স্থগিত হওয়া এডহক কমিটি সমানতালে ক্ষতি করছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ের স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পত্তি ।
এডহক কমিটি বিধি বহির্ভূত হওয়ায় মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক স্থগিত করার পরেও তা অমান্য করে ওই কমিটি কর্তৃক বিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন । অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে এমপিও ভুক্ত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির দেখভাল করার যেন কোন কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ তো নেই উপরন্ত প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পত্তি তড়িঘড়ি হস্তান্তর করে পকেট ভারি করছেন এই অবৈধ এডহক কমিটি ।
সূত্র মতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধি-বিধান অমান্য করে প্রতিষ্ঠানটিতে গত ১৩-০৮-২০২৫ ইং তারিখে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড এর বিদ্যালয় পরিদর্শক কর্তৃক স্বাক্ষরিত ২/ এস/ ৯২/ ৩৬৯৮( ০৬) স্মারকে ইস্যুকৃত এডহক কমিটি গঠন করা হয়।
বিদ্যালয় এর দাতা সদস্য শীতু জামান ওই এডহক কমিটি বাতিল চেয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন যার নম্বর ১৬৪৬১/২০২৫। এর প্রেক্ষিতে গত ৩ নভেম্বর মহামান্য হাইকোর্ট উক্ত এডহক কমিটির উপর স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের সহায়তায় গত এক মাসেও অবৈধ এডহক কমিটি উক্ত আদেশের প্রতি তোয়াক্কা না করে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেই সাথে সমান তালে হস্তান্তর করছেন প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পত্তি।
প্রধান ফটক সংলগ্ন ফাঁকা জায়গাটিও বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে অভিভাবক ও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ তসরুপ করার উদ্দেশ্যে এখানে দুজন প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে আব্দুল গফুর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক হলেও ওই বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক আশরাফুল আলম একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে নিয়মিতভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দুজন প্রধান শিক্ষক একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী-অস্থায়ী সম্পত্তি হ য ব র ল করে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে অর্থ আত্মসাৎ করার পথ সুগম করা।
সম্প্রতি দাতা , অভিভাবক ও শিক্ষক, কর্মচারীবৃন্দ বিদ্যালয়টির নানা অনিয়মের বিষয় প্রমানাদি সহ দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির সকল অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য । এই অনিয়ম-দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছেন বিদ্যালয়টির একের ভিতর ১০ খ্যাত শিক্ষক আশরাফুল আলম,প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর এবং এডহক কমিটির সভাপতি মাহামুদার রহমান সোনা।
অভিযোগে বলা হয় বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর ইতিপূর্বে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির দায়ে বহিষ্কৃত এবং স্বেচ্ছায় চাকরি হতে অব্যাহতি নিয়েছেন।
তবে ঐ প্রধান শিক্ষক চাকরি হতে অব্যাহতি নেয়ার পর বিদ্যালয়ের এডহক কমিটিতে সভাপতি করবেন মর্মে জনৈক্য মাহামুদার রহমান সোনার নিকট থেকে মুচলেকা দিয়ে উৎকোচ হিসেবে ২০ লক্ষ টাকা গ্রহণ করেন। এবং পরবর্তীতে সেই চুক্তি মোতাবেক মাহামুদার রহমান সোনাকে এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মনোনীত করেন। এরপরে শুরু হয় তাদের রমরমা দুর্নীতির বাণিজ্য।
মাহামুদার রহমান সোনা এডহক কমিটিতে সভাপতি হবার পর টেন্ডার কোটেশন ছাড়া ভুয়া উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে প্রায় ১ কোটি টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। এছাড়াও
