২৩/০২/২০২৬, ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
20.4 C
Dhaka
২৩/০২/২০২৬, ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

এলডিসি নিয়ে দুইরকম চিঠি, মূল্যায়ন করবে জাতিসংঘ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন মূল্যায়ন করবে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। বাংলাদেশে নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বুধবার প্রথম কার্যদিবসেই জাতিসংঘের ওই কমিটির কাছে এলডিসি থেকে বের হওয়ার সময় তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করে। তবে এর আগে দেড় বছর দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার সিডিপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারিত তারিখে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে। 

বিজ্ঞাপন

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে সিডিপির বার্ষিক প্লেনারি সভা শুরু হবে আগামীকাল সোমবার। ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কমিটির সভা চলবে। সভার একটি সেশনে বাংলাদেশের আবেদন নিয়ে আলোচনা হবে। এই আলোচনা হবে এনহান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) নামে একটি ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে, যার প্রধান বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির সদস্য। কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে গতকাল শনিবার নিউইয়র্কের উদ্দেশে তাঁর ঢাকা ত্যাগ করার কথা।

জানতে চাইলে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, এনহান্সড মনিটরিং মেকানিজমের আওতায় দুটি বিষয়ে আলোচনা হবে। একটা হলো, যারা ইতোমধ্যে এলডিসি থেকে বের হয়েছে, তারা কতখানি সুস্থির আছে। এ ছাড়া যারা এলডিসি থেকে উত্তরণের পাইপলাইনে রয়েছে, তাদের বিষয়ে আলোচনা হবে। দ্বিতীয়টার অংশ হলো বাংলাদেশ, নেপাল এবং লাওস। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর জন্য যে চিঠিটি এসেছে, তা নিয়ে সেখানে আলোচনা হবে। তবে চিঠিটি এসেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের কাছ থেকে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৫’ একই সচিব পাঠিয়েছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ সঠিক পথেই আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত নভেম্বরে ওই রিপোর্ট পাঠানো হয়। ফলে এখানে একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। 

ড. দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত ছিল, বাংলাদেশ সময়মতো এলডিসি থেকে বের হবে। বর্তমান সরকার মন্ত্রী পরিষদে সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্তরণ পেছানোর আবেদন করেছে কিনা, জানা যায়নি। এগুলো বোঝার বিষয় আছে। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ‘ক্রাইসিস বাটন’ ক্লিক করেছে। এর মানে, সংকটে পড়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছাতে চায়। সংকটে পড়লে বাংলাদেশকে বলতে হবে, অভাবিত এবং নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত ঘটনা ঘটেছে কিনা। এর আগে সোলোমন আইল্যান্ডসের এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানো হয়েছিল। কারণ, সে দেশে সুনামি হয়েছিল। সরকার বদলের কারণে সামাজিক সংঘাত হয়েছিল। ওই দেশের সংকট প্রাকৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিদ্যমান ছিল। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংকটগুলো কেমন, তার একটা মূল্যায়ন করা হবে। 

সিডিপির এই বৈঠকে বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর কোনো সিদ্ধান্ত আসবে কিনা জানতে চাইলে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত এখনই আসবে না। বাংলাদেশের আবেদন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তার একটি পদ্ধতি নির্ধারণ হবে। এর জন্য সরকারের আগের কৌশলপত্র, সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। সাম্প্রতিকতম তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে  সরকারের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হবে। 

তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে নভেম্বর মাসে যে বিবৃতি বা রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে এখন হঠাৎ পরিবর্তন কেন হলো এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কী বলে– এসব বিষয় আলোচনায় আসবে। নেপাল এবং লাওস এখন পর্যন্ত কোনো অনুরোধ জানায়নি। তাদের বিষয়ে মূল্যায়নের পদ্ধতি ওই বৈঠকে ঠিক করা হবে। এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের জাতিসংঘের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস ওএইচআরএলএসের প্রতিনিধিরা গত নভেম্বরে বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার পর যে  রিপোর্ট দিয়েছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হবে। 

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বুধবার সিডিপি চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে চিঠি পাঠান ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। এতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি থেকে উত্তরণ-প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি। 

এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের জানান, নতুন সরকার স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। ইআরডির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে উত্তরণ পেছানোর কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। ওই দিনই সিডিপি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন ইআরডি সচিব।

চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সূচকগুলো হচ্ছে– মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০২১ সালে দেওয়া সিডিপির সুপারিশ অনুসারে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা। তবে অতিমারি করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পেছানো হয়। 

ব্যবসায়ী মহল অনেক দিন ধরেই এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও অন্তত তিন বছর বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। গত বছরের আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ, এফবিসিসিআইসহ ১৬টি সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০৩২ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এলডিসির জন্য থাকা সুবিধা উঠে গেলে রপ্তানি খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্প চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের সিডিপিতে সময় বাড়ানোর কোনো আবেদন করেনি।

সিডিপি চেয়ারম্যানের কাছে ইআরডি সচিবের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির স্বীকৃতি এবং কভিড-১৯ অতিমারির নজিরবিহীন প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য মোট পাঁচ বছর সময় দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তবে এই সময়ের মধ্যে একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উত্তরণের প্রস্তুতি চলাকালে বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল।

চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছে। কিন্তু বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় প্রস্তুতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও  অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়ার কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে বিগত সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়ম ও গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকা ও এ জন্য জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেওয়ার কথাও বলা হয় চিঠিতে।

কান্ট্রি রিপোর্টে যা ছিল
গত ১০ নভেম্বর জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটিতে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে  ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৫’ পাঠায় ইআরডি। ওই রিপোর্টে বলা হয়, কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে সঠিক অবস্থায় রয়েছে। 

এতে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যতিক্রম। সহিংস ঘটনা বা গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন হয়েছে এমন বিভিন্ন দেশে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির যে অবস্থা কিছুদিন ছিল, তা থেকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

পড়ুন:ফার্নেস অয়েলের দাম লিটারে ১৬ টাকা কমলো

দেখুন:বানিয়ে ফেললো ইরান, শুধু ঘোষণার অপেক্ষা!

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন