কলাম

২রা জুলাই – বাংলার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন

পিনাকী ভট্টাচার্য

আমরা কত দিবসই না পালন করি কিন্তু যেই দিবসটা আমাদের অবশ্যই পালন করা উচিৎ ছিল সেই দিবসটার খবরই আমরা জানিনা। তারিখটা ২রা জুলাই ১৯০৯ সাল।

 

এই দিনটা বাংলার রেলের ইতিহাসেই শুধু নয়, বৃটিশভারতের রেলের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক দিন। কী ঘটেছিল সেদিন?

 

এর হদিস নেবার আগে আসুন আমরা একটু ভারতের রেলের ইতিহাস ঘেঁটে আসি। ১৮৫৩ সালে ভারতে ইংরেজ শাসকেরা রেল চলাচলের সূচনা করে। বৃটিশ ভারতে যোগাযোগের এই আধুনিক ব্যবস্থার সূচনা গোটা ভারতেরই চেহারা পাল্টে দিতে শুরু করে। রেলের বিষয়ে পরিকল্পনা করেন লর্ড হার্ডিঞ্জ , তিনি ১৮৪৪-১৮৪৮ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন। মূলত তার উৎসাহেই রেলে বহু কোম্পানী উদ্যোগী হয়ে পুঁজি বিনিয়োগ করেন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতে এক বৈপ্লবিক যুগের সূচনা হয়। তবে তিনি ভারতে রেলের সুচনা দেখে যেতে পারেননি। এই লর্ড হার্ডিঞ্জ সাহেবের নামে কিন্তু আমাদের পদ্মা নদীতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজটা তৈরি নয়। তবে আমাদের লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে এই ব্রিজের সম্পর্ক আছে। চার্লস হার্ডিঞ্জ ছিলেন লর্ড হার্ডিঞ্জের নাতি, তিনি ১৯১০ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় হন। চার্লস হার্ডিঞ্জের নামে তৈরি হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

 

১৮৫৩ সাল থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় রেল ছিল ব্যক্তি মালিকানায়। ১৯০৭ সালে ভারতের অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন রেলকোম্পানীর দায়িত্ব সরকার নিয়ে নেয়।

 

রেল চলাচল শুরু হবার প্রথম ৫৫ বছর পর্যন্ত সবকিছুই খুব ভাল ছিল কেবল ভারতীয়রা যে ৩য় শ্রেণীর রেল কামরা ব্যবহার করতেন সেখানে কোন টয়লেট ছিলনা। অদ্ভুত এক নিয়মের কারণে তখন এই সমস্যা নিয়েই রেল চলাচল করছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলেও তাঁরা মনে করেছিল নেটিভদের প্রস্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন নেই।

 

 

২রা জুলাই ১৯০৯ সাল।

 

একটা ট্রেন এসে দাঁড়ালো বীরভূমের আহমেদপুর স্টেশনে।

 

অখিল চন্দ্র সেন নামের এক বাঙালি ভদ্রলোক পড়িমরি করে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনসংলগ্ন টয়লেটের দিকে দৌড় দিলেন। টয়লেটে যখন তিনি আনন্দের সাথে হালকা হচ্ছিলেন, তখনই তিনি ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার হুইসল শুনতে পেলেন। কোনরকমে সেখান থেকে বেরিয়ে ছুটলেন ট্রেন ধরতে। ট্রেন চলতে শুরু করেছে; ট্রেন থামানোর জন্য হাত তুলে ট্রেনের গার্ডকে ইশারা করেন। একহাতে লোটা, অন্যহাতে ধুতি সামলে ছুটতে গিয়ে বেচারা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন লোকভর্তি প্ল্যাটফর্মের ওপর। চোখের সামনে দিয়ে ট্রেন বেড়িয়ে গেল। ক্ষুব্ধ, অপমানিত ভদ্রলোক স্টেশন ত্যাগ করলেন।

 

কয়েকদিন পর বিস্তারিত ঘটনা জানিয়ে তিনি চিঠি লিখলেন সাহেবগঞ্জ ডিভিশনাল রেলওয়ে অফিসে। চিঠিতে তিনি লেখেন,

পেটভরে কাঁঠাল খেয়ে ট্রেনে চেপে যাওয়ার সময় পেট ফেঁপে ওঠায় তিনি বাধ্য হয়ে স্টেশনের টয়লেটে যান। তিনি প্রশ্ন করেন, হাত দেখানো সত্বেও গার্ড কি দু’-এক মিনিটের জন্য ট্রেনটাকে দাঁড় করাতে পারতেন না ? এমনকি জনস্বার্থে ওই গার্ডের কাছ থেকে বড়সড় জরিমানা আদায়ের কথাও বলেন, না হলে সংবাদপত্রে সবকথা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেন।

 

ইংরেজি ব্যাকরণগত ভুলে লেখা চিঠিটি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেন। যার জেরে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় রেলওয়ে চালু হওয়ার বহু বছর পরে ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীর কামরার মধ্যে টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়।

 

কখনো যদি ট্রেনে চড়াকালীন পেট হালকা করার জন্য টয়লেটের আশ্রয় নিতে হয়, তাহলে ওই ভদ্রলোককে একবার অন্তত মনে মনে কুর্ণিশ জানাতে ভুলবেন না। আর সেইসাথে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালকে। নইলে আরো কতদিন কত যাত্রিকে নরকযন্ত্রণা ভোগ করে ট্রেন যাত্রা করতে হতো! ভাগ্যিস এই নাছোড়বান্দা ট্রেনযাত্রি আগের দিন কাঁঠাল খেয়েছিলেন।

 

অখিল চন্দ্র সেনের সেই চিঠিটি স্মারক হিসেবে দিল্লীর রেল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

** যাবতীয় তথ্য ও মন্তব্যের জন্য লেখক দায়ী

Comments are closed.

LIVE
Play
সেন্ট মার্টিন’স-এ পর্যটক নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি
একনজরে মুহাম্মাদ সা.
আমি এখনো আপনার গান শুনছি
ঢাকার ইতিহাস: জীবনদায়ী মিটফোর্ড হাসপাতাল