বিজ্ঞাপন

ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনা সফল হয়নি, আবারও কী শুরু হচ্ছে ইরান যুদ্ধ?

ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনা নিরাশার মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে। ৪০ দিন যুদ্ধের পর আশা জাগিয়ে শুরু হওয়া এই আলোচনায় কোনো ধরনের সমঝোতা না হওয়ার জন্য এখন পরস্পরকে দুষছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।

শনিবার (১১ এপ্রিল) আলোচনা শুরুর পর ‘ইতিবাচক’ই বলা হচ্ছিল দুই পক্ষ থেকে। তবে রাত গড়িয়ে পাকিস্তানের রাজধানীতে যখন ভোর হলো, তখন ‘খারাপ খবর’ই দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসলামাবাদ ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি জানান, ২১ ঘণ্টার আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি।

পরিবেশটি কেমন হতাশার ছিল, তা বিবিসির পাকিস্তান সংবাদদাতা ক্যারি ডেভিসের জবানিতে স্পষ্ট হয়ে এসেছে।

ভ্যান্সের সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন ডেভিস। সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই তিনি দেখেন, হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের জন্য প্রস্তুত হওয়া দীর্ঘ গাড়িবহর। সেখানে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের নিজস্ব নিরাপত্তাদলও ছিল।

ক্যারি ডেভিস লিখেছেন, ‘আমরা আমেরিকার পতাকাশোভিত একটি গাড়িকে দ্রুত হোটেল ছাড়তে দেখেছি। ধারণা করছিলাম, দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও কোনো চুক্তি না হওয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।’

আলোচনার ফলাফল নিয়ে সেখানে হতাশার স্পষ্ট আবহ দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ফারাক থাকায় শান্তিচুক্তি হওয়া কঠিন। তবে দুই পক্ষ থেকেই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসায় অনেকের আশা ছিল, সবাই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সত্যিই আন্তরিক।’

‘ফলে এই হতাশা শুধু সম্মেলনকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে,’ লিখেছেন বিবিসির এই সাংবাদিক।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই শান্তি আলোচনার দিকে চোখ ছিল গোটা বিশ্বের। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধের কারণে ভুগতে হচ্ছে গোটা পৃথিবীর মানুষকে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলার পর এই যুদ্ধের সূত্রপাত। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করলে যুদ্ধ বিস্তৃত হয়। এর মধ্যে ইরানের পাশাপাশি লেবাননে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যায় ইসরায়েল।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্বের তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। কেননা বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের ২০ ভাগই এই সরু জলপথ দিয়ে হয়।

হরমুজ না খুললে ইরানের সভ্যতা বিলীন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু তার ২৪ ঘণ্টা না গড়াতেই গত মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন তিনি। তারপরই ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার তোড়জোড় শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে ইসলামাবাদে পৌঁছান দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাগের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে সঙ্গী করে।

ইরান যদি কোনো চুক্তিতে না আসে, তাহলে আবার হামলা হবে, ট্রাম্প আগেই এই হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন। এর ফলে বৈঠকে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় এই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে, এখন কী হবে? আবার কি যুদ্ধ শুরু হবে?

বিবিসির বিশ্ব সংবাদদাতা জো ইনউড তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ এই কথা দিয়েই শুরু করেছেন, মূল প্রশ্ন এখন—এরপর কী হবে?

আলোচনায় সমঝোতা যে কঠিন ছিল, তা মনে হচ্ছিল তাঁর। তাঁর ভাষায়, উভয় পক্ষই এই আলোচনায় এসেছে যুদ্ধে নিজেদেরকে বিজয়ী দাবি করে। তাই শুরু থেকেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন ছিল। শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, সেটি প্রায় অসম্ভবই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে যুদ্ধ আবার শুরু হবে, এমন ইঙ্গিত এখনো না পাওয়ার কথাই লিখেছেন জো ইনউড। তাঁর ভাষায়, ইরানের ওপর হামলা আবার শুরু হবে কি না, এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা নেই। তবে সম্ভাবনা যে বেড়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি বলেই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। যদিও ইরান সব সময়ই দাবি করেছে, তাদের এমন কোনো উচ্চাভিলাষ নেই।

অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে গেছে।

আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালি খোলার সম্ভাবনাও কমে গেল। উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রর দুটি যুদ্ধজাহাজ পৌঁছানো থেকে জো ইনউড ধারণা করছেন, ওয়াশিংটন হয়তো অন্য কোনো পথ খুঁজছে।

ইনউড লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সরাসরি বৈঠক ছিল ঐতিহাসিক। কিন্তু তা হয়তো কূটনীতির একটি ব্যর্থ উদাহরণ হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।

সিএনএনের তাৎক্ষণিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোনো চুক্তি না হওয়ায় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। তবে ট্রাম্প আবার যুদ্ধ শুরু করতে চাইবেন কি না, তা এখন স্পষ্ট নয়। কারণ, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ইসলামাবাদে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভ্যান্স পুনরায় যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরান চাইলে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ‘চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব’ গ্রহণ করতে পারে।

আবার মতপার্থক্য দূর করতে ভবিষ্যতে নতুন কোনো আলোচনার কথা ভ্যান্স বলেননি। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান আশা করছে, দুই পক্ষের আলোচনা চলবে।

আলোচনা শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক বিবৃতিতে বলেন, উভয় পক্ষের জন্যই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ধরে রাখা অত্যাবশ্যক।

আগামী দিনগুলোতেও দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে পাকিস্তান ভূমিকা রাখবে বলেও জানান তিনি।

আলোচনা যে আবার হবে না, তা সরাসরি উড়িয়ে দিচ্ছে না ইরানও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও গুরুত্বপূর্ণ দুই-তিনটি বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।

ইসমাইল বাগাইয়ের ভাষায়, ‘এ আলোচনা হয়েছে ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর, যেখানে চারদিকে শুধু অবিশ্বাস আর সন্দেহ। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম বৈঠকেই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা আমাদের ছিল না। আর তেমনটা কেউ আশাও করেনি।’

ভবিষ্যৎ আলোচনার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কখনো শেষ হওয়ার নয়। সেটা শান্তির সময় হোক, কিংবা যুদ্ধের সময়, সব সময়ের জন্যই।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : শুরু থেকেই আলোচনা বানচালের অজুহাত খুঁজছিল যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন