বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিবছর দেশি-বিদেশি লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে এই সৈকত। পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই এ অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে দৈনিক সকালের কক্সবাজার” পত্রিকায় প্রকাশিত “পর্যটক সেবার সরঞ্জাম ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য” শীর্ষক সংবাদটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ট্যুরিস্ট পুলিশকে হয়রানী করার চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়ন্ত্রিত দোকান স্থাপনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে টুরিস্ট পুলিশের চলমান উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে টুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে অবকাঠামো ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ আনা হয়। তবে এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন, মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়ন।
টুরিস্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পর্যটন নিরাপত্তা জোরদার, বিচ এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ দখলমুক্ত করতে ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিশেষ করে বিচের নির্দিষ্ট পয়েন্টে গড়ে ওঠা অনুমতিহীন দোকান, স্থাপনা ও অস্থায়ী কাঠামোর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।

সাম্প্রতিক এক অভিযানে সৈকতের বিভিন্ন অংশে অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানের সময় কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। টুরিস্ট পুলিশ দাবি করে, এসব ব্যক্তির মধ্যে কেউ কেউ বিচ দখল সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এদিকে দৈনিক সকালের কক্সবাজারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে টুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলে তা ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়। টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পক্ষ থেকে পাঠানো লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল, তথ্যপ্রমাণ বা অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়।
রিজিয়ন প্রধানের ভাষ্য, চলমান উচ্ছেদ অভিযানে একটি প্রভাবশালী চক্র ক্ষুব্ধ হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করিয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে যে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমরা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জ করছি প্রমাণ থাকলে প্রকাশ করুন, আমরা তদন্তে সহযোগিতা করব।
সৈকতসংলগ্ন কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বিচের বিভিন্ন অংশে অবৈধ দোকান বসিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল। এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, “অবৈধ দোকান ও চাঁদাবাজির কারণে পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছিল। এতে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
কক্সবাজারের বিখ্যাত সৈকত এলাকায় কিছু কথিত সাংবাদিক ও স্থানীয় ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে অবৈধ দখল তৈরি হওয়ায় পর্যটকের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ ইতিমধ্যেই বিষয়টি নজরে নিয়ে অভিযান শুরু করলে চলে আসে কথিত সাংবাদিকদের তদবির। উভয় সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যটকদের নিরাপদ অবকাশ নিশ্চিত করা এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণে তারা কঠোর অবস্থানে আছেন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, অবৈধ দোকান, হোটেল ও চায়ের দখল নিয়ে ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে অভিযান চালানো হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশ স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সমন্বয় রেখে আইন মেনে দখলমুক্ত এলাকাগুলো উদ্ধার করবে।
পর্যটকরা আশা প্রকাশ করেছেন, এই পদক্ষেপের ফলে সৈকতগুলো পুনরায় সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশে পরিণত হবে। আইনগত জটিলতা এড়াতে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে, সমস্ত অভিযান সংবিধান ও স্থানীয় আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, যানবাহন ও আবাসিক সুবিধার ক্ষেত্রে কোনও বাধা সৃষ্টি হবে না। আগামী কয়েক সপ্তাহে অবৈধ দখল প্রতিরোধ ও পর্যটক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমন্বিতভাবে চলমান অভিযান কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটকবান্ধব একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হবে।
এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “সৈকত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা। কিন্তু কিছু লোক প্রভাব খাটিয়ে জায়গা দখল করেছিল। টুরিস্ট পুলিশের অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে কয়েকজনের মতে, অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া জরুরি। তারা বলেন, প্রশাসনের কার্যক্রম যেমন স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন, তেমনি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা থাকতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা তার দায়িত্ব পালনকালে বাধাপ্রাপ্ত হলে তা বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। দণ্ডবিধির ১৮৬ ধারায় সরকারি কর্মচারীকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ৩৫৩ ধারায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দিলে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে। অন্যদিকে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রমাণসহ প্রকাশ ও তদন্তের দাবি তোলা আইনি অধিকার। তবে প্রমাণবিহীন অভিযোগ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে।
কক্সবাজার দেশের পর্যটন খাতের প্রাণকেন্দ্র। এখানে আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা অপপ্রচার দেশের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে পর্যটকদের আস্থা কমে যায়, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। টুরিস্ট পুলিশ বলছে, তারা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধে কাজ করছে। আইন সবার জন্য সমান সে সাংবাদিক হোক বা সরকারি কর্মকর্তা এমনটাই দাবি তাদের।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্যই সামনে এসেছে। টুরিস্ট পুলিশ অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ চেয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কারণ একদিকে রয়েছে পর্যটন নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার বিষয়। কক্সবাজারের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় যে কোনো অভিযোগ বা পদক্ষেপই বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। তাই দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই হতে পারে এই বিতর্কের একমাত্র সমাধান।
সাম্প্রতিক সময়ে বিজ এলাকায় পরিচালিত অভিযানে কয়েকটি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র সৈকতের অংশবিশেষ দখল করে দোকান বসিয়ে মাসোহারা আদায় করছিল। অভিযোগ রয়েছে, ওই চক্রের সঙ্গে কথিত কিছু সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি সম্পৃক্ত। অভিযানের সময় অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দিলে তারা টুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার চালাতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু স্থানীয় প্ল্যাটফর্মে পুলিশের বিরুদ্ধে অনৈতিক আর্থিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হলেও তার পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি বলে দাবি পুলিশের। টুরিস্ট পুলিশ জানায়, উপরমহলের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যটকদের নিরাপত্তা ও বিচের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, আইন সবার জন্য সমান—সাংবাদিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীও জানিয়েছেন, অবৈধ দোকান ও মাসোহারা বাণিজ্যের কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। অভিযানের ফলে সৈকতের পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে তাদের দাবি। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। টুরিস্ট পুলিশ বলছে, যে কোনো অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তা উপস্থাপন করা হবে অন্যথায় অপপ্রচার বন্ধ করে পর্যটন নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। এ বিষয়ে দৈনিক সকালের কক্সবাজার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাদেরকে পাওয়া যায়নি।
পড়ুন : ঈদের আগেই পটুয়াখালী ঢাকা নৌরুটের নাব্য সংকটের সমাধান করা হবে : আলতাফ হোসেন চৌধুরী


