কলাম

ঢাকার ইতিহাস: জীবনদায়ী মিটফোর্ড হাসপাতাল

পিনাকী ভট্টাচার্য

পুরান ঢাকায় আজকে যে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল আছে সেটাই ছিল ঢাকার প্রথম বিশেষায়িত মিটফোর্ড হাসপাতাল। ঢাকার কালেক্টর এবং প্রাদেশিক আপীল বিভাগের জজ স্যার রবার্ট মিটফোর্ডের নামানুসারে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্যার মিটফোর্ডের সময়ে ঢাকায় মহামারী আকারে ভয়াবহ কলেরা দেখা দিয়েছিল। মহামারীতে ঢাকায় কলেরা আক্রান্ত হয়ে দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ জন মারা যেত।

 

স্যার মিটফোর্ড জনগণের এই দুর্দশা দেখে মর্মাহত হন। ১৮৩৬ সালে ইংল্যান্ডে তিনি মৃত্যুর আগে তাঁর সম্পত্তির প্রায় পুরোটাই যা সেইসময়ের হিসাবে ছিল ৮,০০,০০০ টাকা তা ঢাকার জনসাধারণের কল্যাণমূলক কাজ এবং একটি হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করার জন্য বাংলার সরকারের নামে উইল করে দেন।

 

এই উইল তাঁর উত্তরাধিকারীরা মেনে না নিয়ে আদালতে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৮৫০ সালে আদালত বাংলার সরকারের পক্ষে আংশিক রায় দেন। যার সুবাদে ১,৬৬,০০০ টাকা পাওয়া যায়। এই টাকায় পুরোনো ওলন্দাজ কুঠির স্থানে ১৮৫৪ সালে হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তখন জায়গাটি ‘কাটরা পাকুড়তলী’, বাবুবাজার নামে পরিচিত ছিল।

 

১৮৮২ সালে ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহর ২৭ হাজার টাকা এবং ভাওয়ালের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের ২০ হাজার টাকার দানে হাসপাতালে একটি মহিলা ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাব আহসানউল্লাহ ১৮৮৮-৮৯ সালে একই দালানের মধ্যে মহিলাদের জন্য লেডি ডাফরিন জেনানা হাসপাতাল নির্মাণের জন্য আরও ৫০,০০০ টাকা দান করেন। ১৮৮৭ সালে হাসপাতালে একটি ইউরোপীয়ান ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৮৯-৯০ সালে ভাগ্যকুলের রাজা শ্রীনাথ রায় তাঁর মায়ের স্মৃতির স্মরণে মিটফোর্ড হাসপাতালে ৩,০০,০০০ টাকা ব্যয়ে একটি চক্ষু বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।

 

১৮৬৬ সালে হাসপাতালে ৯২ জন রোগীর চিকিৎসা করা যেত। ১৮৭১ সালে এখানে সারা বছর ১০৭৬ জন রোগী চিকিৎসার জন্য এসেছিল। এর মধ্যে ৮৬৫ জন আরোগ্য লাভ করে আর ১৭৮ জন মারা যায় বাকি ৩৩ জন বছর শেষ হওয়ার পরেও হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

 

আমরা যে অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিনয় বাদল দীনেশের কথা জানি যারা রাইটার্স বিল্ডিং এ আক্রমণ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলন। তাঁরা তিনজনেই ছিলেন বৃহত্তর ঢাকার ছেলে। এর মধ্যে বিনয় বসু ছিলেন মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র। ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করার পর বিনয় মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল এ ভর্তি হন। এ সময় তিনি ঢাকার ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের সংস্পর্শে আসেন এবং যুগান্তর দল এর সাথে জড়িত মুক্তি সঙ্ঘে যোগ দেন। ডাক্তার হয়ে ওঠার আগেই তিনি শহীদ হন। ১৯৩০ সালে বিপ্লবীরা পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল লোম্যানকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন।

 

লোম্যানের মিটফোর্ড হাসপাতালে এক সহকর্মীকে দেখতে আসার কথা ছিল। ১৯৩০ সালের ২৯ আগস্ট বিনয় বসু সাধারণ বেশভূষায় নিরাপত্তা গন্ডীকে ফাঁকি দিয়ে লোম্যানের খুব কাছে চলে এসে তাকে গুলি করেন। ঘটনাস্থলেই লোম্যানের মৃত্যু হয় এবং তার সঙ্গে থাকা পুলিশের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হডসন গুরুতর আহত হন। লোম্যানকে হত্যা করে খুব ধীরস্থির ভাবেই বিনয় বসু হেটে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন। সেই সময়ে প্রফুল্ল নামে পুলিশের একজন ইনফর্মার বিনয়কে জাপটে ধরে। বিনয় পকেটে রিভলভার থাকার পরেও প্রফুল্লকে ঘুষি মেরে কয়েকটা দাত ফেলে দিয়ে আবারো সেই নির্বিকার ভাবে হেঁটে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান।

 

১৯৩০সালের ৮ ডিসেম্বর দীনেশ গুপ্ত, বিনয় বসু ও বাদল গুপ্ত ইউরোপীয় পোষাকে সজ্জিত হয়ে রাইটার্স বিল্ডিং-এ প্রবেশ করে কর্নেল সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। তারপর রাইটার্সের ঐতিহাসিক অলিন্দে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে এই তিন বিপ্লবীর সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ অফিসার টোয়াইনাম, প্রেন্টিস ও নেলসন আহত হন। গ্রেফতারি এড়াতে বাদল বসু ঘটনাস্থলেই পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু বিনয় বসু ও দীনেশ গুপ্ত নিজেদের উপর গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে হাসপাতালে ডাক্তারি ছাত্র বিনয় সকলের অলক্ষ্যে ক্ষতস্থান আঙুল দিয়ে সংক্রমিত করে আত্মহত্যা করেন। দীনেশ অবশ্য সুস্থ হয়ে ওঠেন ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তার ফাঁসি হয়।

*যাবতীয় তথ্য ও মন্তব্যের জন্য লেখক দায়ী
//মাও
LIVE
Play
সেন্ট মার্টিন’স-এ পর্যটক নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি
একনজরে মুহাম্মাদ সা.
আমি এখনো আপনার গান শুনছি
ঢাকার ইতিহাস: জীবনদায়ী মিটফোর্ড হাসপাতাল