বৈশাখের আগমনী বার্তায় আখাউড়ার নয়াদিল পালপাড়ায় ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। কাদামাটির স্পর্শে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার মৃৎশিল্পীরা। রং-তুলির আঁচড়ে তৈরি হচ্ছে হাতি, ঘোড়া, পাখিসহ নানা ধরনের মাটির খেলনা। সামনে বৈশাখী মেলা—আর সেই মেলাকে ঘিরেই চলছে তাদের এই ব্যস্ততা।
উপজেলার নয়াদিল পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ করছেন মাটির খেলনা তৈরিতে। কেউ কাদামাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ নিপুণ হাতে খেলনার আকৃতি দিচ্ছেন, আবার কেউ রঙের ছোঁয়ায় সেগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলছেন। ছোট ছোট এসব খেলনায় ফুটে উঠছে গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও ঐতিহ্যের ছাপ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই গ্রামের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। একসময় সারা বছরই মাটির তৈজসপত্র ও খেলনার ভালো চাহিদা ছিল। তখন এই পেশায় যুক্ত পরিবারগুলোর জীবিকা নির্বাহ তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে।
মৃৎশিল্পী রাজু পাল বলেন, “আমাদের বাপ-দাদার সময় এই কাজের খুব কদর ছিল। এখন আগের মতো চাহিদা নেই। কাঁচামাল আর রং-তুলির দাম বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী বিক্রি বাড়েনি।” তিনি জানান, বর্তমানে মূলত বৈশাখী মেলা ও অন্যান্য উৎসবকে ঘিরেই কিছুটা বিক্রি হয়। বছরের অন্য সময় কাজ প্রায় বন্ধই থাকে।
প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে মাটির জিনিসের চাহিদা কমে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা। ফলে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। যারা এখনো আছেন, তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পৈতৃক পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
নয়াদিল গ্রামের বাসিন্দা মোরাদ হোসেন বলেন, “আগে এই গ্রামে অনেক পরিবার এই কাজ করত। এখন বেশিরভাগই ছেড়ে দিয়েছে। যারা আছে, তারাও কষ্টে টিকে আছে।” তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা একসময় পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
মোগড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মৃৎশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। “প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিলে নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আগ্রহী হবে,” বলেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন বাজার সম্প্রসারণ, সহজ ঋণ সুবিধা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। তা না হলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে গ্রামীণ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশ।
প্রতিবছর বৈশাখ এলেই নয়াদিল পালপাড়ায় নতুন করে কাজের গতি আসে। মাটির গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। তবু উৎসবের এই সাময়িক ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকে টিকে থাকার দীর্ঘ সংগ্রাম। প্রশ্ন থেকেই যায়—যথাযথ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই মাটির শিল্প কতদিন টিকে থাকবে।
পড়ুন:নববর্ষে মেট্রোরেল চলাচল নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
দেখুন:নববর্ষে মেট্রোরেল চলাচল নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
ইমি/


