ফিচার, ফিচার ও

গাঁজা সেবনকারীর মন ও মস্তিষ্কে কি ঘটায়?

ব্যথানাশক চিকিৎসায় গাঁজার ব্যবহার নিয়ে বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সবসময়ই একটা জুতসই মতামত দেন। তাই বিশ্বব্যাপী গাঁজা নিয়ে থাকা বিরুপ ধারণা পাল্টে যাচ্ছে মানুষের।

কানাডা ও নেদারল্যান্ডের মতো অনেক দেশই এখন গাঁজা বৈধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকার গাঁজা বেচাকেনা এবং সেবন নিষিদ্ধ রাখলেও দেশটির প্রায় ২০টি অঙ্গরাজ্য চিকিৎসা বাদেও বিনোদনের জন্য গাঁজার ব্যবহার বৈধ করেছে।

গাঁজা কী?

গাঁজাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। সাধারণত মারিজুয়ানা, গঞ্জিকা, গাঞ্জা, সিদ্ধি এসব নামেই বেশি পরিচিত। মূলত গাঁজা উদ্ভিদের এক ধরনের প্রস্তুতি যা ‘সাইকোঅ্যাক্টিভ ড্রাগ’ এবং ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

মাদক হিসেবে গাঁজার ব্যাবহার হয় ২০০০ সাল থেকে। হিন্দুধর্মের বেদ-পুরাণেও গাঁজা নিয়ে কম লেখালেখি নেই। পুরাণে উল্লেখ আছে দেবতারা নাকি গাঁজা গাছের জন্ম দিয়েছেন এবং সমুদ্র মন্থনকালে অমৃত থেকে গাঁজা গাছের উৎপত্তি।

গাঁজা গাছ:

গাঁজা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Cannabis Sativa Linn. এ গাছের মধ্যে আবার স্ত্রী-পুরুষ গাছও আছে। দুই গাছেই ফুল হলেও গাঁজা, ভাং বা চরস কিন্তু তৈরি করা হয় শুধু স্ত্রী গাছ থেকেই।


গাঁজাঃ
 

স্ত্রী ফুলকে ৪৮ ঘণ্টা রোদে শুকালে ফুলগুলো জমাট বেঁধে যায়। এই জমাটফুলই গাঁজা নামে বিক্রি হয়।

ভাংঃ 

স্ত্রী গাছের পাতা ও কাণ্ড শুকিয়ে বা কাঁচা পিষে পানির সাথে মিশিয়ে শরবত করে পান করে। ভাং এর শরবত পুরান ঢাকায় বিখ্যাত। হিন্দুদের কালি পূজায় এ সরবত তৈরি করা হয়।

সিদ্ধিঃ 

গাছের পাতা শুকিয়ে সিদ্ধি তৈরি করা হয়। সিদ্ধি থেকে অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে ঔষধ তৈরি করা হয়। এছাড়া সিদ্ধি মুখে পুরে চিবোয় অনেকে।

চরসঃ 

গাছের আঠা থেকে চরস তৈরি হয়। গাঁজার ফুল শুকানোর সময় উৎপন্ন হওয়া গুঁড়াকে আঠার সাথে যুক্ত করে চরস তৈরি করা হয়।

হাসিসঃ 

গাঁজার স্ত্রী ফুলের নির্যাস থেকে হাসিস তৈরি হয়। গাঁজা গাছ থেকে উৎপন্ন সকল নেশা দ্রব্যের মধ্যে হাসিসকে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করা হয়।

এইযে এতসব জানলেন, তাতে খুশি হবার কোন কারণ নেই। আমাদের সমাজে এটি মাদক হিসেবেই বিবেচিত হয়। আর কোন মাদকই সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। তবুও অগোচরে মানুষ মাদকের ভয়াল থাবায় জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। এতে তারা শুধু নিজের জীবনকেই নষ্ট করেনা, বরং একইসাথে সমাজের কাছে নষ্ট করে নিজের পারিবারিক সম্মান।

তাই মাদক থেকে দূরে থাকুন, অন্যকেও এতে নিরুৎসাহিত করুন। বজায় রাখুন সামাজিক শৃঙ্খলা। মনে রাখবেন, আপনার পারিবারিক শিক্ষাই ফুটে উঠবে আপনার সমসাময়িক জীবনাচরণে।

আপনি যদি গাঁজা সেবন করে থাকেন তবে জেনে নিন এটি সেবনের পর তা আপনার মস্তিষ্কের সাথে আসলে কি কি করে-

গাঁজার অপকারিতা

গাঁজার ধোঁয়ায় আপনার কতখানি ক্ষতি হয় তা বোঝার জন্য আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন (AHA) ইঁদুরের উপর ক্যানাবিসের প্রভাব পরীক্ষা করে দেখেছে। ফলাফলটি এমন, এটি রক্ত ​​সঞ্চালনের জন্য ব্যাপক গুরুতর ক্ষতি।

