কিছু বইও পড়ে নিতে পারেন। আর এখন কিন্তু এ বিষয়ে কিছু প্রশিক্ষনেরও ব্যবস্থা করা হয় অনেক জায়গায়। তারই সাথে দরকার এ দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তা সকলক্ষেত্রে অনুশীলনের ব্যবস্থা করা। বেশিরভাগ সামাজিক সংগঠন ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ক্লাবগুলোর মূল উদ্দেশ্যই কিন্তু নেতৃত্বে দক্ষতা তৈরি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এ উদ্দেশ্য পিছনে পড়ে যায় অন্যান্য অগভীর (superficial) উদ্দেশ্যের আড়ালে। কাজের ক্ষেত্রেও কিন্তু নেতৃত্ব চর্চা করা যায় নিজে থেকে অথবা মিলিতভাবে। তবে লক্ষ্য রাখবেন, অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে নয়, চেষ্টা যেন হয় দক্ষতা বৃদ্ধিতে।

 

আর অবশ্যই এতগুলো কথার অর্থ এই নয় যে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যান্য দক্ষতার গুরুত্বের কথা বলছেন তারা ভুল। সবাই নিজের পছন্দমত অন্য দক্ষতায় দীক্ষিত হবেন অবশ্যই; তার প্রয়োজনীয়তাও নেহাত কম নয়।

লেখক: উদ্যোক্তা ও গবেষক
** যাবতীয় তথ্য ও মন্তব্যের জন্য লেখক দায়ী
LIVE
Play
সেন্ট মার্টিন’স-এ পর্যটক নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি
একনজরে মুহাম্মাদ সা.
আমি এখনো আপনার গান শুনছি
ঢাকার ইতিহাস: জীবনদায়ী মিটফোর্ড হাসপাতাল