25.3 C
Dhaka
০৫/০৩/২০২৬, ২১:০২ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন সম্পর্কে যা জানা গেল

২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি সুরক্ষিত কারাগারে এপস্টেইন মারা যান। ওই সময় তিনি জামিনের সুযোগ ছাড়াই যৌন পাচারের মামলায় কারাগারে বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন।

এর এক দশকেরও বেশি সময় আগে অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাভোগ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যৌন অপরাধী হিসেবে তাকে নথিভুক্ত করে।

দ্বিতীয় দফায়, তার বিরুদ্ধে যৌনতার জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ থেকে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন।

২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় কক্ষ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ‘‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’’ অনুমোদন করে। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইনে স্বাক্ষর করেন এবং দেশটির বিচার বিভাগকে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে এপস্টেইন-সংক্রান্ত সব তদন্ত নথি প্রকাশের নির্দেশ দেন।

বিজ্ঞাপন


নির্ধারিত দিনে কিছু নথি প্রকাশিত হলেও আড়ালে থেকে যায় বেশিরভাগই। পরবর্তীতে আরও নথি প্রকাশ করা হয়। তবে পুরো নথি প্রকাশ করা শেষ হয়েছে কি না, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ডেপুটি-অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি নথিকে ‌‌‌‘‘অত্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে নথি শনাক্ত ও পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার সমাপ্তি’’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে দেশটির বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবিরসহ অন্যান্যরা দাবি করছেন, যথাযথ কারণ ছাড়াই অনেক নথি গোপন রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নথিগুলো এপস্টেইনের বিলাসী জীবন ও সমাজের উঁচু স্তরের পরিচিত মহলের নানা দিক উন্মোচন করেছে।

নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহরের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেও এসব বিষয় পড়েছিলেন; যদিও স্নাতক ডিগ্রি শেষ করতে পারেননি তিনি।

এক শিক্ষার্থীর বাবা তার মেধায় এতটাই মুগ্ধ হন যে, তাকে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ ব্যাংক বেয়ার স্টার্নসের একজন জ্যেষ্ঠ অংশীদারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। চার বছরের মধ্যেই তিনি বেয়ার স্টার্নসের অংশীদার হন। ১৯৮২ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো’ গড়ে তোলেন।

ওই প্রতিষ্ঠান এক সময় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করতো। অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান এপস্টেইন। ফ্লোরিডায় প্রাসাদসম বাড়ি, নিউ মেক্সিকোতে র‍্যাঞ্চ এবং নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বাসভবনের মালিক হন তিনি। পাশাপাশি সেলিব্রিটি, শিল্পী ও রাজনীতিকদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন।

২০০২ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে প্রোফাইলের জন্য দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি জেফকে ১৫ বছর ধরে চিনি। দারুণ মানুষ। তিনি আরও বলেন, জেফ আমার মতোই সুন্দরী নারীদের পছন্দ করেন আর তাদের অনেকেই তুলনামূলক কম বয়সী।

২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় ১৪ বছর বয়সী এক মেয়ের বাবা-মা পুলিশকে জানান, জেফ্রি এপস্টেইন তাদের মেয়েকে পাম বিচে নিজের বাড়িতে যৌন নিপীড়ন করেছেন। পুলিশ বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য মেয়ের ছবি পায়।


মার্কিন দৈনিক দ্য মিয়ামি হেরাল্ড বলেছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর এপস্টেইনের নির্যাতন বহু বছর ধরেই চলছিল। পাম বিচ পুলিশের তৎকালীন প্রধান মাইকেল রাইটার সেই সময় দ্য মিয়ামি হেরাল্ডকে বলেছিলেন, ‘‘এটা কোনো ‘সে বলেছে–সে বলেছে’ ধরনের ঘটনা নয়। এখানে একজন ‘সে’ আর প্রায় ৫০ জন ‘সে’ ছিল—আর ওই ৫০ জনই মূলত একই গল্প বলেছেন।’’

২০০৭ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রোফাইল প্রতিবেদনে কলামিস্ট মাইকেল উলফ লেখেন, বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে এপস্টেইন কখনোই মেয়েদের বিষয়ে গোপনীয়তা রাখেননি।

‘‘এক পর্যায়ে, যখন তার ঝামেলা শুরু হয়, সে আমার সঙ্গে কথা বলছিল এবং বলেছিল, ‘আমি আর কী বলব, আমি অল্প বয়সী মেয়েদের পছন্দ করি।’ আমি তাকে বলেছিলাম, ‘হয়তো তোমার বলা উচিত—আমি তরুণী মেয়েদের পছন্দ করি।’’

তবে ২০০৮ সালে প্রসিকিউটররা হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক এপস্টেইনের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছান। এর ফলে তিনি ফেডারেল অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পান; যার শাস্তি হতে পারত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এর বদলে তিনি ১৮ মাসের কারাদণ্ড পান। এই দণ্ডকালীন তিনি সপ্তাহে ছয় দিনের প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে অফিসে যাওয়ার জন্য ‘ওয়ার্ক রিলিজের’ সুবিধা ভোগ করেন। ১৩ মাস পর তাকে প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া হয়।

এই কেলেঙ্কারির জেরে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাকোস্টা পদত্যাগ করেন। যদিও তিনি দাবি করেন, চুক্তির মাধ্যমেই অন্তত এপস্টেইনকে কিছুদিনের জন্য হলেও কারাগারে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।

