বিজ্ঞাপন

বিদেশযাত্রার ফাঁদে মৃত্যু: দালালচক্রে নিভে গেল পরিবারের স্বপ্ন

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার গোপালপুর গ্রামের জুনায়েদ হাসান প্লাবন। ইতালির স্বপ্নে দেশের বাইরে পাড়ি জমিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। কিন্তু লিবিয়ার অন্ধকার বন্দিশালায়ই থেমে যায় সেই স্বপ্ন। ‘গেম ঘর’ নামে পরিচিত লিবিয়ায় অবস্থিত এই অন্ধকার বন্দিশালায় বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশ ছাড়ে প্লাবন। দালালরা বলেছিল ইতালি পাঠাবে। তবে দুবাই হয়ে প্লাবনকে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে শুরু হয় নির্মম অত্যাচার। লিবিয়ায় এক অজ্ঞাত জায়গায় আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয় তাকে। কেবল তাই নয়, প্লাবনকে করা নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দালাল চক্র একের পর এক কিস্তিতে টাকা আদায় করে নেয়।

এর আগে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর সময় টাকা যোগাড় করতে বাবা জমশেদ আলীকে সর্বস্ব বিক্রি করতে হয়েছিলো। পরে বোনের দেয়া টাকায় বিদেশ পাড়ি দেয় প্লাবন। এরপর ছেলেকে ভয়াবহ নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে ও মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে দালালেরা পরিবার থেকে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।

ছেলের করুন কান্না, মারধরের ভিডিও দেখে ভেঙ্গে পড়ে পরিবার। ছেলেকে মুক্ত করতে দালালদের দেয় ৪২ লাখ টাকা। প্লাবনের বড় বোন স্বপ্না খাতুন জানান, ”ভাইকে অন্ধকার ঘরে বদ্ধ করে রেখে মারধর করা হতো। সেই ভিডিও আমাদের পাঠিয়ে তারা হুমকি দিতো টাকা দেয়ার, নাহলে তারা আমার ভাইকে মেরে ফেলবে।”

তিনি আরও জানান, লিবিয়ায় যাবার পর ভাইকে সেই বদ্ধ অন্ধকার ঘর থেকে মুক্ত করতে ৪২ লাখ টাকা দেই আমরা। এরপরে কিছুদিন আগে সর্বশেষ ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দেই আমরা। এরপর হুট করেই একদিন সকালে খবর আসে আদরের ভাই প্লাবন আর বেঁচে নেই।

এই দালাল চক্রের মূল হোতা বেলগাছি গ্রামের জান্টু মালিথার ছেলে সাগর। সে লিবিয়ায় বসবাস করলেও পুরো দেশজুড়ে চালায় সিন্ডিকেট। গ্রামে গ্রামে আছে সিন্ডিকেটের সদস্য, যারা টাকা সংগ্রহ করে। দালাল সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য সাগরের চাচাতো ভাই একই গ্রামের ঠান্টু মালিথার ছেলে জোবায়ের আহমেদ জিম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া জিম করে স্থানীয়দের থেকে টাকা কালেকশনের কাজ।

প্লাবনের বোন জানান, এখানের সব টাকার লেনদেন জিম এর সাথেই করা হয়েছে। সে আমাদের বাড়ি এসে টাকা নিয়ে গেছে। আমিও ওর বাড়িতে গিয়ে টাকা দিয়ে এসেছি। মোট ৪২ লক্ষ টাকা আমরা জিমের হাতে দিয়েছি।

এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পুলিশদেরও টাকা খাইয়েছে এই দালাল চক্র, যেন নির্যাতিতদের হয়ে কেউ এগিয়ে না আসে। নির্যাতিতদের পরিবার বলছে— এই দালালদের বিরুদ্ধে থানায় জানানো হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। উল্টো প্রধান দালালের সহযোগী জিম দলবল নিয়ে নির্যাতিতদের বাড়ি এসে হুমকি দিয়ে যায়।

এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদুর রহমানের সাথে কথা বলতে গেলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজী হননি। দালালদের কাছ কতিপয় পুলিশ আর্থিক সুবিধা নিয়েছে এমন অভিযোগ জানালেও কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

সর্বস্ব দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর পর তার মৃত্যু সংবাদে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের আহাজারি। এখন পরিবারের দাবি ছেলের মরদেহ অন্তত তাদের কাছে ফেরানো হোক। আর সাগর-জিমসহ জড়িত সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।

পরিবারের অভিযোগ—সন্তান-সম্পত্তি সবই গেছে এখন অন্তত ছেলের মরদেহটা যেন ফিরে পায়। প্লাবনের মা আদুরি খাতুন বলেন, ছেলেটাকে অনেক মারধর করতো দালালরা। এখন ছেলেটার মরদেহ পাঠাক অন্তত।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন: বড় গরু নিয়ে দুশ্চিন্তায় চুয়াডাঙ্গার খামারিরা

দেখুন: নতুন বরের সাথে শ্বশুরবাড়ি চীনে যাবেন চুয়াডাঙ্গার ফারিয়া 

এস

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন