ফিচার ও, ফিচার

অন্যের ফেইসবুক পোস্টে আপনার ঘরে অশান্তি!

ইন্টারনেট দিয়েছে বেগ (গতি) কেড়ে নিয়েছে আবেগ। প্রবচনটি আজকের সময়ে কতখানি সত্যি! ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন যতই হাতের নাগালে আসছে, প্রিয়জন যেন ততই সরে যাচ্ছে দূরে!

এক সময় ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন ছিল বিলাসিতার ব্যাপার। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেটাই এখন ভীষণ জরুরী বস্তুতে পরিণত হয়েছে। মানুষ হয়তো একবেলা উপোস থাকলেও খুব একটা আপত্তি জানাবে না। কিন্তু হাতের ওই জড়পদার্থ স্মার্টফোনটি এবং তার ইন্টারনেটহীনতা যেন ভাবতেই পারেনা।

আজকের এই সময়ে প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছেই তার স্মার্টফোনটি একটি ছোটোখাটো পোর্টেবল লাইফের মত। মানে দ্বিতীয় জীবন। অনেকের কাছে ব্যাপারটা আবার মাদকের মতো। একমুহুর্ত মোবাইল ছাড়া থাকা যায় না।


এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফলে মনের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত ঘাই মারা সকল বলা না বলা খুঁটিনাটি অনেক কিছু তারা শেয়ার করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর সেগুলোই ছড়িয়ে যায় নানান মনে নানাভাবে। ছড়িয়ে যায় মানুষ থেকে মানুষজনে, পরিবারে।


এক সময় মানুষের ঘরের গোপন খবর গোপন রাখাই নিয়ম ছিল। এমনকি পরিবারের বিশেষ করে একান্নবর্তী পরিবারের অন্য সদস্যদেরও জানাতে দ্বিধাবোধ করতো। পারিবারিক মান অভিমান কিংবা ঝগড়া বিবাদ অথবা আনন্দ উৎসব যাই হোক না কেন তা একান্তই শুধু নিজেদের ভেতরই ছিল।


আর এখন মানুষ মান অভিমান করলে তার সবিস্তারিত তুলে ধরেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আমরা এমন এক জায়গায় নিজেদের অনুভুতি তুলে দিচ্ছি যেখানে আসল বলে কিছু নেই।


সবই সাজানো গোছানো, যেখানে সবই নীরস। আমরা ঠিক কেন এতটা সহজ করে ফেলি নিজেদের অনুভূতিকে তার সঠিক কোন কারণ কি আমরা জানি, না জানিনা! শুধু ক্ষণিক অনুভূতির আহাজারিতে পড়ে নিজেকে সস্তা শান্ত্বনায় খুঁজে পেতে চাই।


ফলে অপরিচিত লোকেরা এই সস্তা শান্ত্বনায় আমাদেরকে ভাসিয়ে দেয় বাস্তবতার অনেক বাইরে। যেখানে আসলে নিশ্চয়তা বলে কখনোই কিছু নেই, থাকেনা।


কেউ হয়তো টাকা দিয়ে বানানো তোড়া উপহার দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া কোন ললনাকে, কেউবা হীরের দামি আংটি। ফলে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েও আশা রাখেন তার মান ভাঙাতে তার স্বামীও তাকে এসব দেবেন।


কিন্তু আসলেই কি সেটা সম্ভব বা আদৌ বাস্তব? ফলে এসব নিয়ে আরো বেড়ে যায় যাবতীয় বাদানুবাদ। সাধারণ বিবাদ পৌঁছে যায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত। অথচ যাদের বিবাদ নিয়ে এসবের সৃষ্টি তারা হয়তো বেশ চুটিয়েই প্রেম করছেন বা সুখেই কাটাচ্ছেন সংসার।


আবার বিবাহবার্ষিকী কিংবা জন্মদিনে স্ত্রী বা প্রেমিকাকে চমকে দিতেও অনেকে অনেক ধরনের আয়োজন করে থাকেন। এক শ্রেনীর কল্পনাপ্রবণ মানুষ এসব দেখে আবার মনে মনে সেরকম কিছু প্রত্যাশা করতে থাকেন। আর সে প্রত্যাশাগুলো যখন পূরণ হয়না তখন একটা বেদম চাপা ক্ষোভ ভেতরে ভেতরে পুষে রাখেন, যা পরবর্তীতে বিস্ফোরণে রুপ নেয় অনেকের ক্ষেত্রেই বা অনেকেই রুপ দেন ইচ্ছা করে।

