সময়ের বন্যা মাটি ও কৃষির জন্য আর্শিবাদ হলেও অসময়ে সেটা কৃষকের জন্য দূর্ভোগের কারন।নদী মাতৃক জেলা কুড়িগ্রামে সম্প্রতি বয়ে যাওয়া হঠাৎ সৃষ্ট বন্যা মানুষজনের মাঝে দূর্ভোগের কারন হিসাবে দেখা দিয়েছে।এ বন্যায় শুধু কৃষকের ফসল ডুবে যায় নি,ভেঙেছে বসতভিটা বিলীন হয়েছে শত ফসলি জমি ও স্থাপনা।জলবায়ুর প্রভাবে আকস্মিক এ দূর্যোগ মোকাবেলায় পূর্ব প্রস্তুুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেত বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
কুড়িগ্রাম গত ৪ অক্টোবর থেকে হঠাৎ নদ নদীগুলোতে পানি বাড়তে শুরু করে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়। টানা দুই দিন পানি বৃদ্ধির পর ৬ অক্টোবর থেকে পানি কমতে শুরু করে।পানি কমে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের দেখা দেয়।সেই ভাঙনে নদী গর্ভে বিলিন যায় ফসলি জমি ও বসতভিটা।তবে পানি পুরোপুরি নেমে গেলেও, সেই পানির ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার বন্যা ও আকস্মিক পানি বৃদ্ধির ফলে কুড়িগ্রামের প্রায় ১ হাজার ৭৮৭ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রোপা আমন ধান, সবজি এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসল। অনেক ক্ষেতেই পানিতে ডুবে পচে গেছে ধানগাছ, জমে থাকা পলির কারণে শুকিয়ে গেছে সবজি ক্ষেত।
অন্য দিকে গত ৪ অক্টোবর একরাতে সদর উপজেলার যাত্রাপুর বানিয়া পাড়া গ্রামের প্রায় ৪০ টি ঘরবাড়ি ও আবাদিজমি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়।ফলে নিঃস্ব হয়ে যায় অনেক পরিবার।স্থানীয়দের দাবী সরকারি -বেসরকারি ভাবে স্থায়ী নদী শাসনের ব্যবস্থা থাকলে এমন দূর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব হতো।
চর নুচনির কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, অসময়ে পানি আসার কারণে আমার চার বিঘা ধানের ক্ষেত একদম নষ্ট হয়ে গেছে। গাছগুলো পচে গেছে এখন আর ধান হওয়ার কোনো আশা নেই।
ধাউরারকুটির কৃষক রজ্জাক আলী ও আবুল কালাম বলেন, ভারতের দিক থেকে অসময়ে পানি ছেড়েছে। পানি বন্দী হয়ে গেছে আমাদের ধানক্ষেত। শুধু পানি না, সাথে কাঠের গুড়িও এসে ধানগাছ ভেঙে দিয়েছে। পুরো ফসলটাই নষ্ট।
কমলারকুটির কৃষক হাফিজুর মিয়া বলেন, আমার ছয় বিঘার মধ্যে চার বিঘা জমিতেই পলি জমে গেছে, সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি দুই বিঘা একটু ভালো আছে, কিন্তু ফলন ভালো হবে না। আমি ঋণ করে চাষ করেছিলাম এখন কী দিয়ে ঋণ শোধ করব?
বানিয়াপাড়া গ্রামের আসমা বেগম বলেন,হঠাৎ রাতে দুধকুমার নদে পানির তোড়ে নদী ভাঙন শুরু হয়।একদিকে নদী ভাঙন আরেকদিকে বন্যা।ফসল ও জমিজমার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।আমরা কখনও আশা করি নাই অসময়ে বন্যা হবে।ফসল হারাবো, বসতভিটা জমি হারাবো।আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো।
নাগেশ্বরীর দামালগ্রাম এলাকায় দুধকুমার নদীর পাড়ে একসাথে প্রায় দুই শত বিঘা জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, গত তিন দিনে নদীর তীব্র ভাঙনে কয়েক বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রাম সদর, রাজিবপুর, রৌমারী, ফুলবাড়ী, উলিপুর, রাজারহাট, ভুরুঙ্গামারী ও চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলেও।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) কৃষিবিদ তানভীর আহমেদ সরকার বলেন, আমাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ১ হাজার ৭৮৭ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে ছিল। এখন পানি নেমে গেছে। মাঠপর্যায়ে তদন্ত চলছে চূড়ান্তভাবে কতটুকু ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা শিগগিরই জানানো যাবে।
তিনি কৃষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে পলির আস্তরণে ফসল ঢেকে গেছে। এই অবস্থায় গাছের পচন রোধে আগে সাদা পানি (পরিষ্কার পানি) দিয়ে স্প্রে করে পলি ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর সার প্রয়োগ করলে কিছুটা ফলন উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান জানান,নদী ভাঙনের জরুরি অবস্থায় ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলানো হচ্ছে।স্থায়ীভাবে নদী শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনিতার কথা উল্লেখ করে বলেন,নদী শাসনে স্থায়ী সমাধান করলে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও স্থাপনাগুলো নদী ভাঙন থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতো।
পড়ুন : কুড়িগ্রামে বিজিবির অভিযানে প্রায় ৬৮ লক্ষ টাকা মূল্যের ভারতীয় মালামাল আটক


