দ্রোহের প্রতীক, ন্যায় ও ইনসাফের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, আধিপত্যের বিরুদ্ধে সদা জাগ্রত নির্ভীক এক বিপ্লবীর নাম শরিফ ওসমান বিন হাদি। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, কবি ও সাহিত্যিক এবং চব্বিশের আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধা। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। মাথা উঁচু রেখে দাঁড়ানোর সাহস ও অকুতোভয় জীবনের জয়গান গেয়ে গেছেন তিনি। সাহসী, সত্যভাষী এই তরুণ নেতা রেখে গেছেন এক অসমাপ্ত গল্প।
প্রাথমিক জীবন
শহীদ ওসমান হাদি বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম ছিলেন। তিনি তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে, সেখান থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে চতুর্থ শ্রেণিতে ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন, পরে আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ওসমান হাদি ইংরেজি শেখার একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ছিলেন এবং সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকতা করছিলেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গঠিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ শরিফ ওসমান হাদির হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিলো সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং “ইনসাফভিত্তিক” একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন। ‘‘ইনকিলাব মঞ্চ’’ গঠনের পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষা, অপরাধীদের বিচার, আহত-নিহত ব্যক্তিদের স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি তুলেন হাদি। যা তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

১৪-১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে এই ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। বিচার চাই না ফাঁসি চাই বলে হাজার হাজার আয়নাঘর কায়েম করা হয়। রোজা ভাঙিয়ে আমার বোনকে ধর্ষণ করা হয়। বাংলাদেশে বেগম জিয়ার বিনা চিকিৎসায় হাত বাঁকা করে ফেলা হয়েছে। আল্লামা সাঈদীকে মেডিক্যালে চিকিৎসার নামে এখানে এনে হত্যা করা হয়। মোশতাককে জেলের মধ্যে হত্যা করা হয়। মাইকেল চাকমার জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সর্বশেষ হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে আমাদের ভাই-বোনদের কলিজা ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়। সেই টার্মকে বৈধতাই শুধু নয় অপরিহার্য জরুরত হিসেবে প্রমাণ করেছে এই শাহবাগ।
— ওসমান হাদিতিনি ২০২৫ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। এই আসনে তিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় ও “চা-সিঙ্গারা” আড্ডার আয়োজনের কথা জানান। এছাড়া তিনি জনগণের পরামর্শ অনুযায়ী তার নির্বাচনি ইশতাহার ঠিক করবেন বলে ঘোষণা দেন। তার এই ভিন্নধর্মী প্রচারণা নাগরিক সমাজে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ”- করাই ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তার লক্ষ্য ছিল।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে হওয়া আন্দোলনে হাদিকে অন্যতম তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ তার হাত ধরেই ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল- সব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন, যেখানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার হবে প্রধান মূল্যবোধ।
ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর হাদি জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, অপরাধীদের বিচার, আহত ও নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। এসব দাবিই তাকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ ব্যানারে গড়ে ওঠা দেশব্যাপী আন্দোলনে অন্যতম সক্রিয় সংগঠন হিসেবে অংশ নেয় হাদির ইনকিলাব মঞ্চ। এই আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দলটিকে দায়ী করে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানান হাদি। দাবি আদায় না হলে সচিবালয় ঘেরাওয়ের হুমকি দিয়েও আলোচনায় আসেন তিনি।
গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণাকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর পরিবারের ইচ্ছায় তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সবশেষ গত ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় ওসমান হাদিকে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।

একটি গুলিই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিলো… তবে থেমে যায়নি তার স্বপ্ন, থেমে যায়নি তার ভাষা। একজন মানুষকে হত্যা করা গেলেও তার আদর্শ, সাহস ও প্রতিবাদের উত্তরাধিকারকে হত্যা করা যায় না-এটাই প্রমাণ করে গেলেন তিনি। ন্যায়, ইনসাফ, দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে অটল থাকা এই নির্ভীক মানুষটি আজ নেই, কিন্তু তিনি থেকে যাবেন প্রতিটি মানুষের হৃদয় মাঝে, প্রতিটি প্রতিবাদী কণ্ঠে, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহসে। একজন কীর্তিমানের নেই।
পড়ুন: জাতীয় কবির সমাধি চত্বরে ওসমান হাদিকে দাফন
আর/


