মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান এমক্যাশ লিমিটেডে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগকারী আনার পরিকল্পনা স্থগিত করেছে ইসলামী ব্যাংক। প্রয়োজনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা পরিপালনসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
গতকাল রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খবর থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ইসলামী ব্যাংক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানি। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে তথ্য পেয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তা প্রকাশ করেছে স্টক এক্সচেঞ্জ।
ডিএসইতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বি১০০ হোল্ডিংস এলএলসিকে ইসলামী এমক্যাশের কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আগে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এই ৩৯৬তম সভা গত ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে সম্ভাব্য বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত ৯ মার্চ ডিএসই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আগের খবরে বলা হয়েছিল, গত ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় বি১০০ হোল্ডিংসকে এমক্যাশে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে নেওয়ার জন্য নীতিগত অনুমোদন দেয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পর্ষদের ৩৮৯তম সভায় বর্তমানে ব্যাংকের এমএফএস সেবা ‘এমক্যাশ’-কে একটি সহযোগী কোম্পানি হিসেবে গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংক। এমক্যাশ লিমিটেড নামে সহযোগী কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর অনুমোদিত মূলধন এক হাজার কোটি টাকা। প্রাথমিক পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ হয় ৫০ কোটি টাকা। সিদ্ধান্ত ছিল, ইসলামী ব্যাংক এমক্যাশ লিমিটেডের কমপক্ষে ৫১ শতাংশ শেয়ার ধারণ করবে। বাকি শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের এমএফএস নির্দেশনা অনুযায়ী কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ইসলামী ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকার বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। অথচ ওই কোম্পানি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। এটি সন্দেহজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বি১০০ হোল্ডিংস কোম্পানি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অন্য এক সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান জুবাইদুর রহমানের আগ্রহেই ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ কোম্পানিটিকে এমক্যাশের কৌশলগত বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে জানতে গতকাল রাতে জুবাইদুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজে কথা বলতে রাজি হননি। এ বিষয়ে জানতে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। ওমর ফারুককে ফোন করে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
বি১০০ হোল্ডিংস কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান
ইসলামী ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি বি১০০ হোল্ডিংস এলএলসি কোম্পানিটি এমক্যাশের ৪৮ দশমিক ৯৯৯ শতাংশ মালিকানা পেতে ২৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করবে। যুক্তরাষ্ট্রে খুবই ছোট আকারের কোম্পানিগুলোর নামের শেষে ‘এলএলসি’ যুক্ত হয়। এ ধরনের কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন সাধারণত ১০০ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধিত কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর। কোম্পানির নিবন্ধিত ঠিকানা নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের আবাসিক অঞ্চল সয়োসেট এলাকা, যার বাড়ি নম্বর ৩০ প্রিন্স ড্রাইভ। এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এটি বিনিয়োগভিত্তিক হোল্ডিং কোম্পানি। কোম্পানিটি চায়, বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় শিল্প ও সেবা খাতের ১০০টি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের বড় কোম্পানিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য থেকেই ‘বি১০০’ নামটি নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব মূলধন ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে এবং তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায়।
বিনিয়োগের জন্য প্রতিষ্ঠানটি কয়েকটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে। এর মধ্যে আছে আর্থিক সেবা ও ফিনটেক, রপ্তানিমুখী উৎপাদন শিল্প, ওষুধ শিল্প এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাত। এসব খাতে মূলধন বিনিয়োগের পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক কৌশলগত সহায়তাও দেওয়ার পরিকল্পনার কথা কোম্পানির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।
বি১০০ হোল্ডিংস কোম্পানিটির ওয়েবসাইট ঘেঁটে এর মালিকানা বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি। তবে নিউইয়র্কের যে বাসায় কোম্পানিটি নিবন্ধিত, তার মালিক হিসেবে আরমান চৌধুরী ও সালমা চৌধুরীর নাম রয়েছে। ধারণা করা হয়, আরমান চৌধুরীকে সামনে রেখে কেউ একজন বেনামে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে।
কে এই আরমান চৌধুরী
কোম্পানির ওয়েসবাইটে খুঁজে পাওয়া পেশাগত তথ্য অনুযায়ী আরমান চৌধুরী একজন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পেশাদার পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিপিএ)। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা এলাকায় আরমান চৌধুরী সিপিএ পিসি নামে তাঁর একটি অ্যাকাউন্টিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা মূলত কর ও হিসাব-সংক্রান্ত সেবা দিয়ে থাকে। তাঁর পেশাগত জীবনে সিটি গ্রুপ, মোর্গান স্টেন্ডলি, সানোফির মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বারুচ কলেজ থেকে তিনি হিসাববিজ্ঞান ও ফাইন্যান্সে পড়াশোনা করেছেন। কমিউনিটি পর্যায়ে তিনি নিউইয়র্কভিত্তিক একটি মসজিদ ও কমিউনিটি সংগঠনের নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত বলে জানা যায়।
পড়ুন:সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আইয়ুব মিয়ার পদত্যাগ
দেখুন:সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আইয়ুব মিয়ার পদত্যাগ
ইমি/


