33 C
Dhaka
০৪/০৩/২০২৬, ১৭:০৯ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: জয়ের পথে কে এগিয়ে?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে শুরু হয়েছে এক বিধ্বংসী সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাত অনুযায়ী ৫ম দিনের মত চলছে। সরাসরি ও পরোক্ষ হামলা, আঞ্চলিক মিত্রদের সম্পৃক্ততা এবং কৌশলগত স্থাপনায় আঘাত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন পূর্ণমাত্রার শক্তি-পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই যুদ্ধে বাস্তবিক অর্থে কার কৌশল কার্যকর হচ্ছে এবং জয়ের পথে কে এগিয়ে?

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন থেকেই জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ইরানে আক্রমণের পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ঘাটিগুলোতে হামলা করছে ইরান। এ যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দৌড়ে আসলে কেউ এগিয়ে নেই। কারণ আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চালানোর ক্ষমতা ইরানের যেমন আছে। তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলেরও সক্ষমতা আছে। তাহলে যুদ্ধে জিতবে কে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এমন এক যুদ্ধ যেখানে আসলে কেউ জিতবে না। হারবে পুরো বিশ্বই।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি ইরানের সামরিক সক্ষমতার তুলনা করা কেবল সংখ্যার বিচার নয়, বরং এটি দুই ভিন্ন ধরণের যুদ্ধকৌশলের লড়াই। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ২০২৬-এর সূচকে ১৪৫টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে অবস্থান করছে, আর ইরান ১৬তম স্থানে থেকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ হলো তাদের বিমানবাহিনী। ১৩ হাজারেরও বেশি বিমানের বিশাল বহর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের ১ হাজার ৭৯১টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং ১,০০০টির বেশি অ্যাটাক হেলিকপ্টার যেকোনো দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেঙে দিতে সক্ষম। বিশেষ করে তাদের এফ-৩৫ এবং বি-২১ এর মতো স্টিলথ প্রযুক্তি তাদের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

অন্যদিকে, ইরানের বিমান বাহিনী সংখ্যার বিচারে অনেক পিছিয়ে, মাত্র ৫৫১টি যুদ্ধবিমান। ইরানের অধিকাংশ যুদ্ধবিমানগুলো পুরনো প্রজন্মের। তবে এই ঘাটতি কাটাতে ইরান বিনিয়োগ করেছে তাদের ড্রোন বা ইউএভি প্রযুক্তিতে। ইরানের ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোনগুলো বর্তমানে আধুনিক যুদ্ধের এক আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত কম খরচে শত্রুপক্ষের দামি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পারে।

স্থলযুদ্ধের ক্ষেত্রে ইরান একটি শক্ত প্রতিপক্ষ। ইরানের কাছে প্রায় ১ হাজার ৯৯৬টি ট্যাংক এবং ৬৫ হাজারেরও বেশি সাঁজোয়া যান রয়েছে। তবে ইরানের আসল শক্তি হলো তাদের রকেট প্রজেক্টর বা এমএলআরএস। প্রায় ১ হাজার ৫৫০টি রকেট লঞ্চার নিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো অবস্থানে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করতে সক্ষম।

বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থল শক্তি মূলত গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ৪ হাজার ৬৫০টি আব্রামস ট্যাংক এবং ৩ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব। আধুনিক লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল বাহিনী অনেক বেশি গতিশীল।

নৌ-শক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১১টি বিশাল বিমানবাহী রণতরী এবং ৮৩টি ডেস্ট্রয়ার। এটি একটি ‘ব্লু ওয়াটার নেভি’, যা গভীর সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। ৬৬টি সাবমেরিন নিয়ে মার্কিন নৌবাহিনী পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে হামলা চালাতে সক্ষম।

ইরানের নৌ-সক্ষমতা মূলত ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাদের ১০৯টি যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সাবমেরিন এবং ছোট দ্রুতগামী গানবোটের সংখ্যা বেশি। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর মতো সংকীর্ণ জায়গায় এই ছোট বোটগুলো বিশাল মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। ইরান সরাসরি নৌ-যুদ্ধে না গিয়ে মাইন বা টর্পেডো ব্যবহারের মাধ্যমে সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করার কৌশল নিয়ে চলে।

যেকোনো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার প্রধান জ্বালানি হলো অর্থ। এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ব্যবধান অকল্পনীয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৮৩১ বিলিয়ন ডলার, যা ইরানের বাজেটের (৯ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে প্রায় ৯০ গুণ বেশি। বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ প্রযুক্তির যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। অন্যদিকে, ইরান বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও তাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে সামরিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করেছে, তবে সেগুলো আত্মরক্ষণাত্মমূলক।

ইরানের ভূ-প্রকৃতি পাহাড়ি এবং রুক্ষ, যা যেকোনো বিদেশি বাহিনীর জন্য স্থল অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। দেশটির প্রায় ৬ লক্ষ সক্রিয় সৈন্য এবং ১০ লক্ষেরও বেশি আধা-সামরিক বাহিনী (বাসিজ ও আইআরজিসি) নিজ দেশের মাটিতে জীবন দিয়ে লড়তে প্রস্তুত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রকে লড়তে হয় সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে, যা তাদের জন্য বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের বিবরণ অনুযায়ী, প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্রের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিরোধ্য। তবে ইরান তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, ড্রোন প্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এক কথায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি হয় ‘অপ্রতিরোধ্য তরবারি’, ইরান তবে একটি ‘দুর্ভেদ্য ঢাল’।

নিচে যুদ্ধের প্রধান পক্ষ ও তাদের অবস্থান তুলে ধরা হলো—

প্রধান আক্রমণকারী পক্ষ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। ইসরায়েল এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’ এবং যুক্তরাষ্ট্র একে বলছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা, দেশটির শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।

হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতার নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনও সীমিত। এদিকে, ইরানের মিত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালানোর পর ইসরায়েল লেবাননেও বিমান হামলা শুরু করেছে। ফলে সংঘাত লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

ইরানের পদক্ষেপসমূহ: ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি স্থলবাহিনী প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা জোরদার করেছে।

তবে হামাস ইরানের প্রতি সমর্থন জানালেও সরাসরি সামরিক হামলায় এখনো যুক্ত হয়নি। একইভাবে, হুথি আন্দোলন সংঘাতে সরাসরি অংশ নিয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সেসব দেশ, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না থাকলেও এসব দেশ ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন, ওমান, কাতার।

খবরে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো-এর শোধনাগার ও রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে। জর্ডান ও কুয়েত মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। কাতার ইরানের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থান

যুক্তরাজ্য সাইপ্রাসে থাকা তাদের ঘাঁটি মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। এর জেরে সাইপ্রাস-এ হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে লন্ডন জানিয়েছে, তারা সরাসরি ইরানে হামলায় অংশ নেবে না।

ফ্রান্স সাইপ্রাসে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। গ্রিস যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। জার্মানি ও স্পেন জানিয়েছে, তারা ইরানে হামলায় অংশ নেবে না; তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নিজেদের বাহিনীর নিরাপত্তা জোরদার করবে।

অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তারা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে জড়ায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য কার্যত এক বিস্তৃত যুদ্ধমঞ্চে পরিণত হয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাত ক্রমেই বহুপাক্ষিক রূপ নিচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন পক্ষের দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন—তবে স্পষ্ট যে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব হবে বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী।

পড়ুন: দায়িত্ব বাড়ল নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভীর

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন