নতুন বছরের প্রথম দেড় মাসে এশিয়ার তিনটি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এর মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দেশ জাপানও আছে। দুটি দেশে সংস্কারবাদী দলগুলোর বিপরীতে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছে জাতীয়তাবাদী ও ‘রক্ষণশীলরা’। নির্বাচনের আগে তারা যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা ও চীনবিরোধী নীতির ওপর জোর দিয়েছিল।
গত রোববার একইদিনে নির্বাচন হয় জাপান ও থাইল্যান্ডে। সোমবার প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে জাপানে এগিয়ে আছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। দলের নামের সঙ্গে ‘লিবারেল’ বা উদারপন্থী থাকলেও এর প্রেসিডেন্ট সানায়ে তাকাইচি অনেকের কাছে ‘রক্ষণশীল’ হিসেবে পরিচিত। অপরদিকে থাইল্যান্ডে বিজয়ী দল ভুমজাইথাই পার্টি পরিচিতি জাতীয়তাবাদী ও রাজতন্ত্রপন্থী হিসেবে।
বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী মিয়ানমারেও ‘একতরফা’ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছে সামরিক জান্তা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, বিদ্রোহী কিছু গোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখতে এ নির্বাচনের আগে জান্তাকে সহযোগিতা করে চীন। অপরদিকে বিরল খনিজের স্বার্থে দেশটির সঙ্গে পুনরায় বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত।
জাপান: চীনবিরোধী, যুক্তরাষ্ট্রপন্থী
সংস্কৃতিভেদে রক্ষণশীলতার লক্ষণগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়। এলডিপির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাতে ‘রক্ষণশীলতার’ একটি উদাহরণ দিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের রক্ষণশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় আলাদা। সামাজিকভাবে, সানায়ে তাকাইচি সমলিঙ্গ বিবাহের বিরোধী। তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনার পক্ষে। অপরদিকে দেশটির এক-পদবি ব্যবস্থারও সমর্থক। এই ব্যবস্থার কারণে জাপানি নারীদের স্বামীর পদবি গ্রহণ করতে হয়।
গত বছরের শেষ দিকে এলডিপি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে শিনজো আবে দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রধানমন্ত্রী হন তাকাইচি। এর কয়েকদিনের মাথায় জাপান সফর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সময় তাঁকে পরবর্তী নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরল খনিজ নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেন তাকাইচি। ট্রাম্পও জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। যা দুই নেতার ঘনিষ্ঠতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ট্রাম্পের ওই সফরের মাসখানিকের মাথায় তাইওয়ান নিয়ে তাকাইচিও তাঁর কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেন। নভেম্বর মাসে তিনি পার্লামেন্টের ভাষণে বলেন, তাদের ভূখণ্ড থেকে মাত্র ৯৭ কিলোমিটার দূরের তাইওয়ানে চীনের যেকোনো আক্রমণ সহ্য করা হবে না। হামলা হলে টোকিও সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। পরের মাসেই যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। এখানে উল্লেখ্য, তাইওয়ানকে নিজেদের অঞ্চল মনে করে চীন। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির আত্মরক্ষার নীতির বড় সমর্থক।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলছে, নির্বাচনের প্রায় সপ্তাহখানেক আগে তাকাইচি অভিবাসন এবং চীনের বিষয়ে আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাপানের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সংবিধান পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। স্কাই নিউজ বলছে, এসব বিষয়ই এলডিপির জনসমর্থনে ভূমিকা রেখেছে। কিছুদিন আগেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো দলটি আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করেছে। স্কাই নিউজের মতে, এই ফলাফল শুধু জাপানের পরিবর্তিত জনমতের (ডানপন্থার দিকে উল্লেখযোগ্য ঝোঁক) কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানে ঐতিহাসিকভাবে এলডিপির আধিপত্য থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির ভারে দলটি নুয়ে পড়ে। অনেক পুরনো সমর্থক এলডিপিকে অতিরিক্ত সেকেলে এবং মধ্যপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেন। এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে তাকাইচির সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক প্রচারের কৌশলও কাজে দিয়েছে। তিনি অল্প কথায় ‘এজেন্ডা’ তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের ভিডিও শেয়ার করেন। তাঁর এই ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও ভোটারদের প্রভাবিত করতে কাজে লেগেছে।
