ইরানে স্মরণকালের সবচেয়ে সহিংস বিক্ষোভে অন্তত দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য রয়েছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও ‘১০ হাজার জন’কে। ইরানের কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে, বিক্ষোভে নেতৃত্বদানকারী অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে যেসব দেশ বাণিজ্য করবে, তাদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও সাইবার হামলার কথাও বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
সরকারবিরোধী সহিংস আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারের সমর্থনে ব্যাপক মিছিল হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান অনলাইনে প্রকাশিত ছবিতে এসব মিছিলে লাখো মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। মিছিল শেষে রাজধানী তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে তারা সমবেত হন। সেখানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ইরান চার ফ্রন্টে যুদ্ধ করে চলেছে– অর্থনৈতিক যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ এবং বর্তমানে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
এ অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে বলেন তিনি। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখলেরও আহ্বান জানান। পোস্টে তিনি বলেন, ‘খুনি ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করুন। তাদের বড় মূল্য দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের নির্বোধ হত্যা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সাহায্য আসছে।’
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সাহায্য আসছে’ বলতে ট্রাম্প কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট সোমবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ‘বেশ কিছু বিকল্প’ বিবেচনা করছেন। তার মধ্যে বিমান হামলাও রয়েছে। তবে কূটনীতি ‘সর্বদা প্রথম বিকল্প’।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, এমন এক সময়ে এ বিক্ষোভ হচ্ছে, যখন নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপে আছে ইরান। দেশটির সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বার্তা সংস্থাটি জানায়, গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ-সহিংসতা শুরুর পর এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রথমবারের মতো ইরানের কর্মকর্তারা মৃতের এ সংখ্যা নিয়ে মুখ খুললেন। তারা হতাহতের জন্য বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ‘সন্ত্রাসী’দের দায়ী করেন। আলজাজিরা জানিয়েছে, বিক্ষোভ ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ গেছে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্যের।
পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘ অবরোধ-নিষেধাজ্ঞার কারণে চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যে ইরানে সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি চরম পৌঁছেছে। এ নিয়ে প্রথমে তেহরানের দোকানিরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনও এতে অংশ নেয়। এদের অধিকাংশই মুখোশ পরে বিক্ষোভ করেছে। বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী ও অন্য বিক্ষোভকারীদের হত্যার পেছনে এদের দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ।
শুরুতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে তা সরকারবিরোধী রূপ নেয়। শুরু হয় ব্যাপক সহিংসতা। বিক্ষোভকারীরা প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে ১১টা– এ সময়কে বেছে নেয়। বিভিন্ন ফুটেজে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। অনেক স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।
শুল্কে ক্ষতির মুখে পড়বে চীন, তুরস্ক ও ভারত
গত সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করলে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। গতকাল মঙ্গলবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শুল্ক নিয়ে তেহরান কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে তার মিত্র চীন এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। ইরানের অর্থনীতি জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। দেশটির শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে চীন, তুরস্ক, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের এ শুল্ক আরোপের ফলে এ দেশগুলোর অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরান থেকে কম মূল্যে এসব দেশ তেল কিনে আসছে।
কঠিন সময় পেরিয়ে গেছে সরকার– বলছেন বিশেষজ্ঞ
বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে রয়টার্স লিখেছে, ইরান বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় ঢেউগুলো পার করে ফেলেছে। এখন আন্দোলন অনেকটাই নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। তথাপি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্ৎস মনে করেন, ইরানে সরকার পতন হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের শাসনের শেষ দিনগুলো দেখতে পাচ্ছি। এ শাসন কার্যত শেষ হতে যাচ্ছে।’ কোন ভিত্তিতে তিনি এ মন্তব্য করলেন, এর ব্যাখ্যা দেননি।
