আলোচিত, প্রযুক্তি, বিচিত্র বিশ্ব

মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতার কোনো ব্যাখ্যা আছে?

মৃত্যুর পর আমাদের কী হবে এই প্রশ্ন মানব জাতির জন্মের পর থেকেই। মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি গিয়ে যারা ফিরে এসেছেন তারা সঙ্গে এনেছেন বিচিত্র সব স্মৃতি-অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় দূর থেকে পরলোক দেখা, একটি টানেলের শেষ প্রান্তে উজ্জ্বল সাদা আলো দেখা এবং পূর্বে মৃত পরিচিত বা ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া।

 

 

মৃত্যুর কাছে যাওয়া মানুষদের এসব অভিজ্ঞতাকে অলৌকিক পথে ব্যাখ্যা করতে পছন্দ করেন অনেকেই। কিন্তু বিজ্ঞান এগুলোর লৌকিক ব্যাখ্যা দিতে পারে।

 

মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতা একটি শারীরতাত্ত্বিক ঘটনা। হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন ইনজুরি বা রক্তচাপের ভয়াবহ পরিবর্তনের মতো প্রচণ্ড শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গিয়ে যেসব মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি হয় তাদের এক তৃতীয়াংশই এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন তাদের ‘আত্মা’ শরীর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, কেউ লম্বা সুড়ঙ্গের ভেতরে দিয়ে ছুটেছেন এবং উজ্জ্বল আলোর দেখা পেয়েছেন।

 

 

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিজীবনে পালন করা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, সংস্কৃতি, বয়স ইত্যাদি ভেদে মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতা আলাদা হয়। যেমন অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তাদের ধর্মের মৃত্যুর দেবতা যমরাজের দেখা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা একই অভিজ্ঞতায় দেখতে পেয়েছেন যিশু খ্রিস্টকে। শিশুরা সাধারণত এধরণের অভিজ্ঞতায় তার সবচেয়ে ভাল বন্ধু বা শিক্ষকের দেখা পেয়ে থাকে। তবে এরকম অধিকাংশ অভিজ্ঞতা লাভকারীর ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। সেটা হল এসব মানুষের মনে পরবর্তীতে মৃত্যুভয় কমে আসে, অলৌকিক সত্ত্বার ওপর বিশ্বাস জন্মায়, পরলোকে শাস্তির ধারণা তাদের মনে শক্ত হয় এবং সর্বশক্তিমান কেউ ন্যায়বিচার করবেন এমন ধারণা অর্জন করেন।

 

 

স্নায়ুবিজ্ঞানী ওলাফ ব্লাঙ্ক এবং সেবাস্টিয়ান ডিগুয়েজ দুই ধরণের মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্য অনুসারে, টাইপ ওয়ান অভিজ্ঞতা লাভকারীরা ভেসে থাকার অনুভূতি পেয়েছেন। এই দুই বিজ্ঞানীর বক্তব্য হল, এমন অভিজ্ঞতার পেছনে মস্তিষ্কের বাম হেমিস্ফিয়ারের ভূমিকা থাকে। আর অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার সঙ্গে যোগাযোগ হওয়া, কারো কণ্ঠস্বর, শব্দ ও গান শুনতে পাওয়ার অভিজ্ঞতায় ভূমিকা রাখে মস্তিষ্কের ডান হেমিস্ফিয়ার। মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গটির টেম্পোরাল লোব মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতার পেছনে শক্ত ভূমিকা রাখে। এ অংশটির কাজ জ্ঞানেন্দ্রিয় সম্পর্কিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ। কাজেই এখানে কোনো অস্বাভাবিক কার্যকলাপ ঘটলে মানুষের সংবেদন এবং উপলব্ধিতে গড়বড় হতেই পারে। এখন এই একেকরকম অভিজ্ঞতার পেছনে মস্তিষ্কের একেক অংশ কেন জড়িত সেই ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

 

সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো দেখার অভিজ্ঞতার একটি চমকপ্রদ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী কার্ল সাগান। তিনি বলেছেন, এ অভিজ্ঞতা লাভকারীরা মৃত্যুর যন্ত্রণায় তার জন্ম নেয়ার স্মৃতি অর্থাৎ পৃথিবীর আলো প্রথমবার দেখার যে স্মৃতি, তা মনে করতে পারেন।

 

মৃত্যুর পরে আরও জীবন আছে, এমন ধারণা ধার্মিক ব্যক্তিদের মনে শক্ত হয় মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতার ফলে, বিশেষ করে শরীর থেকে ‘আত্মা’ আলাদা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি থেকে। তাদের ব্যক্তিত্বেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে বলে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।

 

এত সব বৈজ্ঞানিক এবং অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে আরও ব্যাখ্যা। গবেষকগণ এন্ডরফিন হরমোনকে মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতার জন্য দায়ী করছেন। মৃত্যুর যন্ত্রণা লাঘবে এ হরমোন নিঃসৃত হলে সুখকর অনুভূতিও জন্মায়। আবার কেটামাইনের মতো চেতনানাশক প্রয়োগ করলেও শরীর থেকে আত্মা আলাদা হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয় বলে জানা গেছে।

 

সাইকেডেলিক ড্রাগ ডাইমিথাইল ট্রিপটামিন (ডিএমটি) দিয়েও মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। মনোরোগবিদ্যার একজন অধ্যাপক রিক স্ট্রাসম্যান সাবি করেছেন, মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর সময় শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ডিএমটি নিঃসৃত হয়। তবে এ বিষয়ে এখনো বিজ্ঞানীরা একমত নন।

 

মস্তিষ্কে অক্সিজেন স্বল্পতা হলেও মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। এয়ার পাইলটরা দ্রুত উচ্চগতি অর্জন করতে গিয়ে সুড়ঙ্গ দেখার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন বলে গবেষণায় জানা গেছে। অক্সিজেন কম পেলে মস্তিষ্কের কোষ মরে যেতে শুরু করে, এর ফলেও অনেকের মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা হয়।

 

 

যত ব্যাখাই থাকুক, বাস্তবতা হল মরণ-প্রান্তিক অভিজ্ঞতা মানুষকে বেঁচে থাকার অর্থ দেয়, আশা দেয়। আশাই অনেক মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

 

 

মাহা/হাজা/ফই
LIVE
Play
আকাশের আত্মহত্যা ও পুরুষতান্ত্রিক তসলিমা নাসরিন
লাল সবুজের পতাকা কন্যা নাজমুন নাহার দেশ দেশান্তে!
‘বিএনপির মৌসুমীরা’ আওয়ামী লীগে মৌসুমী পাখি!
অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ৩