বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষিকাজের সঙ্গে গরুর হালচাষ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শত শত বছর ধরে গরুই ছিল চাষাবাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, গরুর সংখ্যা কমে যাওয়া আর অস্বাভাবিক দামের কারণে আজ অনেক কৃষকই বাধ্য হচ্ছেন বিকল্প খুঁজতে। সেই বিকল্প এখন দেখা যাচ্ছে ঘোড়া দিয়ে হালচাষে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় এরকম ব্যতিক্রমী দৃশ্য সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামীণ জনপদে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, আগে সহজেই গরু ভাড়া পাওয়া যেত। ২ থেকে ৩ দিন গরু ভাড়া করলেই একটি জমির মৌসুমি চাষ শেষ করা যেত। কিন্তু বর্তমানে বাজারে গরুর দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে তা সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে। একজোড়া গরুর দাম এখন লাখ টাকার ওপরে। অনেকের পক্ষে সেই টাকা খরচ করে গরু কেনা বা ভাড়া করা একেবারেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক জমি অনাবাদী রাখার পরিবর্তে ঘোড়া দিয়ে চাষ শুরু করেছেন।
স্থানীয় কৃষক মো. আব্দুর রহমান বলেন, “আগে প্রতিবছর ভাড়া করা গরু দিয়েই জমি চাষ করতাম। এ বছর ভাড়া পাওয়া যায়নি, কিনতেও অনেক টাকা লাগে। তাই বাধ্য হয়েই আমার এক আত্মীয়ের ঘোড়া ধার করে জমি চাষ করেছি। খরচ কম হলেও ঘোড়ার জোর গরুর মতো নয়, তবে কাজ চালানো যাচ্ছে।”
আরেক কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, “ঘোড়ায় চাষে কষ্ট বেশি, কারণ ঘোড়ার শরীর ছোট ও গতি দ্রুত। গরু যেমন ধীর গতিতে জমি টানে, ঘোড়া তেমন নয়। তবুও বিকল্প না থাকায় এই উপায় বেছে নিতে হচ্ছে।”
স্থানীয় গ্রামবাসীর অনেকে বলছেন, ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ করা তাদের কাছে নতুন দৃশ্য। আগে শুধু গাড়ি টানতেই ঘোড়া দেখা যেত। এখন চাষাবাদে সেটি ব্যবহৃত হওয়ায় অনেকে বিস্মিত। শিশু ও তরুণরা ভিড় জমিয়ে ঘোড়ার হালচাষ দেখতে আসে।
আখাউড়া উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃষি জমিতে গরু দিয়ে হাল চাষ এখন নেই বললেই চলে। “গবাদি পশুর সংকট এবং অতিরিক্ত দামের কারণে কৃষকরা চরম সমস্যায় পড়েছেন। ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ করা অবশ্যই অস্বাভাবিক দৃশ্য, কিন্তু কৃষকের বাস্তবতা থেকে তারা এটা করতে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের পক্ষ থেকে কৃষকদের যান্ত্রিক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান পান।”
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকারিভাবে কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করা গেলে এ সমস্যা কিছুটা সমাধান হবে। অনেক কৃষক এখনও ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার ব্যবহারে আগ্রহী নন, কারণ এতে খরচ ও জ্বালানির সমস্যা জড়িয়ে আছে। তাছাড়া জমি ছোট ছোট আকারে বিভক্ত থাকায় অনেক সময় যন্ত্রপাতি ব্যবহারও সুবিধাজনক হয় না।
স্থানীয়রা মনে করছেন, কৃষককে বাঁচাতে হলে গরুর সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। নইলে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ হয়তো আপাত সমাধান হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো টেকসই সমাধান নয়।
মাঠে এখন গরুর বদলে ঘোড়ার হালচাষ যেন কৃষকের অসহায়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও কৃষকরা বলছেন—চাষাবাদ বন্ধ করে বসে থাকার চেয়ে বিকল্প কোনো উপায় বেছে নেওয়াই ভালো। বাস্তবতার তাগিদেই তাই গরুর জায়গা নিয়েছে ঘোড়া।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