জার্মান চ্যান্সেলরের এ মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বার্লিনের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, জার্মানিতে সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সরকারটাই চলছে, যারা অন্যদের প্রতি মানবাধিকারের ভাষণ দিচ্ছে। গাজা গণহত্যা নিয়ে বার্লিনের যে অবস্থান ছিল, তার পর তাদের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতাই অবশিষ্ট থাকেনি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলছে, বিক্ষোভ চলাকালে এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৭২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এ তথ্য যাচাই করতে পারেনি। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের বিরোধী দলগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের অনেক বেশি।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা
ট্রাম্পের হুমকির মধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের চ্যানেলগুলো উন্মুক্ত রেখেছে। গতকাল সরকারের মুখপাত্র মোহাজেরানি বলেন, ‘সংলাপ করাটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং আমরা অবশ্যই তা করব।’
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাম্পের জন্য খোলা অনেক বিকল্পের মধ্যে বিমান হামলা অন্যতম। তবে কূটনীতি সর্বদা তাঁর জন্য প্রথম বিকল্প।’
তিনি বলেন, ‘আপনি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রকাশ্যে যা শুনছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ব্যক্তিগতভাবে যেসব বার্তা পাচ্ছে, তার থেকে বেশ আলাদা। আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট সেই বার্তাগুলো শুনতে আগ্রহী।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত সোমবার আলজাজিরাকে বলেন, তেহরান ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত বিষয়গুলো অধ্যয়ন করছে, যদিও এগুলো মার্কিন হুমকির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও আমার মধ্যে যোগাযোগ বিক্ষোভের আগে ও পরে অব্যাহত ছিল; এখনও আছে।’ ইরান যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো পদক্ষেপ মোকাবিলায় প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। আরাগচি বলেন, ‘ওয়াশিংটন আগে যে সামরিক বিকল্প পরীক্ষা করেছে, তা যদি আবার করতে চায়, আমরা তার জন্য প্রস্তুত।’
বিবেচনায় সাইবার ও মনস্তাত্ত্বিক হামলা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ সোমবার জানায়, ইরানে যে কোনো সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে বিমান হামলা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এখনও পরিকল্পনায় রয়েছে। তবে পেন্টাগনের পরিকল্পনাকারীরা সাইবার অপারেশন ও মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণাও করছেন; যার উদ্দেশ্য ইরানের কমান্ড কাঠামো, যোগাযোগ ও রাষ্ট্র পরিচালিত গণমাধ্যমকে ব্যাহত করা। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সাইবার ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযান সামরিক পদক্ষেপের সঙ্গে একযোগেও ঘটতে পারে। এটাকে সামরিক পরিকল্পনাকারীরা সমন্বিত অভিযানও বলেন।
মৃত্যুদণ্ড হতে পারে বিক্ষোভে নেতৃত্বদানকারীদের
ইরানের বিক্ষোভে নেতৃত্বদানকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। তবে ঠিক কতজন এ দণ্ড পাবেন, তা জানা যায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাত দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিবিসি জানায়, এরফান সোলতানি নামের এক বিক্ষোভকারীর ফাঁসি আজ (বুধবার) কার্যকর হতে পারে। এ নিয়ে ‘চরম উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক।
মাস্কের স্টারলিংকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ইরানের
ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার মধ্যে ইরানের সরকারি বাহিনী তেহরানে স্টারলিংক ডিশ বাজেয়াপ্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিয়ান গ্রুপের ডিজিটাল অধিকার ও সুরক্ষা পরিচালক আমির রশিদি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘এটি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ।’ কিছু ইরানি বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ইলন মাস্কের স্টারলিংক পরিষেবা ব্যবহার করছিলেন।
গত কয়েক দিন বিক্ষোভ-সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় ইরানের সরকার। তবে গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন এলাকায় আংশিক চালু হয়েছে।
ইসরায়েল-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে লাইভ ব্লগে আলজাজিরা জানায়, ইরানের কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাহেদানে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত একটি ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’কে গ্রেপ্তার করেছে। গোষ্ঠীটি ইরানের পূর্ব সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্র ও বিস্ফোরক বহন করেছিল। তারা এগুলো হত্যা ও নাশকতায় ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল।
পড়ুন: ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ মীমাংসার সুযোগ ছিল, কিন্তু দমননীতি নেন শেখ হাসিনা
দেখুন: এবারের নির্বাচন ঋণখেলাপিদের সংসদের বাইরে পাঠানোর নির্বাচন: হাসনাত আবদুল্লাহ
ইম/