২০০৮ সাল থেকে এপস্টেইন নিউইয়র্কের যৌন অপরাধীদের তালিকায় ‘লেভেল থ্রি’ হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন। এটি আজীবন বহাল থাকা একটি শ্রেণিবিভাগ, যার অর্থ পুনরায় অপরাধ করার ঝুঁকি তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বেশি বলে বিবেচনা করা হবে। দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও নিজের সম্পত্তি ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন এপস্টেইন।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে এপস্টেইনের সঙ্গে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের তৃতীয় ছেলে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর একটি ছবি প্রকাশিত হলে বিতর্ক শুরু হয়।

২০১৯ সালের নভেম্বরে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যান্ড্রু বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিন্ন করার জন্য ২০১০ সালে নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি স্বীকার করেন, ওই সফরে এপস্টেইনের বাড়িতে থাকা নিয়ে তিনি অনুতপ্ত এবং এতে তার ‘‘নিজের অবস্থান ক্ষুণ্ন হয়েছে।’’

তবে ২০১১ সালের ই-মেইল, যা পরে প্রকাশ্যে আসে, তাতে দেখা যায়—অ্যান্ড্রু এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন, যা তিনি আগে স্বীকার করেননি। পরবর্তী বিতর্কের জেরে ২০২৫ সালে তার রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করা হয়।

 চলুন দেখে নেওয়া যাক জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নতুন নথিকে প্রভাবশালী কার কার নাম উঠে এসেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

নথিপত্রে ট্রাম্প-সংক্রান্ত যৌন নিপীড়নের অভিযোগের তথ্য রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা কিছু অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। তবে কিছু অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। ট্রাম্প সব সময় এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অপরাধ করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। এ ছাড়া মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পও অভিনন্দন জানিয়ে এপস্টেইনকে ই–মেইল পাঠিয়েছিলেন।

বিল গেটস

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এপস্টেইন নিজেকেই একটি ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন। তাতে বিল গেটসের সঙ্গে স্ত্রী মেলিন্ডা গেটসের ‘বৈবাহিক সম্পর্কে দ্বন্দ্বের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ই-মেইলে লেখা, বিল গেটস বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। রুশ মেয়ে এবং বিবাহিত নারীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জন্য বিল গেটসকে সুযোগ তৈরি করে দিতে এপস্টেইন কাজ করেছেন।

ইলন মাস্ক

নথিপত্রে এপস্টেইন ও মাস্কের মধ্যে অনেক ই-মেইল আদান-প্রদানের তথ্য রয়েছে। ২০১২ সালের নভেম্বরে মাস্ককে একটি ই-মেইল পাঠান এপস্টেইন। সেখানে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘হেলিকপ্টারে করে আইল্যান্ডে কতজন আসবে?’ মাস্কের জবাব ছিল, ‘সম্ভবত শুধু তালুলাহ আর আমি। আপনার দ্বীপে সবচেয়ে উন্মত্ত পার্টি কোন দিন/রাতে হবে?’

রিচার্ড ব্র্যানসন

ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন ও এপস্টেইনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলে নথিপত্রে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এপস্টেইনকে পাঠানো এক ই-মেইলে ব্র্যানসন লিখেছেন, ‘গতকাল আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে সত্যিই দারুণ লাগল। যখনই আপনি এ এলাকায় আসবেন, আপনার সঙ্গে দেখা হবে বলে আশা করি। শর্ত হলো, আপনার হারেমকে (সঙ্গী) সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে।’

অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর

যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসরের নাম নতুন নথিতে রয়েছে। এক ই–মেইলে অ্যান্ড্রুকে এপস্টেইন লিখেছিলেন, ‘আমি কোন সময় এলে আপনার ভালো লাগবে…আমাদের একান্ত সময়ও প্রয়োজন হবে।’ অ্যান্ড্রু জবাবে লিখেছেন, ‘আমরা বাকিংহাম প্যালেসে রাতের খাবার খেতে পারি এবং ব্যাপক ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকবে।’

হাওয়ার্ড লুটনিক

প্রকাশ হওয়া ই-মেইলে দেখা গেছে, ব্যবসায়ী হাওয়ার্ড লুটনিক (বর্তমানে ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী) ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এপস্টেইনের ক্যারিবীয় দ্বীপে দুপুরের খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। লুটনিকের স্ত্রী এপস্টেইনের সহযোগীকে লিখেছিলেন, ‘আমরা সেন্ট থমাস থেকে আপনার দিকে আসছি।’ কোথায় নোঙর করতে হবে, তা-ও জিজ্ঞেস করেছেন তিনি।

ব্রেট র‍্যাটনার

নথিপত্রে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে তৈরি নতুন প্রামাণ্যচিত্রের পরিচালক ব্রেট র্যাটনারকে এক তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে। সেখানে জেফরি এপস্টেইনসহ আরেক তরুণীও ছিলেন। গত ডিসেম্বরে র্যাটনার, এপস্টেইন ও প্রয়াত ফরাসি মডেলিং এজেন্ট জঁ-লুক ব্রুনেলের যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছিল, এসব ছবিও একই জায়গায় তোলা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিল ক্লিনটন

এপস্টেইন-সংক্রান্ত নতুন নথিতে বিল ক্লিনটনের নামও রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট এপস্টেইনের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে চড়েছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে হোয়াইট হাউসে দেখা করেছিলেন। এ ছাড়া নথিতে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির সদস্য লর্ড পিটার বেঞ্জামিন ম্যান্ডেলসনের নাম রয়েছে। নথি প্রকাশের পর পদত্যাগ করেছেন তিনি।

পড়ুন : এপস্টেইন সম্পর্কিত লাখ লাখ নথি প্রকাশ, ট্রাম্পের নাম এসেছে শত শত বার

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন