কলাম

অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ১

নীল এইচ জাহান

অ্যাডভেনচারটা রক্তে নেশার মতো। ট্রাভেলার হবো এই স্বপ্ন ছোটো বেলা থেকে। ভালো লাগে চ্যালেঞ্জ নিতে। যখনই নিজের মতো সুযোগ পেয়েছি চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করেছি নতুন কিছু। গ্রুপ ট্যুর দেয়া হয়েছে বেশ কয়েক জায়গায়। একা একা একটা ট্যুর দেবো এমন শখ আমার অনেক দিনের। ভাবতাম দারুন একটা অ্যাডভেনচার হবে! দলবল নিয়ে যখন ঘুরতে যেতাম প্রায়ই মনে হতো, ইস্ ইচ্ছে হলেই যদি এসে বসে থাকতে পারতাম এই সাগর পাড়ে কিংবা ওই পাহাড় চূড়ায়! তবে ভাবতে যত সহজ মনে হোক করাটা খুব সহজ নয়।

ঘুরাঘুরি পাগল এই আমার এক বছরের বেশী সময় ধরে যাওয়া হয়নি কোথাও। কখনো কাজ, কখনো পরীক্ষা, কখনো বা আত্মাভিমান, কিংবা কখনো আম্মু বকা দেয়.. হা হা হা!!

 

গত একমাস ধরে কেনো যেনো খুব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, নাহ কোথাও একটা যেতেই হবে!  একেকদিন মনে হতো রাত ১০।১১ টায় ন্যাভালে পা ঝুলিয়ে বসে গরম গরম পিঁয়াজু আর কাঁকড়া ভাজা খাই। কাজের চাপ, কাছের বা দুরের মানুষের ব্যবহার সব মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি খুব। নিজেকে নিজের মতো কিছুটা সময় দেয়া দরকার, প্রয়োজন কিছুটা আত্মপোলব্ধি। একাই চলে যাবো পাহাড়ে, সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম! পাহাড়ে যাওয়াটা আমার কাছে ঠিক ঘুরতে যাওয়া নয়, ওটা আমার নিজের জায়গা! মন খারাপের বিকেল রোদে গাছের ছায়ায় বসে বই পড়া কিংবা আদরমাখা সন্ধ্যেবেলায় চাদর মুড়ি দিয়ে বসে, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সূর্যাস্ত দেখা; এতো আমার অতি পরিচিত সময় কাটানোর ধরণ। কে জানে আগের জন্মে হয়তো ছিলাম নীল পাহাড়ের হলুদ পাখি! তাই জন্যেই হয়তো পাহাড়ের সবকিছু আমার খুব পরিচিত লাগে!

 

যেভাবে শুরু

এদিকে বছর ঘুরে ২০১৯ আসছে। নতুন বছরটা একদম নতুনত্ব দিয়েই শুরু হলো। ১,২ তারিখ একটা নাটকের কাজ, আর ৩ তারিখ বিজ্ঞাপনের কাজ, পরের দুদিন তেমন কোনো কাজ নাই, ভাবলাম এই দুদিন  ঘুরে আসতে পারলে মন্দ হতোনা। কিন্তু কিভাবে কি করবো কোনোকিছু ঠিক করতে পারছিলাম না। দেখতে দেখতে ৩ তারিখ এলো। বিজ্ঞাপন বানাবেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ভাই। গল্পটা জানি, শ্যুটিং হবে ট্রেনে এতোটুকু জানি। কিন্তু জানতাম না চলন্ত ট্রেনে শ্যুটিং করতে করতে চট্টগ্রাম যাওয়া হবে! সেখানে হোটেল নেয়া আছে! দুপুরের খাওয়া সেরে, একটু বিশ্রাম নিয়ে বাকি কাজ সেরে ঢাকায় ফেরা; এমনটাই প্ল্যান। শুনেই আমার খুব মজা লাগলো।

 

মানুষ  খুব  মন থেকে যা চায় প্রকৃতি নাকি লেগে যায় তা সত্যি করতে। চট্টগ্রামে পা রাখার পর থেকেই আমার শুধু এই কথাটা মনে পড়ছিল। যেখানে আমি অস্থির হয়ে আছি ঢাকা ছেড়ে এদিকটাতে আসার জন্য, কি অদ্ভুত ভাবে ওখানেই পৌঁছে গেলাম! পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করছিলাম খুব। হোটেলে বসেই চিন্তাটা মাথায় এলো। আমি এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম, আমার গন্তব্যের খুব কাছে। ৪,৫,৬ তারিখ কোনো কাজ নাই। ক্লাসও বন্ধ। একদম পারফেক্ট! সবকিছু খাপে খাপ! তাহলে আমি ঢাকা ফিরবো কেনো? প্রকৃতি সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছে, এবার সাজানোর দায়িত্ব আমার।

 

হাবিব ভাইকে নক করলাম। বেশ ক বছর আগে একটা ট্রাভেলার গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়েছিলাম। ট্যুরের ম্যানেজমেন্ট করতেন হাবিব ভাইয়া। তিনি এখন রিসোর্ট ব্যবসায় জড়িত আছেন। সাজেকে নিজেদের রিসোর্ট দেখাশোনা করছেন। একা একা পাহাড় যাবো; মনে হতেই নক করলাম ভাইয়াকে। যতই পাগলাটে ভুত মাথায় চাপুক, নিরাপত্তার ব্যাপারটা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।। তাকে জানালাম আমি এসে কয়দিন পাহাড়ে থেকে যাবো। একাই আসবো। ভাইয়া বললো ঠিকাছে চলে আয়, কোনো সমস্যা নাই। এখন লোকজনও কম।

 

চট্টগ্রামে একরাত

 

ঝটপট প্ল্যান করে নিলাম আজ রাত এই শহরেই থাকবো, কাল সকালে রওনা হবো খাগড়াছড়ি। সরয়ার ভাইকে ফোন করে জানালাম আমি থেকে যাবো; তিনি আপত্তি করলেন না। বাসায় ফোন করলাম; চট্টগ্রাম থেকে বলছি শুনেই আম্মু আঁতকে উঠলো। বুঝিয়ে বললাম সব। সাফ জানিয়ে দিলো পরদিন সকালেই যাতে রওনা দেই। আমিও জানিয়ে দিলাম, একটু ঘোরাঘুরি করে তবেই ফিরবো। আমি একা কোথায় ঘুরবো, আমার এই ঘোরাঘুরির অসুখ কি কোনোদিন সারবেনা.. এমন একটা দুশ্চিন্তায় আম্মুকে রেখেই ফোন রাখতে হলো। এখন যতো বোঝাবো উনি ততই কঠিন হবেন। আমাদের সাথে ছিলো ছবিয়ালের শাহলা রোদোশী, চমৎকার একটা মেয়ে। আমার থাকার কথা শুনে সেও রাতে থেকে যেতে চাইলো। সরয়ার ভাইকে ফোন করা হলো, তিনি রোদোশীকে থাকতে দিতে খুব একটা রাজি হলেন না। একেবারে শেষ মুহূর্তে ট্রেনে সবাইকে যখন বাই বলে চলে আসবো তখন রোদোশী না পেরে আবার ফোন করলো ভাইয়াকে। এবার রীতিমতো মরিয়া হয়ে! অবশেষে অনুমতি মিললো! রিকশা নিয়ে দুজনে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। রোদোশীকে হোটেলে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়ে আমি  গেলাম এই শহরের কিছু মানুষের সাথে দেখা করতে। দীর্ঘ ৪ বছর পর দেখা হলো কলেজের বন্ধু তামান্নার সাথে। শহরে এদিক ওদিক কিছু সময় কাটিয়ে রোদোশী সহ ৫জন একটা গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম ন্যাভাল। রাত মনে হয় তখন ৯ টার কিছু বেশী বাজে। পিঁয়াজু আর কাঁকড়া অর্ডার করে বসলাম সেই প্রিয় জায়গায়। আহ! ন্যাভাল.. দীর্ঘ ৫ বছর পর! কিছু পুরোনো স্মৃতি! এই জায়গাটা প্রতিবারই আমায় খুব অদ্ভুত সুন্দর কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়। অদুরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ দেখছি, গাইছি আর শুনছি পাথরে আছড়ে পড়া জলের ছলাৎ শব্দ, কি অদ্ভুত এই সময়সঙ্গ! বাতাসের মৃদু ঝাপটা গায়ে মেখে ন্যাভাল রোড ধরে হেঁটে যাওয়া কিছুটা পথ!

অথচ তুমি চাইলেই আরও

বহুদূর হেঁটে যাওয়া যেতো,

হঠাৎ শুরু গল্পের রেশ

কখনো না ফুরাতো।

একলা চলোরে

–——————

চলবে…

 

 

 

LIVE
Play
আকাশের আত্মহত্যা ও পুরুষতান্ত্রিক তসলিমা নাসরিন
লাল সবুজের পতাকা কন্যা নাজমুন নাহার দেশ দেশান্তে!
‘বিএনপির মৌসুমীরা’ আওয়ামী লীগে মৌসুমী পাখি!
অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ৩