কলাম

অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ২

নীল এইচ জাহান

পরদিন রোদোশীর গন্তব্য ঢাকা, আর আমার সাজেক। দুজন একসাথে নাস্তা সারলাম। ওকে বিদায় জানিয়ে আমি রওনা হলাম অক্সিজেন মোড়ের দিকে, ওখান থেকে খাগড়াছড়ির বাস ধরতে হবে। একটু দেরি হয়ে গেলো বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছুতে। ১১টার বাসেও সিট নেই, কিন্তু এরপর গেলে সাজেকে যাওয়াই সম্ভব নয়। টিকেট মূল্যের চেয়ে ১০ টাকা বেশী দিয়ে ওই বাসেই উঠলাম। বসলাম সামনে ড্রাইভারের পাশের জায়গাটুকু তে। হেলপার বললো কিছুদূর পর আসন দিতে পারবে। তাই সই। বাস চলছে খুবই ধীর গতিতে, ভয় পাচ্ছি সময়মতো পৌঁছুতে পারবো কিনা।

 

কারণ খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাবার পথে বাঘাইহাট নামক জায়গায়  আর্মিদের ক্যাম্প পড়বে, সেখানে থামতে হবে। সব পর্যটকদের গাড়ি এক হলে, আর্মিদের এসকর্ট জীপ গার্ড দিয়ে নিয়ে যাবে সাজেক পর্যন্ত। একবার ঠিক সকাল ১০টা, আরেকবার বিকেল ৩টায়। কোনোভাবে মিস্ করলে ফিরে যেতে হবে খাগড়াছড়ি। এই কঠিন নিয়মের পেছনে কারণ পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে ওঁত পেতে থাকা বিপদ!

 

পাহাড়ি ত্রাসের হাতছানি

আমি যখন খাগড়াছড়ি নামলাম  তখন ৩টা বাজে। হাবিব ভাইয়া সিএনজি বলে রেখেছে, তড়িঘড়ি রওনা দিলাম। বাঘাইহাট যখন পৌঁছুলাম তখন বাজে ৪টা। এসকর্ট জীপ ছেড়ে গেছে আরও এক ঘন্টা আগেই। এমনিতেই তারা ছাড়তে চাইলোনা, আমায় দেখে চোখ আরও কপালে উঠে গেলো সবার। অবাক হয়ে জানতে চাইলো একা কোথা থেকে আসছি। জানালাম আমার ভাইয়ার রিসোর্ট আছে, সেখানেই যাচ্ছি। এটা শুনে কিছুটা সহজ হলো।  কিন্তু একা একটা মেয়েকে কোনোভাবেই অনুমতি দিবেনা; ব্যাপারটা আমি মেয়ে বলে নয়, জানালো কিছুদিন আগেই এক পাহাড়ি মেয়েকেই অপহরণ করা হয়েছে; আর্মিদের গাড়ি ছাড়া কোনোভাবেই যাওয়া নিরাপদ নয় ওদিকটায়। তাদের যুক্তি কোনোভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু আমাকেও তো যেতেই হবে! বড় অফিসার এলেন; নানান ভাবে বোঝনোর-পাল্টা বোঝানোর চেষ্টা, ওদিক থেকে ভাইয়ার ফোন, কিভাবে কি করা যায়, এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে যখন প্রায় সাড়ে চারটা বাজে, তিনটা বাইক এসে থামলো। চারটা ছেলে, তিনটা বাইক নিয়ে ঢাকা থেকে এসেছে। ওদের দেখে সাহস পেয়ে বললাম সবাইকে একসাথে যেতে দিতে। অফিসার কিছুটা মনে হলো দোটানায় ভুগছেন, একসময় এই সম্ভাবনাও নাকচ করে দিলেন। চারটা ছেলে থাকলেও পথটাকে তিনি নিরাপদ ভাবছেননা। চলছে অনুরোধ। কিন্তু তিনি অনড়। এরই মধ্যে বিকেল পাঁচটা বাজার আর পাঁচ মিনিট বাকি। কোথা থেকে একটা নোয়াহ্ এসে থামলো। আরেকটা ট্যুরিস্ট গাড়ি! এবার মনে হলো অফিসার ভালোই বিপদে পড়ে গেলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হবে। শেষতক মিললো অনুমতি। কিন্তু আমাকে নিয়ে তিনি তখনো দুশ্চিন্তায়, বাইকার, গাড়ির পর্যটক সবাইকে বলে দিলেন, ছাড়ছি তবে এই মেয়েটার দায়িত্ব আপনাদের। একবার আমাকে বললেন শেষে আসা গাড়িটাতে যাতে উঠে পড়ি, একা পিছনে পড়ে গেলে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু আমার ড্রাইভার বাধ সেধে বললো সে গাড়ির আগেই যেতে পারবে, গাড়িই নাকি সময় নেয় বেশী। শেষে অফিসার সবাইকে নির্দেশ দিলেন, প্রথমে বাইক যাবে, তার পিছনে আমি, আমার পেছনে গাড়ি।আমার ড্রাইভারকে পইপই করে বলে দেয়া হলো যাতে ঠিক মাঝখানে থাকে। আমাকে ফোন নাম্বার দিয়ে বলা হলো যাত পৌঁছে অবশ্যই জানাই।

 

ছুটছি সাজেকের পথ ধরে। কিছুদুর ঠিকঠাক চলার পর অটোর গতি মনে হলো কমছে। বাইক সামনে চলে গেছে আগেই। একসময় গাড়িও আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। আমি একা পেছনে পড়ে যাওয়ায় ড্রাইভারকে বললাম স্পীড বাড়াতে। আমার ঘ্যানঘ্যান শুনতে শুনতে একসময় আবার গাড়ির আগে গেলো সিএনজি। আমি শান্ত হলাম।

 

আমরা চলছি লোকালয় ছেড়ে দুরে, বিকেল পড়ে আসছে, পশ্চিমাকাশ ধারণ করছে গাঢ় লাল রং। শহর থেকে হাজার মাইল দুরে এই পাহাড়ি মায়াপুরী  ধীরে ধীরে এক স্বপ্নজাল বুনতে শুরু করেছে।

 

 

কিন্তু এই সব কোনোকিছুই আমি এখন উপভোগ করতে পারছিনা। সিএনজির গতি আবার কমতে শুরু করেছে, গাড়ি পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো। আমি ড্রাইভারের সাথে রীতিমতো জোর করছি জোরে চালানোর জন্য। কিন্তু সে নির্বিকার, বলছে ভয় পাচ্ছেন কেনো, এখানে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু ভয় আমি পাচ্ছি, তার আচরণও ভালো লাগছেনা আমার। চারদিকে তাকালাম, অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়ি বাঁকগুলোকে ভয়ংকর মনে হচ্ছে। এখন আরও নির্জন জায়গায় আমরা, আমার সামনে গাড়িটাকে দেখতে পাচ্ছি, ড্রাইভারকে বারবার বলছি গাড়িটার সামনে যান। কিন্তু সে আমার কথা মনে হলো কানেই তুলছেনা। তার আচরণ একটুও ভালো লাগছেনা আমার। সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে, পাহাড়ের বাঁক রহস্যময় হচ্ছে আরও। সামনের গাড়ির দিকে মরিয়া হয়ে তাকিয়ে আছি, গাড়িটা একটা বাঁক ঘুরছে, হঠাৎ ড্রাইভার থামিয়ে দিলো আমার সিএনজি! আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে দৌড়ে নেমে পড়লাম, গাড়িটা আমার চোখের সামনে বাঁকের আড়ালে হারিয়ে গেলো। পেছনে সিএনজি থেমে গেছে খেয়ালই করেনি। প্রচন্ড ভয় পেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি ড্রাইভারও নেমেছে, আমার দিকে তাকিয়ে বললো তেল শেষ! এমন নির্জন জায়গায় এভাবে থামলো বলে রাগের চেয়ে বেশী ভয় গ্রাস করলো আমায়। রুদ্ধশ্বাসে আশপাশে দেখতে দেখতে ফোন করলাম সেই আর্মি অফিসারকে, বললাম সিএনজি এভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছে, উনি জিজ্ঞেস করলেন, গাড়ি আপনার পেছনে না? বললাম, না সামনে চলে গেছে, খুব রেগে গেলেন, আমি তাকে বললাম সেইগাড়ির কাউকে ফোন দিয়ে সামনে দাঁড়ানোর জন্য অথবা পিছিয়ে আসার জন্য বলতে। ফোন রেখে আবার সিএনজিতে উঠলাম, একেকটা মুহূর্ত কাটছে আতংকে, কিকরবো এখন যদি পাহাড়ি সন্ত্রাস ঘিরে ধরে! চিৎকার করে মরে গেলেও কেউ শুনতে পাবেনা। তার তেল ভরা শেষ হলো। ভয় লুকিয়ে আমি বললাম, অফিসারকে ফোন দিয়ে খুলে বলেছি সব। এখানে এভাবে সামনের গাড়িকে সংকেত না দিয়েই থেমেছেন শুনে রেগে গেছেন খুব, আপনাকে কিন্তু সে চিনে। আর সামনে গাড়ি আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, আপনি তাড়াতাড়ি যান। কি বুঝলো কে জানে, কিছু না বলেই চলতে শুরু করলো।

 

জানিনা খারাপ কিছু হতে পারতো কিনা, তবে সন্ধ্যে নাগাদ সাজেক ভ্যালিতে পা রাখলাম নিরাপদেই।

অতঃপর সাজেক

 

চলবে….

LIVE
Play
আকাশের আত্মহত্যা ও পুরুষতান্ত্রিক তসলিমা নাসরিন
লাল সবুজের পতাকা কন্যা নাজমুন নাহার দেশ দেশান্তে!
‘বিএনপির মৌসুমীরা’ আওয়ামী লীগে মৌসুমী পাখি!
অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ৩