ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থামাতে গিয়ে দেশটির শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে ইসরায়েল- এমনটাই দাবি করছে তেলআবিব। ফ্রান্সে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত জোশুয়া জারকার বরাতে বার্তাসংস্থা এপি জানিয়েছে, অন্তত ১৪ জন ইরানি বিজ্ঞানী ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন, যাদের অনেকেই পদার্থবিদ, প্রকৌশলী এবং রসায়নবিদ ছিলেন। এখন প্রশ্ন বুদ্ধিজীবীদের এই হত্যাকান্ড ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সাময়িকভাবে থামাতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে কি আদৌ তা কার্যকর কোনো সমাধান?
এর আগে ইসরায়েল দাবি করেছিলো, এই হামলায় ইরানের পরমাণবিক কর্মসূচী তিন থেকে পাঁচ বছর পিছিয়ে গিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইসরায়েলি হামলা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কয়েক মাস পিছিয়েছে মাত্র। একটি প্রাথমিক গোপন মার্কিন প্রতিবেদনে এমন কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তের হামলায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি মাত্র কয়েক মাসের জন্য পিছিয়েছে।
হামলার আগেই মার্কিন গোয়েন্দারা বলেছিলেন, ইরান দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করলেও তাতে অন্তত তিন মাস লাগবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর কয়েক দিনের হামলা শেষে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার ডিআইএ-এর ধারণা, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির অগ্রগতি শুধু ছয় মাসের কম সময়ই পিছিয়েছে।
ইসরায়েলের ভাষ্যমতে, নিহত বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্পে জড়িত ছিলেন। তাদের হত্যার উদ্দেশ্য শুধু কর্মসূচিকে পিছিয়ে দেওয়া নয়, বরং উত্তরসূরি তরুণ বিজ্ঞানীদের ভয় দেখিয়ে এই প্রকল্পে যোগদান নিরুৎসাহিত করা। রাষ্ট্রদূত জারকা বলেন, ‘যারা ভবিষ্যতে এই প্রকল্পে কাজ করতে চাইবে, তারা এখন দুবার ভাববে।’ তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে দ্বিমত।
বিশ্বের বিভিন্ন পারমাণবিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিজ্ঞানীদের হত্যাকাণ্ড কর্মসূচিকে কিছুটা বিলম্বিত করলেও এটি সম্পূর্ণরূপে থামিয়ে দিতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞ মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক বলেন, ‘ইরানের ব্লুপ্রিন্ট ও প্রযুক্তিগত নকশা এখনো রয়ে গেছে। ভবিষ্যতের পিএইচডি গবেষকরা তা বুঝে নিতে পারবে এবং আবার কাজ শুরু করতে পারবে।’ তিনি বলেন, ইরানের হাতে এখনো দ্বিতীয় সারির কিছু বিজ্ঞানী রয়েছে, যারা হয়তো শীর্ষ পর্যায়ের নয়, তবে সময় নিয়ে হলেও তারা একই কাজ করে ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি শুধু কিছু বিজ্ঞানীর ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে গড়ে ওঠা বিশাল মেশিন, যা কোনো একটি অংশ বাদ গেলেও নতুন অংশ দিয়ে আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত, যদি ইউরেনিয়ামের মতো মূল উপাদান হাতে থাকে, তাহলে পরমাণু অস্ত্র তৈরি তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়।
রাশিয়ান পারমাণবিক বিশ্লেষক পাভেল পডভিগ বলেন, ইরানের মূল সমস্যা এখন বিজ্ঞানীদের মৃত্যু নয়, বরং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস হয়েছে কিনা, সেটাই নির্ধারণ করবে কর্মসূচি কতদূর থেমেছে। তাঁর মতে, বিজ্ঞানীদের হত্যা শুধু ‘মানুষকে ভয় দেখানোর কৌশল’, যেটি অতি দুর্বল ও বিপজ্জনক কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
এই হত্যাকাণ্ডের নৈতিক ও আইনি দিক নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা নিষিদ্ধ, তবে যদি এই বিজ্ঞানীরা সামরিক প্রকল্পে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন, তাহলে আইনত তারা বৈধ লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন, এমন মত দিয়েছেন জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন আর. ডেভিড। তিনি বলেন, ‘যদি কেউ এমন একটি দুঃশাসনের জন্য কাজ করেন, যারা ইসরায়েলকে ধ্বংসের হুমকি দেয়, তাহলে তারা আর নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।’
এমোরি ল স্কুলের মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ লরি ব্ল্যাংক বলেন, এই হত্যাকাণ্ড বৈধ কি না, তা বলার আগে আরও তথ্য দরকার। ইসরায়েলের হাতে কী ধরনের গোয়েন্দা তথ্য ছিল, বিজ্ঞানীদের ভূমিকা কতটা সক্রিয় ছিল এসব না জানলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তবে এটিই প্রথম নয়। ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহকে হত্যার জন্যও ইসরায়েলকে দায়ী করেছিল তেহরান। এবার যদিও ইসরায়েল সরাসরি দায় স্বীকার করেছে এবং বলেছে, এমন ‘দুর্ঘটনাগুলো না ঘটলে’ ইরান বহু আগেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলত।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন পরমাণু বিজ্ঞানী মোহাম্মদ রেজা সিদিঘি সাবের, যিনি প্রথম হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও পরে মারা যান। তার কিশোর ছেলেও আগের হামলায় নিহত হয়।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখনো যে, এই হত্যাকাণ্ড কৌশলগতভাবে সফল হলেও, নৈতিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার দিক থেকে এটি কতটা গ্রহণযোগ্য? আর দীর্ঘমেয়াদে এই পথ কি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা নাকি আরও হিংসা ডেকে আনবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এনএ/


