কলাম

অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ৩

নীল এইচ জাহান

যে রিসোর্টে উঠলাম তার নাম নগরায় নক, বাংলায় অতিথিশালা। হাবিব ভাই ছাড়াও দেখাশোনার জন্য আছে খাগড়াছড়ির বাবু ভাই, আর খোকনদা। রিসোর্টে নিজেদের খাবার দাবার সব রান্না করে খোকনদা, ঝাল একটু বেশী থাকে তবে দারুন মজা। ঢুকেই বললাম আমি খুব ক্ষুধার্ত! ফ্রেশ হয়ে খেয়ে কিছুক্ষণ বারান্দায় বসলাম। আমি গেছি এক কাপড়ে। এদিকে সাজেকে প্রচন্ড ঠান্ডা। শেষে হাবিব ভাইয়ার বড় জ্যাকেট পরেই হাঁটতে বের হলাম। দুইজন হাঁটতে হাঁটতে হ্যালিপ্যাডের দিকে গেলাম। ভাইয়া অনেকক্ষণ ব্যাস্ত থাকলো ফোনে ব্যাবসার আলাপ নিয়ে, আমি রাস্তায় সটান শুয়ে পড়ে তারাভরা আকাশের সৌন্দর্য গিলতে থাকলাম। আমার পরিচিত যেই সাজেক যায় আমি বলে দেই, সাজেকের রাস্তায় শুয়ে আকাশ দেখতে ভুলো না কিন্তু! তারপর ভাই-বোন হ্যালিপ্যাডে বসে কিছু সুখ দুঃখের কথা বলে কটেজে ফিরলাম। আমাদের রিসোর্টের সামনে দেখলাম পাহাড়ী কিশোর ঋকাশ ত্রিপুরা ইউকুলেলে বাজিয়ে গান শোনাচ্ছে সবাইকে। সাজেকে মূলত দুই গোত্রের বাস; লুসাই ও ত্রিপুরা। ভাইয়া আমায় সব বুঝিয়ে দিয়ে রাতে চলে গেলো ‘মেঘমালা’য়, তাদের আরেকটা রিসোর্টে। ভ্রমণপাগল আরও কয়েকজন রিসোর্ট ব্যাবসায়ী মিলে তারা রাতে ওখানেই আড্ডা দিবে, থাকবে।

 

আমি একা পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম।

 

ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে বারান্দায় গেলাম। সাজেকের সূর্যদয় সবচেয়ে মোহনিয়। তুলো তুলো মেঘ আদুরে বেড়ালের মতো যেনো নাক ঘঁষতে থাকে আঙিনায় এসে। শীতকালে যদিও মেঘের ভীড় কিছুটা কম, তবুও অপরূপ! ঠান্ডাটা আমার বরাবরই বেশী, তাই একেবারে কম্বল সমেত গিয়ে বসলাম বারান্দার চেয়ারে। আর চুপচাপ অবলোকন করতে থাকলাম কিভাবে সকাল আসে এ প্রান্তরে..

নগরায় নক এর পেছনে একটা উঠোন আছে, উঠোনের শেষ প্রান্তে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে একটা বেন্চি পাতা। তার পাশে একটা পুরোনো বাঁশের ঘর। একটু পর সেই বেন্চিতে গিয়ে বসলাম। যতদূর দৃষ্টি যায় উঁচুনিচু পাহাড়।পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ভেসে যাওয়া মেঘ আমাকেও ভাসিয়ে নিয়ে গেলো এক অন্য জগতে।  মেঘ ভেদ করে ধোঁয়ার পর্দার মতো ঢেউ খেলে গেলো প্রিয়মুখ। সাজেকে অনেকটা সময় আমার কেটেছে ওখানটায় বসে। পাহাড় দেখতে দেখতে  আপন মনে যখন হারিয়ে যাই আর হঠাৎ পায়ের শব্দে পেছনে ফিরে দেখি খোকনদা এক চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আহ্ খুব  আরাম লাগ!