থাইল্যান্ড: সংঘাতের পর জাতীয়তাবাদ
ফরেন রিলেশনস বলছে, থাইল্যান্ডে ‘রক্ষণশীল’ ভুমজাইথাই পার্টি বিভিন্ন জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণ করেছে। ওই জরিপগুলোতে প্রগতিশীল বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ এগিয়ে ছিল। এ দলটি তরুণ ভোটারদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিপরীতে ভুমজাইথাই পার্টি জাতীয়তাবাদ ও রাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়।
গত বছর কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে সংঘাতের পর দলটির জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় বাড়ে। সংঘাতের সময় সীমান্ত এলাকার কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এমন অবস্থায় ভুমজাইথাই-এর নেতা অনুতিন চার্নভিরাকুল ‘নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতি’ এবং সামরিক শক্তির প্রচার চালান। দ্য নিইউয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, অনুতিন সীমান্ত এলাকায় দেয়াল তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন। একটি স্বেচ্ছাসেবী সামরিক কর্মসূচি গ্রহণের অঙ্গীকার করেন। ঘোষণা দেন, কম্বোডিয়া যদি একটি রকেট পাঠায়, বিপরীতে ব্যাংকক ১০০টি রকেট দিয়ে হামলা করবে।
জাতীয়তাবাদের এই জোয়ারের প্রভাব দেখা গেছে নির্বাচনের ফলাফলেও। প্রাথমিকভাবে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৫০০ আসনের মধ্যে ভুমজাইথাই এককভাবে জিতেছে ১৯৪টিতে। বিপরীতে প্রগতিশীল ‘পিপলস পার্টি’ পেয়েছে ১১৬টি।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ‘আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের’ সহযোগী ফেলো তিতা সাঙ্গলির মতে, এই ফলাফল ভবিষ্যতে সংঘাতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অপরদিকে থাইল্যান্ডের মিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিতিশীল পররাষ্ট্র নীতিরও প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এটি দেখাচ্ছে, মানুষ এখন সংস্কারের অগ্রাধিকার থেকে সরে গিয়ে স্থিতিশীলতার দিকে ঝুঁকছে।
অস্থির মিয়ানমার কোন দিকে যাবে?
একসময় বিরোধী পক্ষগুলোকে সমর্থন দিলেও নির্বাচনের আগে চীন সামরিক সরকার ও তাদের নির্বাচনে পূর্ণ সমর্থন দেয়। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এএফপি তাদের এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষকের বরাত দিয়ে লিখে, এর পেছনে মিয়ানমারে চীনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা- এমনকি দেশটির নেতৃত্ব পুনর্গঠনে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যও থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক মর্গান মাইকেলস বলেন, নির্বাচনের আগে বিদ্রোহীরা মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তখনই বেইজিং ‘ব্রেক কষে’ পরিস্থিতি থামায়। বেইজিংয়ের নীতি হলো রাষ্ট্র ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না। তাদের যখন মনে হলো- মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ভেঙে পড়তে পারে, তখনই তারা বিদ্রোহীদের ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করে।
এএফপিকে মর্গান মাইকেলস বলেন, চীন সামরিক সরকারকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ আছে। কারণ মিন অংয়ের নেতৃত্বে মিয়ানমার দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পড়েছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে মিন অংকে সরিয়ে দেওয়া বা তাঁর ক্ষমতা খর্ব করার মতো কিছু ঘটতে পারে।
এই নির্বাচনে ছিল না দেশটির প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দল। বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও নির্বাচনটিকে ‘প্রহসন’ বলে উল্লেখ করে। বর্জন করেন অনেক ভোটার। কিন্তু মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশনের ফলাফলে দেখা গেছে, সামরিক বাহিনী সমর্থিত ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)’ ভূমিধস জয় পেয়েছে। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পেয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন। এমন নির্বাচনের পর দেশটির চলমান অস্থিরতা কোন দিকে যায় সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পড়ুন:তারেক রহমানকে সমর্থন জানিয়ে ৪ স্বতন্ত্র প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা
দেখুন:মুখ ফিরিয়েছে বাংলাদেশ, অথৈ সাগরে ভারতের পেঁয়াজ ব্যবসা |
ইম/