বিদ্যালয়ের শপিং কমপ্লেক্সে দ্বিতীয় তলা থেকে পঞ্চম তলা এবং বিদ্যালয়ের মাঠের প্রায় চার শতাংশ ফাঁকা জমিতে বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে গ্যারেজ ও গোডাউন নির্মাণ করে নিজ দখলে রেখেছেন এবং ভুয়া ডিড দলিল তৈরি করেছেন। যার কোন প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়নি।
এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির চারজন অতিরিক্ত কর্মচারীদের (আয়া, ঝাড়ুদার, পিয়ন, অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক) প্রত্যেকের বেতন ভাতা বাবদ নির্দিষ্ট অংকের টাকার চাইতে বেশি টাকা অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা আত্মসাৎ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আর এই সকল অপকর্মের মূলেই ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক আশরাফুল আলম। তিনি একাধারে (ধর্মীয় শিক্ষক, বিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক চলতি দায়িত্ব, আবাসিক মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, বদর আমিন, বিবাহ রেজিস্টার কাজী সহকারি, হোমিও ডাক্তার, মামলাবাজ, মসজিদের ইমাম,)
তিনি বিদ্যালয়ের শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার বরাদ্দের আংশিক ১৪ লাখ টাকা এবং একতলা মার্কেটের ছাদের উপর টিন শেড বরাদ্দ দিয়ে ২৮ লাখ টাকা গ্রহণ করে তা বিদ্যালয়ে তহবিলে জমা না করে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। এছাড়াও বিদ্যালয়ের শপিং কমপ্লেক্স এর দোকান বরাদ্দের আংশিক বকেয়া ৪৬ লক্ষ টাকার অনুকূলে সংরক্ষিত সমুদয় অর্থ বিদ্যালয়ে তহবিলে জমা না করে সরাসরি ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টির দেনার দায়ে টালমাটাল অবস্থা। এ অবস্থার মূলে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর, এডহক কমিটির সভাপতি মাহামুদার রহমান সোনা ও শিক্ষক আশরাফুল আলম।
তারা বিদ্যালয়ের উন্নয়ন করতে গিয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণগ্রস্থ করেছেন। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর পাওনাদার ৭০ লাখ টাকা ,সভাপতি মাহামুদার রহমান সোনা পাওনাদার ১ কোটি ৭০ লাখ এবং প্রকল্প অফিসার খ্যাত শিক্ষক আশরাফুল আলম পাওনাদার ৩৫ লাখ টাকা।
পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক এড হক কমিটির সিদ্ধান্তমতে বিদ্যালয়টি শালবনস্ত খেলার মাঠে স্থানান্তর করে বর্তমান স্থানে মার্কেট করে এই দেনা পাওনা পরিশোধ করা হবে। এডহক কামিটির এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বিলিন হয়ে যাবে মনে করেন অভিযোগকারীরা। ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে লেখাপড়া করার পরিবেশ নেই। শিক্ষক কর্মচারী সংখ্যা আর নিয়মিত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সমানে সমান ।কোনরকমে ধার করা ছাত্র-ছাত্রী দিয়ে অর্থাৎ ইউসেপ স্কুল থেকে শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে সরকারি বিধিমালা রক্ষা করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীরা বলেন বিদ্যালয়টিকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়ার জন্য যে পরিকল্পনা ছক তৈরি করা হচ্ছে তা কোনভাবেই কাম্য নয়। তারা এর সুষ্ঠু তদন্ত করে বিদ্যালয়টির রক্ষার দাবি জানান।
এদিকে এ বিষয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ও এডহক কমিটির সভাপতির নিকট জানতে চাওয়া হলে তার বলেন এসব অভিযোগকারীদের মনগড়া অভিযোগ বাস্তবের সাথে মিল নেই। তবে এডহক কমিটির স্থগিতাদেশ সম্পর্কে জানেন না বলে জানান । অপর দিকে অভিযোগকারীরা জানান প্রতিটি অভিযোগের বিপরীতে সকল প্রমাণাদি রয়েছে।
পড়ুন- ৮৬ মার্কা নির্বাচন এদেশে হতে দেয়া হবে না: নরসিংদীতে জামায়াত নেতা


