27.1 C
Dhaka
শনিবার, আগস্ট ২০, ২০২২

শবে বরাত: একটি পর্যালোচনা

বিশেষ সংবাদ

Juboraj Faishal
Juboraj Faishalhttps://www.nagorik.com
Juboraj Faishal is a News Room Editor of Nagorik TV.
- Advertisement -

শবে বরাত দুইটি ফারসি শব্দ। শব অর্থ রাত, রজনী আর বরাত অর্থ ভাগ্য। একসাথে অর্থ ভাগ্য-রজনী। আর বারাআত বললে অর্থ হবে সম্পর্কচ্ছেদ। আরবিতে এ রাতকে বলা হয় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শাবান মাসের মধ্যরজনী)।

 

শবে কদরকে অনেকে লাইলাতুল বারাআত বলেছেন, শাবানের মধ্যরজনীকে নয়। শাবানের মধ্যরাত সম্পর্কে হাদীস- ১. আয়েশা (রাযি) বলেন, ‘একরাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে খুঁজে না পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হলাম, আমি তাকে ‘বাকি কবরস্থানে’ পেলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, তুমি কি মনে কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার ওপর যুলম করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম আপনি আপনার কোনো স্ত্রীর নিকট চলে গিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ শাবানের মধ্যরাতে নিচ আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশি লোকদের ক্ষমা করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৬/২৩৮, তিরমিযী ২/১২১, ১২২)।

 

ইমাম বুখারী (র.) বলেন, এ হাদীস দুর্বল। হাদীসটির সনদ দুর্বল বলে সব মুহাদ্দিস একমত। ২. আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা শাবানের মধ্যরাতে আগমন করে মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ছাড়া সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ, ১/৪৫৫, তাবরানি- মুজামুল কাবির ২০/১০৭) আল্লামা বুছিরি বলেন, ইবনে মাজাহ’র হাদীসের সনদ দুর্বল। আল্লামা হাইসামি বলেন, তাবরানি’র হাদীসের সনদ শক্তিশালী। ৩. আলি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন শাবানের মধ্যরাত আসবে তখন তোমরা সে রাতের কিয়াম ও সেদিনের সিয়াম রাখবে। কারণ সেদিন সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা নিচ আকাশে নামেন আর বলেন, ক্ষমা চাওয়ার কেউ কি আছে, যাকে আমি ক্ষমা করব? রিযিক চাওয়ার কেউ কি আছে, যাকে আমি রিযিক দেব? সমস্যাগ্রস্ত কেউ কি আছে, যে আমার কাছে মুক্তি চাইবে আর আমি তাকে মুক্তি দেব? এমন এমন কেউ কি আছে? এমন এমন কেউ কি আছে? ফজর পর্যন্ত তিনি এভাবে বলতে থাকেন।’ (ইবনে মাজাহ, ১/৪৪৪) আল্লামা বুছিরি বলেন, এ হাদীসের বর্ণনাকারীর মধ্যে ইবনে আবি সুবরাহ আছে যে হাদীস বানাতো। তাই এটি জাল। প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীসের আলোকে অনেক হাদীসবিদ শাবানের মধ্যরাতের ফযিলত আছে বলে মনে করেন। তাদের মধ্যে আছেন ইমাম আহমাদ, ইমাম আওযায়ি, ইমাম ইবন তাইমিয়া, ইমাম ইবনে রজব ও আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানি (র.)। অন্যদিকে বুখারী (হাদীস নং ১১৪৫) ও মুসলিমের (হাদীস নং ৭৫৮) সহীহ হাদীসের আলোকে অনেক হাদীসবিদ এ রাতের ফযিলত অস্বীকার করেন। তাদের মধ্যে আছেন শায়খ আব্দুল আযিয বিন বাযসহ (র.) আরো অনেকে।

 

 

শাবানের মধ্যরাত কি সত্যি ভাগ্য-রজনী? উত্তর- না, এ রাত ভাগ্য-রজনী নয়। মূলত এ রাতকে ভাগ্য-রজনী বলার পেছনে কাজ করেছে আল কুরআনের সূরা আদ দুখানের ৩ ও ৪ আয়াত দু’টির ভুলব্যাখ্যা। এ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরে অধিকাংশ মুফাসসির রমাযানের শবে কদরকে বুঝিয়েছেন। ইবনে কাসীর ও আল্লামা শাওকানি (র.)ও এ মত প্রকাশ করেছেন। দলীল সূরা আলকদর, আয়াত ০১, সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫। তাই ভাগ্য-রজনী হচ্ছে শবে কদর যা রমাযানের শেষদশকের বেজোড় রাতগুলো।

 

শাবানের মধ্যরাত উদযাপন করা যাবে কি? এ ব্যাপারে তিনটি মত পাওয়া যায়। ১. এ রাতে মসজিদে গিয়ে জামাতে সলাত আদায় ও অন্যান্য ইবাদত জায়েয। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়িয়াহর মত এটি। তিনি কোন দলীল দেননি। ২. এ রাতে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করা জায়েয। ইমাম আওযায়ি, ইবনে তাইমিয়া ও ইবন রজব (র.) এ মত পোষণ করেন। তারা এ রাতের ফযিলতের হাদীস দলিল দেন। ৩. এ রাতে এ ধরনের ইবাদত সম্পূর্ণরূপে বিদআত।  তা ব্যক্তিগত হোক বা সামষ্টিক হোক। ইমাম আতা ইবনে আবি রাবাহ, ইবনে আবি মুলাইকা, মদীনার ফুকাহাগণ, ইমাম মালেকের ছাত্রসহ অনেক বিদ্বানের মত। তারা বলছেন, এ রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত করেছেন বলে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়নি। তার সাহাবী থেকেও কিছু বর্ণিত হয়নি। শায়খ আব্দুল আযিয বিন বায (র.) বলেন, এ রাতের ফযিলত বর্ণনায় কিছু দুর্বল হাদীস এসেছে যার উপর ভিত্তি করা বৈধ নয় আর এ রাতে সলাত আদায়ে বর্ণিত সব হাদীসই জাল। আলেমরা এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।

 

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।’ (সূরা আল মায়েদাহ, আয়াত ৩) রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে আমার দ্বীনে এমন কিছুর উদ্ভব ঘটাবে, যা এর মধ্যে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭) এ রাতে হাজারি সলাত নামে এক সলাতের প্রচলন দেখা যায়। প্রতি রাকাতে ১০বার করে সূরা ইখলাস পড়া হয়। এ সলাত সম্পর্কে আলেমদের মত হল, এটা বিদআত। কারণ এ ধরনের সলাত রাসূলুল্লাহ (সা.), খলিফারা ও সাহাবীরা কেউই পড়েননি। হাদীসের কিতাবেও এ সলাতের বর্ণনা আসেনি। এ রাতের পরদিন সিয়াম বা রোযা রাখা যাবে কি? উত্তর- সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি রোযা রাখতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৬৯, ১৯৭০, সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১১৫৬, ১১৬১) এ হিসেবে শাবান মাসে রোযা রাখলে সুন্নাহ হবে।

 

শাবানের শেষ দিন ছাড়া বাকি যেকোনো দিন রোযা রাখা জায়েয। শাবানের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোযা রাখতে পারেন। শুধু ১৫ তারিখ রোযা রাখা বিদআত হবে। কারণ শরীয়াতে এ দিনের সিয়ামের কোনো দলীল নেই। এ দিনে রোযার ব্যাপারে যে হাদীস দলীল দেয়া হয় তা সম্পর্কে আল্লামা বুছিরি বলেন, এ হাদীসের বর্ণনাকারীর মধ্যে ইবনে আবি সুবরাহ আছে যে হাদীস বানাতো। তাই এটি জাল। রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু রমাযানে পুরো মাস রোযা রেখেছেন। এরপরেই শাবানে বেশি রোযা রেখেছেন, পুরো মাসের অল্প কয়েকদিন ছাড়া।

 

আমরাও শাবানে বেশি বেশি রোযা রাখতে পারি। পরিশেষে শাবানের মধ্যরাত সম্পর্কে বলব, একদল হাদীসবিদ এর ফযিলত আছে বলে মনে করেন অন্যদিকে আরেকদল হাদীসবিদ এর ফযিলত অস্বীকার করেন।

 

লেখক: প্রভাষক ও গণমাধ্যম আলোচক
* যাবতীয় লেখা ও মন্তব্যের জন্য লেখক দায়ী
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

সর্বাধিক পঠিত