তাই নিজেদের আনন্দঘন মুহূর্তের সকল ছবিই যে শেয়ার করতে হবে বিষয়টা সেরকম নয়। কিছু ব্যাপার একান্তই শুধু নিজেদের জন্য থাকাই শ্রেয়। আপনার প্রতি প্রিয়জনের আবেগের বহিঃপ্রকাশ হয়তো অন্যরকম, তাই অন্যের পোস্ট দেখে বা অন্যের জীবনাচরণ দেখে সেরকম কিছু আশা করাটা আমার কাছে অনেকটাই নিজেকে ছোট করার মত।


আপনার প্রিয় মানুষটি হয়তো আপনি এসে পাশে বসে তার হাতটি ধরলে যে হাসিটুকু তার মুখ থেকে ঝরে পড়ে তা যেকোন কল্পনাবিলাসী অনুভূতির চেয়ে লক্ষ-কোটিগুন দামী, যদি আপনি সত্যিই তার অনুভূতিকে ভালবেসে থাকেন। তাকে নিজের মনে করে থাকেন। যদিও এটা যে যার জায়গা থেকেই অনুধাবন করা উচিত কিন্তু বর্তমান অস্থির সময়ে কার আছে সে সময়, কেই বা করে যথার্থ মূল্যায়ন?


তাই যারা এসব পোস্ট শেয়ার করেন বা অন্যের পোস্ট দেখে নিজে উদ্বুদ্ধ হন, সচেতনতাটা সেখান থেকেই হওয়া জরুরি। কেননা আপনার সুখ যাতে অন্যের অসুখের কারণ না হয়ে দাঁড়ায় বা অন্যের বিলাসীতা দেখে যেন আপনার মনোভাবটা আপনার পার্টনারের প্রতি বিষাদময় না হয়।


এখানে বলে রাখা ভালো, ফেসবুকে অনেকেই আছেন যারা অন্যের ছবি বা লেখা কপি করে নিজের বলেও চালিয়ে দেয়। মানে ফেসবুকের বা অন্য সামাজিক মাধ্যমের সকল পোস্টই বাস্তবিক নয়। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও সে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারবেনা। সুতরাং সচেতন হতে হবে নিজেদেরকেই, অর্থাৎ ব্যবহারকারীর।


কেননা সামাজিক অবস্থান এবং ব্যক্তি ভেদে মানুষের অনুভূতির বা আবেগের প্রকাশ ভিন্ন হওয়াটা স্বাভাবিক। এমনকি একজন মানুষ চাইলেও তার আর্থিক দুর্বলতার কারণে অনেক কিছুই করতে পারেনা। আবার অনেকে এটাকেই অজুহাত হিসেবে ধরে নেন।

আপনি হয়তো এখনকার সামান্য একটা গিফট চেয়েও পাচ্ছেন না। কিন্তু আপনাকে দিতে না পারার কষ্টটা আপনার চেয়ে আপনার প্রিয়তম প্রেমিক বা পার্টনারের বেশি। কারণ আপনাকে ঘিরেই তার সমস্ত ভালোলাগা, ভালো থাকা। সেখানে আপনি কিছু চাইলে আপনাকে ফেরানোটা তার চাওয়া নয়।

কিন্তু আপনার ভাষ্য যদি হয়, চাইলে যে কেউই অল্প অল্প সঞ্চয় করে প্রিয়তমাকে দামি গিফট করতেই পারে, তবে আপনি কিন্তু আপনার সঙ্গীকে বুঝলেন না। আর সেটাও কিন্তু পরিস্থিতির ভিন্নতায় সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু আমরা কি সেটা বুঝি?

তাই প্রিয়জনকে ভালোবাসুন, যেকোন অবস্থায় পাশে থাকুন। সঙ্গীর প্রতি আপনার আজকের সহযোগিতা ও সমানুভূতিই এনে দিতে পারে আগামী দিনের সুখ।

ফাসা/ফই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LIVE

অন্ধদের দৃষ্টি ফেরাবে বায়োনিক চোখ
আপনার ফোনে আড়ি পাতলে কিভাবে বুঝবেন?
দিলীপের পরকীয়ার যাতনা আমৃত্যু সয়েছেন সায়রা
গাঁজা সেবনকারীর মন ও মস্তিষ্কে কি ঘটায়?