কলাম

দু’টি মসজিদের হারিয়ে যাওয়া

আল মারুফ

শনমান্দি নামে একটা ইউনিয়ন আছে নারায়ণগঞ্জে। ব্রক্ষ্মপুত্র নদী এঁকেবেঁকে বয়ে গিয়েছে এই গ্রামের পাশ দিয়ে। মুঘল আমলে এই নদীই ছিল এই গ্রামের প্রাণদায়িনী, খানিকটা মজে গেলেও-এখনও চরিত্রের বদল হয়নি। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির বই ‘সোনারগাঁও-পানাম’ থেকে জানা গেল এই ইউনিয়নে রয়েছে মুঘল আমলের দু’টি মসজিদ। সেই মসজিদগুলো দেখতেই ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়লাম।

 

শনমান্দি ইউনিয়নটা বেশ বড়। পানাম শহরে মুঘল পুলের কাছ থেকে রিক্সা নিয়ে পাওয়া গেল শনমান্দির এক প্রান্তের খোঁজ।সেখানে পায়ে হাঁটা মাটির পথ ধরে আয়নাল বিবির মাজার। পুরনো মসজিদ-মাজারের খোঁজ করছিলপাম বলেই হয়তো রিক্সাওলা আয়নাল বিবির মাজারের কাছে পিঠে আমাদের নামিয়ে গায়েব হয়ে গেল। মাজারের খাদেম আয়নাল বিবি ও তার মাজার সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারলেন না। কেবল জানালেন আয়নাল হক আর আয়নাল বিবিসহ আরও তিনজন কামেল পীর এখানে শায়িত।এই কবরগুলো তার দাদার দাদাও দেখে এসেছেন সেই শিশুকাল থেকেই। তখন নাকি এলাকা পুরোই জংলা ছিল- এখন মাজার টাইলস করা; ছাদবিহীন। আগেকার জংলা এলাকা এখন এলাকার সবচে’ বড় কবরস্থানে পরিণত। তার সহায়তায় পাওয়া গেল রিক্সা। এই রিক্সাওলা আবার বেশ এলেম রাখেন। তিনি দড়িকান্দি আর দৌলর্দি গ্রামের খোঁজ জানেন। প্রথমেই তাই যাওয়া হল ফতেপুর-দড়িকান্দি এলাকায়।

 

এশিয়াটিক সোসাইটির বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এই মসজিদটি সবার প্রথমে নজরে আসে ফকির ফারুক ও হাসান সাইমুমের ফিল্ডওয়ার্কের সময়ে। মসজিদটির স্থাপত্য-কৌশল ও নকশা পর্যবেক্ষণ করে তারা এই মসজিদটি সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতকে তৈরি বলে রায় দেন। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত বইয়ে লেখা হয়েছিল এই মসজিদ বেশ কয়েকবার সংস্কার ও পরিবর্ধন করা হয়েছে।উত্তর ও দক্ষিণ দু’দিকে দরজা আর পশ্চিমদিক বাদ দিয়ে বাকি তিনদিকে বারান্দা যোগ হয়েছিল। বেশিরভাগ সংস্কার কাজই হয়েছে ১৯৪৫ সালের দিকে। মসজিদটি জামে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ও একটি মাদ্রাসা কমিটি এর পরিচালনায় রয়েছে।
বর্গাকৃতির এই মসজিদের মাথায় একটি গম্বুজ ছিল, সঙ্গে চারটি অষ্টাভুজ কর্নার টাওয়ার। ভেতরে আদিতে ২.২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকলেও প্লাস্টার,পেইন্টিং আর অন্যান্য পরিবর্তন-পরিবর্ধনে আদি পরিমাপ আর বজায় ছিল না। আর আদি নকশায় কেবল পূর্ব দিকের দেয়ালে প্রবেশপথ ছিল।ভেতরের মেহরাবে পেইন্ট করা হয়েছে আর গম্বুজে ঝুলন্ত নকশা। ভেতরে ছয় জন মানুষের একসঙ্গে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা ছিল। মূল প্রবেশদ্বারের উল্টোদিকে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব ছিল, যার মাঝেরটি ছিল বড়, আর দু’দিকেরটা অপেক্ষাকৃত ছোট। উত্তরদিকের মেহরাব ক্লোসেট হিসেবে ব্যবহার হত বলে উল্লেখ রয়েছে। বাইরের দেয়ালে প্লাস্টার ও চুনকাম করা ও মুঘল রীতিতে সারিবদ্ধ আয়তাকার প্যানেল দিয়ে সাজানো। গম্বুজ ছিল অর্ধবৃত্তাকার, পদ্ম ও কলসের আর কার্নিশে সারিবদ্ধ পদ্মপাপড়ির নকশা দিয়ে অলংকৃত ছিল।

 

দড়িকান্দি-ফতেপুর বাজারে গিয়ে খানিক খোঁজ করতেই পাওয়া গেল দড়িকান্দি মসজিদের খোঁজ। এক নিম্নভূমির পাড়ে মসজিদের অবস্থান। বাইরে অযুখানা, সঙ্গে ঝা-চকচকে বৈশিষ্ট্যবিহীন এক একতলা দালান। ভেতরটা সাদা টাইলসে আভরিত। মেহরাবও নতুন। পাশেই থাকা মাদ্রাসার বড় হুজুরকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, এটাই সেই দড়িকান্দি মসজিদ। ২০০২-০৩ সালে মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষকতায় এই মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে। তাহলে সেই আদি দালানের কি হলো? পুরোটাই ভেঙে সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে এই দালান। আগেকার ইট স্থানীয়ভাবে বিক্রি করেও কিছু খরচের যোগান হয়েছে।
দড়িকান্দি মসজিদের এই দূর্দশা দেখে যাত্রা করলাম অন্য মসজিদ- দৌলর্দির দিকে। শীতের শর্ষেখেত, নদী, গ্রাম দেখতে দেখতে একসময় এসে পৌঁছুলাম দৌলর্দি মসজিদে। দড়িকান্দি মসজিদেরই সমসাময়িক এই মসজিদ। ’৯৯ সালের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে-‘’ধ্বংসপ্রাপ্ত, তবুও জুমা’র নামাজের জন্য গ্রামবাসীরা এটা ব্যবহার করেন। একটা কমিটি যদিও রয়েছে দেখাশোনার জন্য। মেঝেটায় কেবল সিমেন্টের আস্তরণ পড়েছে। বারান্দা যেটা যোগ করা হয়েছে, সেটা বাঁশের অবলম্বনে টিন দিয়ে ঢাকা’।
আমরা অবশ্য সেটা আর দেখতে পেলাম না। আগের মসজিদের মতই পুরোন স্থাপনার জায়গায় দাড়িয়ে রয়েছে হলুদ রঙের এক দালান। আগের সেই প্রষ্ফুটিত পদ্মের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা টাওয়ার,পূব দিকের কারুকাজের দরজা,বেশ বড় অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ- এসবের বর্ণনা এখন অপ্রয়োজনীয়। ২০০৮ সালের দিকে নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। আগের মসজিদে স্থান সংকুলান হত ৬ জনের, এখন সেখানে ৫০-৬০ জনের মত হয়।দড়িকান্দির মত এই মসজিদেও আর কোনও গম্বুজ বা মিনার বসানো হয়নি, ভবিষ্যৎ বিস্তৃতির কথা চিন্তা করে।

 

সুলতানি সোনারগাঁও থেকে এখনকার সোনারগাঁও অনেক সামাজিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে এখনও। যদিও ঢাকার মত সেখানে এখনও নগরায়ণের প্রভাব পুরোপুরি পড়েনি, তবুও শিল্পায়নের ভেতর দিয়ে চলেছে এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের কারণে সেখানে বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে ব্যবহারযোগ্য ভূমির চাহিদা। আর এই প্রভাব পড়ছে ধর্মীয় ইমারতগুলোতেও। যে কারণে বিস্তৃতি বাড়াতে হচ্ছে সেগুলোর। তবে পুরোন, ঐতিহাসিক মসজিদগুলো সংরক্ষণের একটা দায়িত্ব একটা কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যাস্ত রয়েছে। তারা আরেকটু নজর দিলেই এই পরিবর্তনগুলো হতে পারে দৃষ্টিনন্দন, আগেকার স্থাপনা অবিকৃত রেখেই।

 

লেখক: পরিব্রাজক ও আলোকচিত্রী

*যাবতীয় তথ্য ও মন্তব্যের জন্য লেখক দায়ী
LIVE
Play
অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ৩
অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ২
অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ১
দু’টি মসজিদের হারিয়ে যাওয়া