 

নিজেকে ওই মুহূর্তে খুব সুখি মানুষ মনে হয়।

 

নাস্তা করে রিসোর্টের আরও কিছু সদস্যসহ আমরা রওনা দিলাম কংলাক এর উদ্দেশ্যে, এখানকার সবচাইতে উঁচু পাহাড়। চূড়ায় দাঁড়িয়ে একবারে চারপাশ দেখে নেয়া যায়। তবে একেতো পাহাড় চড়ার কষ্ট তার উপর প্রচুর ধুলোবালি। উঠতে নামতে সব ধুলো মেখে ভুত! যেহেতু আমার অতিরিক্ত জামাকাপড় নাই, ফিরে এসে আগে জলি দির দোকান থেকে এক সেট থামি কিনে কটেজে ঢুকলাম। বরফ শীতল জলে গোসল সেরে, থামি পরে পুরোদস্তুর পাহাড়ি বনে গেলাম। একটা বই হাতে নিয়ে পেছনের আঙিনায় চলে গেলাম রোদ পোহাতে।

 

পেছনের আঙিনায় আপন ভুবন রচনা করে সময়ক্ষেপণ, কিছুক্ষণ রাস্তায় হাঁটাহাঁটি, পাহাড়ের পথ ধরে যেতে যেতে পরিচিত হওয়া পাহাড়ি মানুষ গুলোর সাথে, এই করেই কেটে গেলো দুটো নির্ভেজাল দিন। আগের দিনের মেঘরাজের বাসিন্দারা সন্ধায় নগরায়তে এলো; পরোটা দিয়ে খোকনদার হাতের কলিজা ভুনা আর গানের আসর জমলো বেশ! তারপর রাত বাড়তে আমি আবার গিয়ে বসলাম বাইরের বারান্দায়, মাথার উপর সুবিশাল আকাশ থোকা থোকা তারার জোনাকি নিয়ে বসে আছে। আর ওই আকাশ নিয়ে বসে আছে একা মেয়ে, সাথে এলভিস প্রিসলি।

 

ঘরে ফেরা

–————

 

পরদিন সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিলাম। বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে একবার বললাম গুড বাই সাজেক । সবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম, বাবু ভাই পেছন থেকে বললেন, এবার বর্ষায় আসবেন। আসবো, বর্ষায়ই তো পাহাড় আমার সবচেয়ে প্রিয়! ভাইয়া বললো, আবার হুটহাট মন করলেই চলে আসিস। একটা ট্যুরিস্ট জীপের সামনে উঠে পড়লাম,  দেখি সামনের জীপের ছাদে বসে আছে ঋকাশ, আমায় দেখে এবার একগাল হাসলো শুরুর দিকের মুখচোরা ছেলেটা। মাঝপথে যেখানে জীপ থামলো সে আমার কাছে চলে আসলো, দুজন বসে বসে পাহাড়ের ফল খেলাম। কি সুন্দর গায় ছেলেটা, সাথে ইউকুলেলে বাজায়। কিন্তু ওর নিজের কোনো ইউকুলেলে নাই। ঢাকায় ফিরে আমার যদি আবদার করার কেউ থাকতো, আমি একটা ইউকুলেলে চাইতাম, পরের বার ঋকাশের জন্য নিয়ে যেতাম ।

 

ছাদে চড়ে নামলাম খাগড়াছড়ি। ২ টায় ঢাকার বাসে টিকেট কেটে খাগড়াছড়িতে নগরায় নকের রেস্টুরেন্টে বসে সেরে নিলাম দুপুরের খাবার। ঠিক দুটায় বাস ছাড়লো আর আমি হেলতে দুলতে চললাম আমার  চির পরিচিত শহরের দিকে…

 

LIVE
Play
আকাশের আত্মহত্যা ও পুরুষতান্ত্রিক তসলিমা নাসরিন
লাল সবুজের পতাকা কন্যা নাজমুন নাহার দেশ দেশান্তে!
‘বিএনপির মৌসুমীরা’ আওয়ামী লীগে মৌসুমী পাখি!
অ্যাডভেনচারের নেশায় | পর্ব ৩