কলাম

একনজরে মুহাম্মাদ সা.

মোঃ মাসুম বিল্লাহ বিন রেজা

বিশ্বপ্রভু আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আপনার জন্য আপনার উল্লেখধ্বনি সুউচ্চ করেছি।’ (আল কুরআন, সূরা ইনশিরাহ, আয়াত-৪) ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।’ (আল কুরআন, সূরা কলম, ৪) ‘নিশ্চয়ই রাসূলের সা. চরিত্রের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।’ (আল কুরআন, সূরা আহযাব, ২১) ‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয়ের অধিকারী হয়েছেন।’ (আল কুরআন, সূরা আলে ইমরান, ১৫৯) নবীজি সা. বলেন, ‘আমি চরিত্রকে পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’(মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক, মানব জীবনে কুরআন হাদীস, পৃঃ ৪৮৫)

 

বিশ্বস্রষ্টা ও সমগ্র সৃষ্টির যিনি প্রশংসা লাভে ধন্য হন তিনি আর কেউ নন মহান নবী মহামানবদের মহামানব হযরত মুহাম্মাদ সা.। সারা পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম প্রতিদিন আযান, ইকামত, নামায ইত্যাদিতে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করে। কোনো অর্বাচীন নিন্দাও করে। তবে একজন অর্বাচীন নিন্দা করলেও দশজন প্রজ্ঞাবান ঘোষণা করে তাঁর অমিয় শান ও অপরূপ মহিমা। তাঁর কর্মের সার্থকতার তুলনা তিনি নিজেই। তিনি মাত্র দু’দশকে অসভ্য, বর্বর আরবকে সভ্য, অনুকরণীয় করে তুলেন। এটি যেকোনো বিচারে অনন্য সাধারণ অর্জন।

 

দেড় হাজার বছরের ব্যবধানে তাঁর আদর্শের স্থায়িত্ব ও বিশ্ব সভ্যতায় তাঁর দুর্দমনীয় প্রভাব, যুগোপযোগিতায় তাঁর দুর্লভ সমাধান, আধুনিকতায় তাঁর ব্যাখ্যা, বিজ্ঞানে তাঁর মহাঅর্জন, প্রজ্ঞায় তাঁর অধিকার, সবার হৃদয়ে হৃদয়ে তাঁর আসন ইত্যাদি কোনো কিছুই ম্লান হয়ে যায়নি। কী মহিমা ছিলো তাঁর জীবনে, কীভাবে তিনি এত শক্তিশালী, কেন তিনি আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এসব জানার উৎসাহ অনেকের, তাঁর ধারের কাছেও নেই পৃথিবীর অন্য কোনো ব্যক্তিত্ব। বিশ্ব ইতিহাস ও বিশ্ব সাহিত্যে স্বাভাবিকভাবেই বহুমাত্রিকতার সাথে তাঁর বিচরণ।

 

নাম-মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ সা. বাবা আব্দুল্লাহ, মা আমিনা বিনতে ওয়াহাব, দাদা আব্দুল মুত্তালিব, দাদি ফাতিমা বিনতে আমর, নানা ওয়াহাব ইবনে মান্নাফ ও  নানি বারা বিনতে আব্দুল ওযযা।

 

জন্ম ৫৭০/৫৭১ সাল আগস্ট মাস/এপ্রিল (৯/১২ই রবিউল আওয়াল)। জন্মের পূর্বেই বাবা মারা যান। তাঁর জীবনকাল প্রায় ৬৩ বছর।

 

১-৫তম বছর : মা আমিনা ও দুধমাতা হালিমার ঘরে কাটান। ৭ম দিনে খাতনা করা হয় অথবা খাতনা করা অবস্থায় জন্ম নেন। ৪ বছর বয়সে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করা হয়।

৬-৭তম বছর : মা আমিনা মারা যান। দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর দেখাশুনার দায়িত্ব নেন।

৮-৯তম বছর : দাদা আব্দুল মুত্তালিব মারা যান। চাচা আবু তালেব তাঁর দেখাশুনার দায়িত্ব নেন।

১০-১১তম বছর : দ্বিতীয়বার বক্ষ বিদীর্ণ করা হয় তাঁর।

১২-১৪তম বছর : তিনি সিরিয়া যান চাচার সাথে। এখানে বুহায়রা নবী বলে স্বীকৃতি দেয় তাঁকে।

