স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ২,৪৯৬ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বুধবার (২১ জানুয়ারি) ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় অনুষ্ঠিত হলো ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ২৬তম সমাবর্তন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২,১৪০ জন স্নাতক ও ৩৫৬ জন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের। কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জনকারী পাঁচ স্নাতককে দেওয়া হয় আচার্য স্বর্ণপদক বা চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল। শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সমান কৃতিত্বের জন্য ‘অল-রাউন্ডার’ স্বর্ণপদক পান এক স্নাতক।
রাষ্ট্রপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে সনদ প্রদান করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী ড. শহিদুল আলম। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ।
আরো বক্তব্য রাখেন আইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান দিদার এ হোসেইন; এডুকেশন, সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড কালচারাল ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্টের (ইএসটিসিডিটি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাকারিয়া খান; উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম; উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. ড্যানিয়েল ডব্লিও লুন্ড এবং বিশ্ববিদ্যালযের ছয় অনুষদের ডিনরা। সমাবর্তন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইইউবির রেজিস্ট্রার আসিফ পারভেজ।
আইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রত্যেক স্নাতককে একটি করে ৫০০ টাকার ‘বুক ভাউচার’ উপহার দেওয়া হয়। এই ভাউচার দিয়ে দিয়ে স্নাতকরা অমর একুশে বইমেলায় ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এবং পাঠক সমাবেশের স্টল থেকে ৫০০ টাকার বই বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারবেন।
অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার বলেন, গণতন্ত্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায়বিচার বা উন্নতির সুযোগ পাওয়ার উপর এর প্রভাব রয়েছ। গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন মানুষ সচেতন থাকে, প্রশ্ন করে, আর প্রয়োজন হলে দাঁড়িয়ে কথা বলে। এই সচেতনতা গড়ে তোলার জায়গা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ পাওয়ার জায়গা নয়, এখানে মানুষ ভাবতে শেখে, কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করতে শেখে, ঠিক এবং ভুলের ফারাক বুঝতে এবং যাচাই করতে শেখে।
ড. শহীদুল আলম বলেন, আজ তোমরা ডিগ্রি পাবে। পার্থিব অর্থে সফলও হবে। তোমাদের বাবা–মা গর্ব করবেন – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গাজার সেই শিশুটির জন্য, অথবা যে পোশাকশ্রমিক ঘাম ঝরিয়ে সন্তানদের খাওয়ান, যে অভিবাসী শ্রমিক পরিবারকে একটু জমি কিনে দেওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দেন, যেই নারী আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকেও পরে হারিয়ে যান, যে রিকশাওয়ালা, যে টোকাই, যে ছাত্ররা আমাদের মুক্তির জন্য রক্ত দিয়েছে – তাদের জন্য যদি আমরা পৃথিবীটাকে আরেকটু ন্যায্য করে তুলতে না পারি, তাহলে জীবন খুব বেশি অর্থবহ হয় না। ডিগ্রি পাওয়ায় তোমাদের অভিনন্দন। এবার এগিয়ে যাওয়ার পালা, মানুষের জন্য কাজ করার পালা। এমন কিছু করো যেন তোমাদের পায়ের ছাপ মুছে না যায়।
অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, পৃথিবী খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের ভেতরেই আছে নতুন সম্ভাবনা। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই তোমাদের চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি হয়েছে, কল্পনার জগৎটা বড় হয়েছে, আর মানুষ হিসেবে তোমাদের ভিতটা গড়ে উঠেছে। এখানেই তোমরা শিখেছ দায়িত্ব কাকে বলে, প্রত্যাশা কাকে বলে। এখন সেই প্রত্যাশা রক্ষা করার দায়িত্ব তোমাদেরই। ভালো আর মন্দের পার্থক্য সবাই বুঝতে পারে, কিন্তু তোমরা যারা শিক্ষিত ও আলোকিত, এই বিচারটা আরও গভীরভাবে, আরও
দায়িত্ব নিয়ে করতে পারো।
দিদার এ হোসেইন বলেন, তোমরা যা কিছু শিখেছ, তার পেছনে তোমাদের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। আইইউবি পরিবারের প্রতিটি সদস্য তোমাদের বিকশিত হতে আন্তরিকভাবে সাহায্য করেছেন। আজ তোমরা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। শিক্ষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তোমাদের এই জায়গায় পৌঁছে দিতে।
অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এমন এক প্রজন্ম, যারা নতুন নতুন সমস্যার সমাধান খুঁজে নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য কিংবা অর্থনৈতিক অস্থিরতার মতো বড়ো চ্যালেঞ্জগুলো গতানুগতিক চিন্তায় সমাধান করা যাবে না। এজন্য চাই কৌতূহল, সৃজনশীলতা, বৈজ্ঞানিক মনোভাব এবং বিশ্বকে দেখার বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি। মতের পার্থক্য থাকবেই, কিন্তু সেই ভিন্নতার মধ্যেও আমাদের শিখতে হবে কীভাবে শান্তি ও সম্প্রীতির সাথে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া যায়।
এবারের সমাবর্তনে ভ্যালেডিক্টোরিয়ান নির্বাচিত হন চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেলজয়ী মার্কেটিং বিভাগের স্নাতক সাজিদ বিন মোহাম্মদ। আচার্য স্বর্ণপদকজয়ী অন্যরা হলেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের তাসনুভা মাহমুদ, পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের আসাদুল্লাহ্ ইবনে মাসুদ ও জাহরা আলম লিয়া, এবং ফার্মেসি বিভাগের নাজমুন নাহার। গ্লোবাল স্ট্যাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্স বিভাগের আহমদ তাওসিফ জামী অল-রাউন্ডার স্বর্ণপদক লাভ করেন।
স্নাতক পর্যায়ে অসাধারণ ফলাফলের জন্য পুরস্কৃত হন তাসফিয়া আক্তার তানজিল, সামি রশীদ, রাইয়ান আহমেদ, সিদরাতুল মুনতাহা অহনা, ইকরাম হোসেন মাহবুব এবং তাহমীদ রেজওয়ান সুস্ময়। স্নাতকোত্তার পর্যায়ে অসাধারণ ফলাফলের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয় মো. জুবায়ের আলম ইমন, ফারজানা ইসলাম, তাসমীম ফাহিমা আহমাদ, ইমরান জাহান দিগন্ত, ভিনসেন্ট দীপ গমেজ ও তামিম তালহা হৃদয়কে।
অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতির পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে সফল শিক্ষার্থীদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সম্মাননা পান শেখ সালওয়া সারারা ও রশনী পারভীন, সমাজসেবায় শাহরুখ বিন হান্নান, এবং খেলাধুলায় মো. টিপু সুলতান ও মাহা মোরশেদ।
অনুষ্ঠানে আইইউবির ট্রাস্টি, অভিভাবক, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিরাও উপস্থিত ছিলেন। মূল অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় সংগীত পরিবেশন করেন প্রিতম হাসান, বগা তালেব এবং আইইউবি মিউজিক ক্লাব। নৃত্য পরিবেশন করে আইইউবি ডান্স ক্লাব।
পড়ুন: সিলেটে বিএনপির জনসভা: নেতাকর্মীদের ঢলে লোকারণ্য মাঠ
দেখুন: যেকোনো মূল্যে গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণা ট্রাম্পের |
ইম/


