একসময় রেডিও বা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন এলেই মানুষ চ্যানেল বদলাত। কিন্তু একটি কণ্ঠ ছিল, যে কণ্ঠে বিরক্তিকর বিজ্ঞাপনও হয়ে উঠত শ্রুতিমধুর, মনে থেকে যাওয়ার মতো। সেই কণ্ঠই শ্রাবন্তী মজুমদার।
‘আয় খুকু আয়’- এই একটি গানেই বাঙালি বুঝে গিয়েছিল, এটি শুধু সংগীত নয়, সম্পর্কের গল্প। বাবার আদর, সন্তানের অপেক্ষা, দূরত্ব আর স্মৃতির মায়া-সবকিছু একসঙ্গে ধরা পড়েছিল তার কণ্ঠে।
বর্তমানে তিনি থাকেন আইরিশ সাগরের ছোট্ট দ্বীপ আইল অব ম্যান-এ। কিন্তু তার কণ্ঠ, তার স্মৃতি, তার গান রয়ে গেছে বাংলার ঘরে ঘরে-কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত। পাঁচ দশক পেরিয়েও শ্রাবন্তী মজুমদার তাই কেবল একজন শিল্পী নন, বাঙালির আবেগের ইতিহাস।
প্রায় পাঁচ দশক আগে প্রকাশিত ‘আয় খুকু আয়’ গানটি আজও বাঙালির আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ভি বালসারার সুরে গানটি গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদার।
শ্রাবন্তীর ভাষায়, গানটি মূলত তার পূজার অ্যালবামের জন্যই তৈরি হয়েছিল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গান গাওয়ার ইচ্ছা থেকেই এই ঐতিহাসিক যুগলবন্দি
মজার বিষয়, মুক্তির পর প্রথম দুই বছর গানটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। পরে মঞ্চে এককভাবে গানটি গাইতে শুরু করলে ধীরে ধীরে শ্রোতাদের আবদারে পরিণত হয় ‘আয় খুকু আয়’।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র দ্য ফাদার-এ গানটি ব্যবহারের পর নতুন প্রজন্মের কাছেও গানটি নতুনভাবে পরিচিত হয়। অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের বিষয়টি দুঃখ দিলেও, মানুষের আবেগে গানটির প্রভাব শ্রাবন্তীকে আবেগাপ্লুত করে।
বাবাকে হারানোর পর গানটির অর্থ আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন তিনি। বিদেশে বসে গানটি গাইতে গাইতে বহুবার চোখের জল ফেলেছেন-সে কথাও অকপটে স্বীকার করেন।
একসময় প্রসাধনী বা হেয়ার অয়েলের বিজ্ঞাপনে গান গাওয়াকে ‘লঘু’ কাজ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু শ্রাবন্তীর কণ্ঠ সেই ধারণা বদলে দেয়। গোপনে অডিশন দিয়ে জিঙ্গেল গাওয়া শুরু, সেখান থেকেই এইচএমভিতে গান রেকর্ড-তার কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্যই তাকে আলাদা করে তোলে।
সমালোচকদের মতে, শ্রাবন্তীর কণ্ঠে স্বাভাবিকভাবেই ছিল ‘ফিউশন’-আধুনিক, লোকগান, রোমান্টিক বা বিজ্ঞাপন-সবখানেই সাবলীল।
‘তুমি আমার মা… আমি তোমার মেয়ে’, ‘নাম বোলো না’, ‘মন আমার দেহঘড়ি’, ‘কলকাতার বউ ঢাকার জামাই’, ‘বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা’-বিভিন্ন ধারার গানে শ্রাবন্তীর কণ্ঠ রেখে গেছে নিজস্ব ছাপ।
২৫ বছর আগে কলকাতা ছেড়ে আইল অব ম্যানের রাজধানী ডগলাসে স্থায়ী হলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিই তার শিকড়। নিজেকে পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, আমি প্রথমত বাঙালি, দ্বিতীয়ত বাঙালি, শেষ পর্যন্তও বাঙালি।
আলী যাকের, ফকির আলমগীর, আসাদুজ্জামান নূর, রুনা লায়লা-বাংলাদেশের বহু শিল্পীর সঙ্গে কাজের স্মৃতি আজও উজ্জ্বল।
চট্টগ্রামে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা, সোলসের গান গাওয়া, আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণে শোক-সবই এখনো তার মনে গভীর দাগ কেটে আছে। বিশেষভাবে ফেরদৌসী রহমানের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে তিনি বলেন, তার গান আজও নিয়মিত শোনেন এবং দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ঢাকায় গান গাওয়া, মানুষের ভালোবাসা-সবই আজও তার কাছে জীবন্ত স্মৃতি। আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, বাংলাদেশে আবার যেতে চাই খুব।
পড়ুন: জকসু নির্বাচন: ফলাফলে এগিয়ে ছাত্র
দেখুন: ভারত সোনার মজুত এত বাড়াচ্ছে কেন?
ইম/


