ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বহু বছর ধরেই উত্তেজনা বিদ্যমান। এবার ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে অস্থায়ীভাবে ইরানকে সীমিত পরিমাণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া যাবে। তবে এই প্রস্তাব ঘিরে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিতর্ক ও শঙ্কা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা আবারও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত শনিবার ইরানকে একটি পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বলা হয়েছে ইরানকে সীমিত মাত্রায় ও নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম নিজ দেশে সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
এই প্রস্তাবটি এমন এক সময় এসেছে, যখন ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রায়-বোমা মানের ইউরেনিয়াম উৎপাদনে জোর দিয়েছে। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার মতে, ইরান চাইলে মাত্র কয়েক সপ্তাহেই ১০টিরও বেশি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করতে পারবে।
এর আগে সোমবার মিশরে বৈঠকের ফাঁকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, “আমরা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রকে একটি উপযুক্ত জবাব দেব। আমাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার স্বীকৃতি না দিলে কোনো চুক্তি হবে না।” তিনি আরো বলেছিলেন, “আমাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির অধিকার আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে স্বীকৃত। যদি এই অধিকারকে অস্বীকার করা হয়, কোনো চুক্তি সম্ভব নয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে—ইরান চুক্তির শুরুর দিকে সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে, তবে দেশীয় স্থাপনায় নয়। ভবিষ্যতে এই কাজ করা হবে একটি বহুজাতিক কনসোর্টিয়ামের অধীনে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতায় নির্মিত হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক কেন্দ্র।
এই কনসোর্টিয়ামের সম্ভাব্য স্থানের বিষয়ে আলোচনা চলছে ওমান এবং সৌদি আরবের দ্বীপগুলো নিয়ে। তবে ইরান চাইছে এটি তাদের নিজস্ব দ্বীপ কিশ বা কেশম এ হোক। যাতে বলা যায়, ‘মাটিতে না হলেও, দেশের ভূখণ্ডেই সমৃদ্ধিকরণ’ হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই প্রস্তাবে ইসরায়েলের আপত্তি রয়েছে। তারা বারবার বলে এসেছে— ইরানকে পারমাণবিক ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া মানেই মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি। তেল আবিবের মতে, এটি উপযুক্ত সময় ইরানের স্থাপনাগুলোতে সামরিক হামলার।
তবে ইরানের বাস্তবতা আরও জটিল। দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞায় দেশের অর্থনীতি সমস্যার মুখে পড়ে। তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক ব্যাংক লেনদেনসহ নানা খাতে অবরোধ থাকায় সাধারণ জনগণ দিশেহারা। ইরান চাইছে কেবল পারমাণবিক বিষয়ে নয়, সব নিষেধাজ্ঞা একসঙ্গে তুলে নেওয়া হোক।
এই প্রস্তাব তৈরি করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তবে প্রস্তাবটি এখনও অনেকটাই অস্পষ্ট। কোথায় হবে সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র? কোন নিষেধাজ্ঞা উঠবে? কতটুকু ইরান বিশ্বাস করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রকে?
সবচেয়ে বড় বিষয়—বিশ্বাসযোগ্যতা। অতীতে চুক্তি বাতিল, হুমকি-ধামকির ইতিহাসে ইরান এখন কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া এগোতে নারাজ। আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে— ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে দেওয়া হবে না, কোনোভাবেই না।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক সংস্থার ইরান বিষয়ক পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, “দুই পক্ষ এখনো মূল বিষয়ে একমত হতে পারেনি—ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে কি না। চূড়ান্ত চুক্তি এখনো অনেক দূরে। আপাতত শুধু একটি কাঠামো নির্ধারণের চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।”
এই মুহূর্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলছে কঠিন কূটনৈতিক দরকষাকষি। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। কনসোর্টিয়ামের ধারণা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভবপর হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক অস্থিরতা যে ঘনীভূত হচ্ছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
পড়ুন: ইরানের কাছে পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের
দেখুন: ইরান যেভাবে বিশ্বের সবচেয়ে অপ্রতিরোধ্য দেশ হয়ে উঠেছে
এস


