কোনো নেতার ভাষণ বাজানো বা শোনানোর কারণে কাউকে হয়রানি করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণকে কেন্দ্র করে কেউ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটাক এমনটি চাননা বলেও ইঙ্গিত করেন তিনি। বলেন, ‘কোনো নেতার ভাষণকে কেন্দ্র করে কেউ এমন (অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা) করবে আমরা সেটি চাইনি।’
বুধবার (১১ মার্চ) বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ : নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ফজলু ভাই (সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান) যেটি বলেছেন, এখনো একটি বক্তৃতার বিষয় নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। আমি এগুলোর কোনো জবাব দিতে চাই না। আমাদের যে সামাজিক পরিস্থিতি ও পলিটিক্যাল কালচার, এটিকে আমরা ক্রমান্বয়ে উন্নত করার চেষ্টা করবো। কিন্তু ওভারনাইট (রাতারাতি) এই পলিটিক্যাল কালচারে শতভাগ ডেমোক্রেটিক কালচারে আসতে পারিনি। আপনি যেটা আশা করছেন, সেটি ইনশাল্লাহ একদিন আমরা পারবো। কিন্তু সেটির জন্যে আমাদের সময় লাগবে। আমরা শতভাগ ডেমোক্রেটিক কালচারে আসতে চাই।’
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশের অধিকাংশই সরকার গ্রহণ করবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব অধ্যাদেশের কিছু হয়তো হুবহু গ্রহণ করা হবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন এনে সংসদে বিল আকারে পাস করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, কোনো কিছু করার ক্ষেত্রে জোরজবরদস্তি করা, জাতির জন্যে ভালো ফল নিয়ে আসে না। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকগুলো অধ্যাদেশ আমরা পাস করতে পারবো। আমরা তাদের অনেকগুলো অধ্যাদেশ গ্রহণ করতে পারবো। আবার কিছু নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। কারণ ৩০ কার্যদিবস নয়, ৩০ দিনের মধ্যে এগুলো পাস করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘যেগুলো পারবো না, সেগুলো পরবর্তী সেশনে আমরা বিল আকারে উত্থাপন করবো। মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশটিও সংসদে আলোচনায় আসবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছাক। তবে বাস্তবতা বিবেচনায় আমাদের কিছুটা সময় ও সুযোগ দরকার।’
জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করা হবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া আছে। অনেক দফাতে অনেক দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। আমরাও দিয়েছি। সেখানে বলা আছে, যদি নির্বাচনের ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করবো। জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয় সে সমস্ত দলসমূহ সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবে। সেই অনুযায়ী ৭০ অনুচ্ছেদের কথা আমরা বলছি। আমরা চারটা বিষয়ে সম্মত। কিন্তু অনেকজন দুটো বিষয়ে সম্মত হয়েছে। অর্থবিল ও আস্থাভোট। এই দুইটা বাদে বাকি সব বিষয়ে এমপিরা স্বাধীন। আমরা বলেছি না; আরও দুইটা বিষয়ে পরাধীন, একটা হচ্ছে সংবিধান সংশোধনী, আরেকটা হচ্ছে যদি দেশ যুদ্ধ পরিস্থিতি কখনো হয় সেই সময় যে আইন আসবে সেটা দলের পক্ষে থাকবে। এই চারটা বিষয় বাদে বাকি বিষয়ে এমপিরা স্বাধীন। আমাদের চারটা বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট ছিল। এখন আমরা ম্যান্ডেট পেয়েছি, আমরা ইশতেহার উল্লেখ করেছি; সুতরাং আমরা ওভাবেই যাব।
তিনি বলেন, এখন আমাদের যদি বলা হয়, যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আপনারা শপথ নেন নাই কেন? আমরা বলবো আপনারা নিয়েছেন কেন? কেননা আমাদের এখানে একটা ব্যালট ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। সেই ব্যালটে সংসদ সদস্য প্রার্থীদের মার্কা ছিল। সেই মার্কাতে জনগণ ভোট দিয়েছে। আমরা সংসদ সদস্য হয়েছি। আমাদের ইশতেহার অনুসারে আমরা ম্যান্ডেট প্রাপ্ত হয়েছি। আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে, সে ম্যান্ডেট অনুসারে সার্বভৌম জাতীয় সংসদে আমরা প্রতিনিধিত্ব করবো। এখানে কোনো ব্যালটে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে ভোট হয় নাই।
তবে গণভোট আমরা মান্য করি, সম্মান দিই। সেটা সংসদে আসতে হবে। সংসদে আলোচনা করবো এবং সবাই যদি সম্মত হয় সংবিধানে গৃহীত হয়, তখন সেটা শপথ নেওয়া প্রশ্ন আসবে। কোন ফর্মে নেওয়া হবে, কে শপথ গ্রহণ করাবেন তখন সেভাবে যাবে। আমরা এভাবেই রাজনৈতিক চর্চাটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংসদে থেকেই চালিয়ে যাবো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়নি? হয়েছে। যদি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আমরা ‘এভরিথিং ইজ ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার বলি, ইন পলিটিক্স বলি। তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। যারা আমাদের উপরে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, ম্যাসাকার করেছে, মাস কিং করেছে। যাদের গুলিতে চৌদ্দ শ’র বেশি মানুষ শহীদ হয়েছে আমাদের ছাত্র-জনতা। তাদের বিরুদ্ধে আজকাল কিছু কিছু আওয়াজ হচ্ছে যে তাদের কি মামলা করার অধিকার নাই? কেন আপনারা ইন্ডেমনিটি দিলেন? কেন জুলাই জাতীয় সনদের একটা দফার মধ্যে তাদের ইন্ডেমনিটি দেওয়া হলো?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তুলে বলেন, এটা কি আপনি হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন ধরবেন? যুদ্ধের ময়দানে যারা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তাদের বিরুদ্ধে যদি আমার কোনো কর্মকাণ্ড হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন অন্তর্ভুক্ত হয়, সেটা তো এভরিথিং ইজ ফেয়ার, ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার। সেজন্য সেই ইন্ডেমনিটিকে আমরা সমর্থন করেছি।
‘এখন যদি বলা হয় যে তাদের মামলা করতে দিতে হবে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারকে হত্যা করার দায়ে কি এখন মামলা করা যাবে? অনেকটা সেরকম। সুতরাং এক্সেপশন সব জায়গায় আছে। আমরা সবকিছুকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলতে পারবো না।’
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমরা যেভাবে আমাদের জুলাই যোদ্ধাদের ইন্ডেমনিটি দিয়েছি। সেটাতে আমাদের সম্মত থাকতে হবে। কারণ আমরা সবাই জাতীয়ভাবে ঐকমত্য পোষণ করেছি। জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামায় আমরা স্বাক্ষর করেছি।
সংলাপে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পঞ্চগড়-১ এর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির, টাঙ্গাইল-৮ এর সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি, কিশোরগঞ্জ-৪ এর সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
পড়ুন : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের নিন্দা এনসিপির


