আলোচিত, শিল্প সাহিত্য

একটি চার্চ ও আর্মেনীয়ান স্মৃতিকথা

তানজিম প্রমা

পুরনো ঢাকার আরমানিটোলা এলাকার যেই অংশটি জুড়ে প্রসাধনি ও সুগন্ধির পাইকারি বাজার অসংখ্য দোকানের মাধ্যমে পসরা সাজিয়ে বসে আছে, সেগুলো পাশ কাটিয়ে আরমানিটোলা ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মধ্যবর্তীস্থল চার্চ রোডের একটি গলি ধরে এগিয়ে গেলেই পশ্চিমা ধাঁচে তৈরি একটি ফটক দৃষ্টি কাড়বে। যার ফলকে লিখা আর্মেনীয়ান চার্চ-১৭৮১! আর সেই চার্চেই বসবাস করেন প্রায় তিনশো বছর বয়সী আর্মেনীয় বাসিন্দারা। কী ? বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ ? যেখানে সর্বোচ্চ গড় আয়ুর দেশ জাপানের বাসিন্দাদের গড় আয়ু নব্বইয়ের নিচে, সেখানে তিনশো বছর তো অলিক কল্পনার মতোন। হ্যাঁ ! এখানে বসবাসরত অনেক বাসিন্দারই বয়স তিনশো বছর এবং সে সম্পর্কিত আলোচনার নিমিত্তেই আজকের এই প্রলম্বিত প্রবন্ধ। যার হাত ধরে প্রথমেই আমরা ফিরে যাবো ঔপনিবেশিক আমলে।

 

চলুন পরিচিত হই আর্মেনিয়া দেশটির সাথে। যেখান থেকে আগত বাসিন্দারাই আজকের আলোচনার মূল উপজীব্য। আর্মেনিয়া পশ্চিম এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। জর্জিয়া ও আজারবাইজানের সাথে এটি দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে কৃষ্ণসাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের স্থলযোজকের উপর অবস্থিত। দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহরের নাম ইয়েরাভান।  জাতিগত ভাবে আর্মেনীয়রা নিজেদের হায় বলে ডাকে এবং আর্মেনিয়ার নব্বই ভাগ লোক হায় জাতিরলোক । ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯১ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯৫ সালে দেশটির প্রথম সোভিয়েত-পরবর্তী সংবিধান পাশ হয়।

 

আর্মেনীয়দের এদেশে আগমন কাল সম্পর্কিত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও; জানা যায় সম্রাট আকবর যখন ভারতের মসনদে, তাঁর অনুমতি নিয়ে প্রথমে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার শুরু করে আর্মেনীয়রা। পরবর্তিতে সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকায় রাজধানীর গোড়াপত্তন করলে তখন পর্তুগীজ,ডাচ, ফরাসীরা ক্রমাগত এ দেশে আসতে শুরু করে ; এসব আগতদের একটি অংশ ছিলো আর্মেনীয়।

 

তাদের সংখ্যা খুব বেশি কিংবা বড় পরিসরের না হলেও ব্যবসায়ীক জ্ঞান এবং তার ক্রমাগত পরিধিবিস্তার আর্মেনীয়দের করে তুলেছিলো বেশ প্রভাবশালী। লবন ব্যবসা থেকে শুরু করে কাপড়ের ব্যবসায়, কিংবা ঠিকদারি থেকে পান ও পাট; সর্বস্তরের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ছিলো তাদের হাতে।

ড্যান্ডি খ্যাত জগৎবিখ্যাত নারায়নগঞ্জে পাটের ব্যবসায়ের জন্ম একরকম তাদেরই হাত ধরে।

 

ব্যবসা বাণিজ্য তো অনেক হলো।  এবার তারা মনোনিবেশ করলেন তাদের সমাজ বিনির্মাণে। ততোদিনে তাদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। নির্দিষ্ট একটি এলাকা জুড়ে বাড়িঘর নির্মাণের মাধ্যমে দলগতভাবে বসবাস শুরু করলেন আর্মেনীয়রা, যার মাধ্যমে এলাকাটিরও নামকরণ হলো; যা আজকের আরমানিটোলা।

বারান্দার একাংশ

গির্জা নির্মাণের পূর্বে এটি সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায়;বারান্দার অংশেও কিছু কবর দেখা যায়।

 

১৭৮১ সালে আগা মিনাস ক্যাটচিক নামক ব্যক্তির দানকৃত জমির উপর উপাসনালয়টি নির্মিত হয়। যার অনেক পূর্বে থেকেই ঐ স্থল কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জনশ্রুতি আছে যে, মাইকেল সার্কিস, অকোটাভাটাসেতুর সিভর্গ, আগা এমনিয়াস এবং মার্কার পোগজ নামক চার ব্যক্তিই এটি নির্মাণে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

 

১৮৮০ সালে আর্থিক অনটনের দরুণ বাজানো বন্ধ করে দেয়া হয় গির্জাটির অহংকার হিসেবে বিবেচিত গির্জার ঘণ্টাটি। যা ছিলো তৎকালীন সময়ে নগরে বসবাসরত সকল মানুষের সময় গণনার একমাত্র মাধ্যম।  ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে গির্জার ঘড়িঘর বিধ্বস্ত হয় এবং এর গঠনশৈলিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে।

 

 

গির্জার সম্মুখদ্বার দিয়ে  প্রবেশের প্রাক্কালেই সারিসারি কবর আপনার দৃষ্টিগোচর হবে। প্রবন্ধের একেবারেই প্রারম্ভে আমি যেই বয়স্ক বাসিন্দাদের কথা উল্লেখ করেছিলাম, তারাই ঘুমিয়ে আছে এই কবরগুলোতে; ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে। যেন, এ দেশে আর্মেনীয়ানদের বসতির অন্যতম এই নিদর্শনটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন অশীতিপর ৩২৫ জন আর্মেনীয়ান। ঠিকই ধরেছেন, সেখানে মোট কবরের সংখ্যা ৩২৫!

 

 

প্রায় প্রতিটি কবরের উপরেই আছে মার্বেল পাথরের তৈরী চমৎকার এপিটাফ। ইংরেজী ও আর্মেনীয় ভাষার সংমিশ্রণে লিখিত সেই এপিটাফে উঠে এসেছে মৃতব্যক্তির স্বজনদের শোঁকগাথা, জন্ম-মৃত্যুর বৃত্তান্ত এবং কর্মপরিধি নিয়ে কিছু কথা।

মাতা মেরির ওবেলিস্ক

 

প্রবেশপথ মাড়িয়ে সম্মুখে গেলেই নজরে পড়বে একটি কবরের উপর স্থাপিত মার্বেল পাথরে তৈরী  দৃষ্টিনন্দন ভাষ্কর্য। বর্তমানে ভাষ্কর্যটির একটি হাত ভাঙা।

 

দোতলায় উঠার সিঁড়ি

 

গির্জার মূল উপাসনালয়ে প্রবেশ করলেই হাতের বাম পাশে দেখা যাবে দোতলায় উঠে যাওয়া একটি প্যাঁচানো সিঁড়ি। শেষ মাথায় সুউচ্চ বেদী। বেদীর উপর রয়েছে যিশুখৃষ্টের তৈলচিত্র এবং ধাতব ক্রুস। বেদীতে উঠার আগেই রয়েছে একটি ছোট মঞ্চাসন। যেখানে দাঁড়িয়ে আগতদের উদ্দেশ্যে পবিত্র বাণী পাঠ করা হয়। এছাড়া পুরো কক্ষ জুড়েই রয়েছে সারিবদ্ধভাবে সাজানো আসন।

 

২০০৫ সালে স্ত্রী-বিয়োগের পর ঢাকা ত্যাগ করা সর্বশেষ চার্চ ওয়ার্ডেন মাইকেল জোসেফ মার্টিনের  মাধ্যমেই একরকম আনুষ্ঠানিকভাবেই আর্মেনীয়শূন্য বনে যায় ঢাকা।

গির্জাজুড়ে ছড়ানো সমাধিগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে আপনি অনায়াসেই চলে যেতে পারবেন শত বছরেরও বেশি সময় পেছনে। যেখানে জীবনচালিত হয়েছে আমাদের মতোই কিছু মানুষের,যার শুরুটা হয়েছিলো ঔপনিবেশিক আমলে সুদূর আর্মেনিয়া থেকে আসা একদল পরিযায়ীর মাধ্যমে।

 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
তথ্যসূত্র: বর্তমানে গির্জার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা মিঃ শংকর
ছবি: নাকিব বাপ্পি

Comments are closed.

LIVE
Play
সেন্ট মার্টিন’স-এ পর্যটক নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি
একনজরে মুহাম্মাদ সা.
আমি এখনো আপনার গান শুনছি
ঢাকার ইতিহাস: জীবনদায়ী মিটফোর্ড হাসপাতাল