গাঁজার ধোঁয়া আপনার ভেতরে মাত্র ১ মিনিট থাকলে, তা অন্তত ৯০ মিনিটের রক্ত ​​সঞ্চালনকে বাধাগ্রস্ত করে।

শুধু তাই নয়, সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, ক্যান্সারের চিকিৎসায় মারিজুয়ানা বা গাঁজার ব্যবহারে ক্যান্সার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গাঁজা স্মৃতিশক্তি লোপ পায়

গাঁজা আপনার স্মৃতিশক্তিকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। এমনভাবে কমিয়ে দেবে আপনি ঘরে তালা মেরে তিনবার চেক করবেন তালাটি ঠিকমত লাগিয়েছেন কি না। গাঁজা সেবনে এতটাই স্মৃতিভ্রষ্ট হতে থাকবেন আপনি ধীরেধীরে, টেরও পাবেন না। গাঁজা সেবনকারীদের মস্তিষ্কের কিছু অস্বাভাবিকতা রয়েছে। এই কারণে, সবকিছু তারা দ্রুত ভুলে যায়।

অনেক মানুষের ধারণা গাঁজায় সৃজনশীলতা বাড়ে। এই চর্চিত ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল, নেদারল্যান্ডের  গবেষকরা বলছেন, এটি তাদের সৃজনশীলতা বাড়ায় না বরং দ্বিগুণ হারে কমায়।

এটি স্থায়ীভাবে মানুষের মস্তিষ্ককে দখল করে নিয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলিকে ধ্বংস করে দেয়। এ কারণেই মাদক সেবনের পর মানুষ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। গাঁজা শুধু শরীরকেই প্রভাবিত করে না, বরং এটি মানুষের আচরণকেও সমানভাবে প্রভাবিত করে। গবেষকরা দীর্ঘ ২০ বছরের গবেষণায় এটি নিশ্চিত করেছেন।

রোগ নিরাময়ে গাঁজার ব্যবহার: গাঁজা বলতেই সাঁই করে মাথায় একটা নেতিবাচক ধারণা চলে আসে। নড়েচড়ে উঠি মাদকের কথা ভেবে। কিন্তু এই গাঁজাই রোগ নিরাময়ে চিকিৎসকরা বিশেষভাবে ব্যবহার করে থাকেন।

গাঁজা সেবন ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমায় না বরং বাড়ায়। Journal of the American Medical Association এ প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলটা ছিলো বেশ অদ্ভুত। ৫,১১৫ জন রোগীর উপর ২০ বছর গবেষণা চালানোর পর দেখা গেছে, যেখানে তামাক সেবনকারীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমেছে সেখানে গাঁজা সেবনকারীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বেড়েছে।

Draven Syndrome চিকিৎসায় গাঁজার উপকারিতা অতুলনীয়। Dravet Syndrome মৃগি রোগের একটি প্রকটতম রুপ। এ রোগে আক্রান্ত শিশু শার্লটের গাঁজা সেবনে সুস্থ্য হয়ে ওঠার কাহিনী গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিলো। আর এর ফলে রাতারাতি গাঁজার প্রতি মানুষের ইতিবাচক ধারনা বাড়তে শুরু করে।

এছাড়া  গ্লুকোমা’র (Glaucoma) চিকিৎসায়ও গাঁজা ব্যবহার করা হয়।

২০০৭ সালে California Pacific Medical Center in San Francisco তে গবেষনা করে দেখা গেছে CBD (cannabidiol) ক্যান্সার বিস্তার প্রতিরোধে গাঁজা ব্যাপক সহায়তা করে। কেমোথেরাপি নেয়ার ফলে সৃষ্ট ব্যাথা এবং বমি বমি ভাব দূর করতে গাঁজার ব্যবহারে উপকৃত হয়েছেন বলে অনেকেই জোর দাবী করেন।

গাজা হেপাটাইটিস সি এর চিকিৎসার পার্শ প্রতিক্রিয়া কমিয়ে চিকিৎসাটিকে আরও কার্যকর করে তোলে। তাছাড়াও গাঁজা ব্যথা উপশমে, অনিদ্রা কমিয়ে ঘুমাতে সাহায্য করে এবং গিঁটে বাতজনিত অস্বস্তি দূর করে। ট্রমা নিরোধে এটি সক্রিয় ভুমিকা রাখে।

ফারদিন সানি/ফই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LIVE

‘কাঁচা বাদাম’ গান ও একজন ভুবন বাদ্যকার
মা ও স্ত্রীর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চান?
অন্ধদের দৃষ্টি ফেরাবে বায়োনিক চোখ
আপনার ফোনে আড়ি পাতলে কিভাবে বুঝবেন?