১৫-১৬তম বছর : ফুজ্জার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন মুহাম্মাদ সা.। কিন্তু তিনি কারো প্রতি আঘাত হানেননি।

১৭-২২তম বছর : হিলফুল ফুযুল শান্তি সংঘে যোগ দেন তিনি। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ৫টি শপথ নেন।

২৩তম বছর : খাদিজার রা. সাথে পরিচয় ও তার ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব নেন।

২৪তম বছর : তিনি সিরিয়া সফর করেন খাদিজার ব্যবসার উদ্দেশ্যে।

২৫তম বছর : খাদিজার রা. সাথে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়।

২৬-৩০তম বছর : আল আমিন উপাধি লাভ। বড় মেয়ে যয়নাবের রা. জন্ম।

৩১-৩৫তম বছর : হাজারে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনে নেতৃত্ব দেন।

৩৬-৩৭তম বছর : বালক আলীর রা. দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। হেরা গুহায় ধ্যানে মগ্ন হন। নবীজির বড় ছেলে কাশেমের জন্ম হয়।

৩৮-৪০তম বছর : নবুওয়াত লাভ/পবিত্র কুরআন নাযিল শুরু।

৪১-৪৩তম বছর :  গোপনে ইসলাম প্রচার। আরকামের রা. বাড়িতে প্রচারকেন্দ্র স্থাপন। অনেকেরই ইসলাম গ্রহণ।

৪৪তম বছর : আত্মীয়দের মাঝে ইসলাম প্রচার। ১৫জন সাহাবীকে আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি দেন। এ সময় সুমাইয়া রা. শহীদ হন।

৪৫তম বছর : প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার। কাবাঘরে নামায আদায়।

৪৬-৪৮তম বছর : তিনি চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করেন। শিয়াবে আবি তালেবে বয়কোট (অবরোধ) অবস্থায় কাটান। খাবারের অসহনীয় কষ্ট হয় এ সময়ে।

৪৯-৫০তম বছর : চাচা আবু তালেব মারা যান। প্রিয় স্ত্রী খাদিজাও রা. মারা যান। নবীজি তায়েফে দাওয়াত দেন। মদীনায় ইসলাম প্রচার শুরু করেন। এ সময় আকাবার ১ম ও ২য় শপথ অনুষ্ঠিত হয়।

৫১তম বছর : তাঁর মি‘রাজ সংঘটিত হয়। ৫ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়। ৩য়বার বক্ষ বিদীর্ণ করা হয় তাঁর। আকাবার ৩য় শপথ অনুষ্ঠিত হয়।

৫২তম বছর : তিনি মদীনায় হিজরত করেন। এ বছর থেকে হিজরি সাল গণনা করা হয়। পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদীনা সনদ’ রচনা করেন এ বছরেই

৫৩তম বছর : মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা হয়। জুমু‘আর নামায ফরয হয়। ৩টি খন্ড যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয়। আয়েশার রা. সাথে তাঁর বিয়ে হয়।

৫৪তম বছর : কুরবানী ওয়াজিব হয়। কিবলা পরিবর্তন হয়। রোযা, যাকাত ফরয হয়। ঈদের নামায চালু হয়, সদাকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয়। জিহাদের নির্দেশ সম্বলিত প্রথম আয়াত নাযিল হয় (আল কুরআন, সূরা হজ, আয়াত ৩৯)। বদর যুদ্ধসহ ৫টি যুদ্ধ নবীজি পরিচালনা করেন। ফাতিমার রা. বিয়ে হয়। নবীকন্যা রুকাইয়া রা. মারা যান।

৫৫তম বছর : উহুদসহ ৩টি যুদ্ধ ও ২টি খন্ড যুদ্ধ পরিচালিত হয়। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয়। হাফসা ও যয়নাবের রা. সাথে নবীজির বিয়ে সম্পন্ন  হয়। নবীকন্যা উম্মে কুলসুমের রা. সাথে উসমানের রা. বিয়ে হয়।

৫৬তম বছর : নবীজি উম্মে সালামাকে রা. বিয়ে করেন। ২টি যুদ্ধসহ ৪টি খন্ড যুদ্ধাভিযান হয়।

