31 C
Dhaka
বুধবার, জুলাই ৬, ২০২২

দুর্নীতি কি শুধুই ক্লাবে?

বিশেষ সংবাদ

- Advertisement -

গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় ক্লাবগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলছে। ঢাকার বাইরে দু-একটি জেলায়ও অভিযান হয়েছে। এই অভিযান ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযানে আলোচনায় এসেছে মতিঝিলের ইয়ংমেনস ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্র, ওয়ান্ডারার্স ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাব, কলাবাগান ক্রীড়াচক্র, ধানমণ্ডি ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবের নাম। ক্লাবের দুর্নীতি ছাড়াও, অন্যান্য খাতের দুর্নীতি নিয়েও জনমনে উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন।

সর্বোচ্চ দুর্নীতির খাত

অর্থ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৭৪টি খাত চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর বাইরে যেসব খাতে দুর্নীতি হচ্ছে সেগুলো হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), আইন মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, পরিবেশ, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), বনবিভাগ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়, কারা হাসপাতাল, কারাগার, পাসপোর্ট অফিস, তিতাস গ্যাস, হাওরের জলমহাল, পল্লী বিদ্যুৎ, নদী, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক দফতর, সমাজসেবা অধিদফতর, সিবিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), সেটেলমেন্ট অফিস, ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।

টিআইবির ‘সেবাখাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ‘সেবাখাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’ শিরোনামে জরিপ করেছিলো টিআইবি। এই জরিপের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে দুর্নীতিগ্রস্ত শীর্ষ খাত হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। জরিপে অংশ নেওয়া  ৮৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ঘুষ না দিলে এই খাতে সেবা পাওয়া যায় না। জরিপে আরো বলা হয়, ২০১৭ সালে সার্বিকভাবে ৬৬.৫ শতাংশ মানুষ সেবাখাতগুলোতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৭২.৫ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায়, পাসপোর্ট অফিসে ৬৭.৩ শতাংশ এবং বিআরটিএ-তে ৬৫.৪ শতাংশ দুর্নীতি হয়েছে।

সর্বোচ্চ ঘুষ আদায়ের ক্ষেত্রে তিনটি শীর্ষ খাত হচ্ছে গ্যাস, বিচারিক সেবা ও বীমা খাত। ঘুষ দিয়েছেন ৬০.৭ শতাংশ মানুষ, যার পরিমাণ ২ হাজার ১শ ৬৬ কোটি টাকা।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাসপোর্ট খাতে দুর্নীতির শিকারে হয়েছেন ৬৭.৩ শতাংশ মানুষ। এ খাতে মোট ঘুষ দিয়েছেন ৫৯.৩ শতাংশ সেবাগ্রহীতা, যার পরিমাণ ৪৫১ কোটি টাকার বেশি। তবে জাতীয়ভাবে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের দিক থেকে সবার ওপরে ভূমি সেবা খাত। এ খাতে দুর্নীতি হয়েছে ২ হাজার ৫শ ১২ টাকার।  হয়রানি বা জটিলতা এড়াতে ঘুষ দিয়েছেন ৪৭.১ শতাংশ সেবাগ্রহীতা, নির্ধারিত ফি জানা না থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দিয়েছেন ৩৭ শতাংশ, নির্ধারিত সময়ে সেবা পেতে ২৩.৩ শতাংশ, আরও দ্রুত সময়ে সেবা পেতে ঘুষ দিয়েছেন ৪.৩ শতাংশ, অবৈধ সুবিধা বা সুযোগ প্রাপ্তির জন্য ঘুষ দিয়েছেন ২ শতাংশ সেবাগ্রহীতা।

পরিবহন খাতে দুর্নীতি

সারা দেশে পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের সংগঠন রয়েছে ৯৩২টি। এর মধ্যে ৬৮৬টিই অবৈধ। এসব অবৈধ সংগঠনের কারণেই চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে দৈনিক ১৫ থেকে ১৬ হাজার ও ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়।

বাংলাদেশে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে পুলিশ। এমন তথ্য দিয়েছেন বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রুস্তম আলী খান।

শেয়ার বাজারের ক্ষত

২০১০ সালে শেয়ারাবাজারে কেলেঙ্কারিতে ক্ষত তৈরি হয় দেশের অর্থনীতিতে। সে ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে বিনিয়োগকারিরা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক এ ক্ষতের পরিমাণ ২০১২ সালের অক্টোবর সময়ের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২২ শতাংশ বা ২৭ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ের মুদ্রা বিনিময় হারের (প্রতি ডলার ৮১ টাকা) হিসেবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকার বেশি।

ব্যাংক খাতের চিত্র

গত ১০ বছরে ব্যাংক খাত থেকে জালিয়াতি হয়েছে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ।

গত ১০ বছরে জনতা ব্যাংক থেকে অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপ মিলে ১১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে, বেসিক ব্যাংক থেকে চলে গেছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে আত্মসাৎ হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা, বিসমিল্লাহ গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে আরও ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে সাড়ে চার গুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতি রোধ করা গেলে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান গতিশীল হবে, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমবে, জনগণের স্বস্থি ফিরে আসবে।

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাইকে অবিলম্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়াটাও জরুরী বলে মনে করছেন অনেকে।

- Advertisement -
- Advertisement -

আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

সর্বাধিক পঠিত