ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর নজিরবিহীন হামলায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। শনিবারের এই হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দপ্তর ও বাসভবনের নিকটবর্তী এলাকাগুলোকে।
এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে— কে এই ৮৬ বছর বয়সী নেতা এবং কেন তাকে শিরশ্ছেদ বা সরিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে পশ্চিমারা?
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে একযোগে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি নিশ্চিত করেছে যে, তেহরানের উত্তরে রাষ্ট্রপতি প্রাসাদের পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং খামেনেয়ির কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে অন্তত সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
এছাড়াও, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, রাজধানীতে খামেনেয়ির প্রধান কার্যালয়ের অতি নিকটবর্তী স্থানগুলোতেও সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে।
বর্তমানে সর্বোচ্চ নেতা খামেনেয়ির অবস্থান নিয়ে জনমনে ব্যাপক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হামলার সময় খামেনি তেহরানে ছিলেন না।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাকে নিরাপদ কোনো অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৮৬ বছর বয়সী এই ইসলামি পণ্ডিত ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির স্থলাভিষিক্ত হন।
খোমেনি ১৯৭৯ সালে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এসে এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তৎকালীন মার্কিন মিত্র শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। বর্তমানে খামেনেয়ি ইরানের বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং সরকারের সমস্ত শাখার ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ধারণ করার পাশাপাশি দেশটির আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘ শাসনামলে খামেনেয়ি পশ্চিমাদের সঙ্গে এক চরম বৈরী সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তার এই সময়ে ইরানকে তীব্র আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দেশের অভ্যন্তরে অর্থনীতি ও মানবাধিকার ইস্যুতে কয়েক দফা বড় ধরনের বিক্ষোভের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের এক নম্বর শত্রু হিসেবে অভিহিত করেন এবং ইসরায়েলকে তার ঠিক পরেই স্থান দেন।
খামেনেয়ির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার মূলে রয়েছে ইরানের দুটি প্রভাবশালী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অবিচল আনুগত্য—ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড এবং একটি আধাসামরিক বাহিনী, যাদের অধীনে লাখ লাখ স্বেচ্ছাসেবক কর্মরত।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে খামেনেয়ি দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছেন যে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। উল্লেখ্য যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা এখন পর্যন্ত ইরান কর্তৃক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায়নি। তবে ইসরায়েল এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বরাবরই এই দাবির বিরোধিতা করে আসছেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ির নেতৃত্ব নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর আগেও একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি ও সরাসরি হুমকির বার্তা দিয়েছেন।
গত বছর ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে কয়েকদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং ইসরায়েলের ওপর তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ঘটনা ঘটে।
সেসময় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, খামেনেয়ির আর ক্ষমতায় বা অস্তিত্বে থাকার কোনো অধিকার নেই। খামেনির মতো একজন স্বৈরশাসক, যিনি ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার উন্মত্ত লক্ষ্য লালন করেন, তার টিকে থাকা অসম্ভব।
প্রায় একই সময়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন যে, খামেনেয়িকে গুপ্তহত্যার বিষয়টি ইসরায়েলের পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, খামেনির অপসারণ হবে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