৫৭তম বছর : খন্দকসহ ৫টি যুদ্ধ ও ১টি খন্ড যুদ্ধ পরিচালিত হয়। ওযু ও তায়াম্মুমের বিধান নাযিল হয়। যয়নব বিনতে খুযায়মা ও জোহায়রিয়ার রা. সাথে নবীজির বিয়ে হয়। আয়েশার রা. বিরুদ্ধে ইফকের ঘটনা ঘটে। সূরা মুনাফিকুন নাযিল হয়।

৫৮তম বছর : ৩টি যুদ্ধ ও ১১টি খন্ড যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়। নবীজির দু‘আয় বৃষ্টি শুরু হয়। নবীজি মারিয়া কিবতিয়াকে রা. বিয়ে করেন। ইসলামের অনেক বিধান সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয় এ বছরে।

৫৯তম বছর : খায়বারসহ ৩টি যুদ্ধ ও ৫টি খন্ড যুদ্ধ হয়। নবীজি উম্মে হাবিবা, মাইমুনা ও সাফিয়া রা.কে বিয়ে করেন। নবীজি উমরাহও করেন।

৬০তম বছর : মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়। মুতা, হুনাইনসহ ৪টি যুদ্ধ ও ১০টি খন্ড যুদ্ধাভিযান হয়। নবীপুত্র ইবরাহিমের রা. জন্ম হয়। নবীকন্যা যয়নবের রা. মৃত্যু হয়।

৬১তম বছর : হজ ফরয হয়। তাবুক যুদ্ধসহ ৩টি খন্ড যুদ্ধাভিযান সংঘটিত হয়। নবীকন্যা উম্মে কুলসুমের রা. মৃত্যু হয়।

৬২তম বছর : নবীপুত্র ইবরাহিমের মৃত্যু হয়। নবীজি হজ করেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠভাষণ ‘বিদায় হজের ভাষণ’ দেন তিনি। আল কুরআনের সর্বশেষ আয়াত নাযিল হয় (আল কুরআন, সূরা মায়েদা, ৩)। ২টি খন্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

৬৩তম বছর : ১টি খন্ড যুদ্ধ হয়। নবীজি অসুস্থ হয়ে যান। মাথাব্যথা ও জ্বর হয়। কয়েকদিন কাটে। আবার সুস্থ হন। হুঁশ থাকে আবার চলে যায়। এসব সময় তিনি দু‘আ, উপদেশ, ইসলাম প্রচার করেন।

এরপর তাঁর মৃত্যু ঘটে (হিজরি একাদশ, ১২ই রবিউল আওয়াল, সোমবার, সকালবেলা)। ইন্না লিল্লা-হি ওয়া ইন্না ইলায়হি র-জিউন। আয়েশার রা. ঘরে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়, এখানেই তাঁর কবর রচিত হয়। আল্লা-হুম্মা সল্লি ‘আলা মুহাম্মাদ।

জর্জ বানার্ড শ’ তার গ্রন্থে লিখেন, ‘আশ্চর্য এই মানুষ সম্পর্কে আমি অনুশীলন করেছি। আমার মতে, তাঁকে মানবজাতির ত্রাণকর্তা বলা যেতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, তাঁর মতো কোনো মানুষ যদি সমস্যা সঙ্কুল এ পৃথিবীর একনায়কত্ব গ্রহণ করতেন, তাহলে পৃথিবীর বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করে জগতে অনেক আকাঙ্ক্ষিত চির শান্তি ও সুখ আনতে সমর্থ হতেন।’ (হযরত মুহাম্মদ সা. তাঁহার শিক্ষা ও অবদান, সৈয়দ বদরুদ্দোজা, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১০৫)

 

লেখক:*টিভি ও রেডিও আলোচক, কলাম লেখক, প্রভাষক
** যাবতীয় তথ্য ও মন্তব্যের জন্য লেখক দায়ী

 

//মাও
LIVE
Play
সেন্ট মার্টিন’স-এ পর্যটক নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি
একনজরে মুহাম্মাদ সা.
আমি এখনো আপনার গান শুনছি
ঢাকার ইতিহাস: জীবনদায়ী মিটফোর্ড হাসপাতাল