রিপোর্টে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক দেখে অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। মনে করেন, হৃদরোগের ঝুঁকি একেবারেই নেই। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টা এতটা সরল নয়। রক্তে কোলেস্টেরল কম থাকলেও হৃদরোগের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা যায় না। বরং হৃদযন্ত্রের অসুখের পেছনে রয়েছে একাধিক নীরব কারণ, যেটা আমরা অনেকেই জানি না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা সিভিডি বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। শুধু ২০২২ সালেই প্রায় এক কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে, যা মোট বৈশ্বিক মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। এই বিপুল সংখ্যার পেছনে কেবল কোলেস্টেরল নয়, জড়িত রয়েছে জীবনযাপন, পরিবেশ ও জেনেটিক নানা বিষয়।
কোলেস্টেরল আসলে কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
কোলেস্টেরল হলো চর্বিজাতীয় এক ধরনের পদার্থ, যা মানবদেহের প্রতিটি কোষে রয়েছে। হরমোন তৈরি, ভিটামিন ডি উৎপাদন ও কোষের গঠন ঠিক রাখতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোলেস্টেরল মূলত যকৃতে তৈরি হয়, তবে মাংস, দুধ, দুগ্ধজাত খাবারসহ প্রাণীজ খাদ্য থেকেও এটি শরীরে প্রবেশ করে।
কোলেস্টেরল সাধারণত দুই ধরনেরলো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এলডিএল) ও হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এইচডিএল)। এলডিএলকে বলা হয় ‘খারাপ কোলেস্টেরল’, কারণ এর মাত্রা বেশি হলে ধমনীর দেয়ালে চর্বি জমে প্লাক তৈরি হয়। এতে রক্ত চলাচলের পথ সরু হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, এইচডিএল বা ‘ভালো কোলেস্টেরল’ ধমনীর ভেতর থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরিয়ে লিভারে পাঠাতে সাহায্য করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচডিএল থাকলেই যে এলডিএল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে তা নয়। কারণ এইচডিএল রক্তের কোলেস্টেরলের একটি অংশই কেবল বহন করে।
ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনের মতে, বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি)। একইসঙ্গে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে যে পরিমাণ মৃত্যু হয় তার ৮৫ শতাংশের মূল কারণ হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। ২০২১ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে এক কোটি ৮০ লাখ অকাল মৃত্যুর মধ্যে (৭০ বছরের কম বয়সের) কমপক্ষে ৩৮ শতাংশ মৃত্যুর কারণ সিভিডি। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাই সিভিসি কী কারণে তৈরি হয়? আর কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেই কি আমাদের হার্টও সুস্থ বলে ধরে নেয়া উচিত?
চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগের জন্য কেবল উচ্চ কোলেস্টেরল দায়ী নয়। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও মানসিক চাপ সব মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মূলচাঁদ হার্ট সেন্টারের সহযোগী পরিচালক ও প্রধান অধ্যাপক ডা. কুমার জানান ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক এখন আর বিরল নয়। এমনকি মোট হার্ট অ্যাটাকের ২৫–৩০ শতাংশ ঘটছে ৪০ বছরের নিচে বয়সীদের মধ্যে।
ট্রাইগ্লিসারাইড ও অন্যান্য লুকানো ঝুঁকি
কোলেস্টেরলের পাশাপাশি শরীরে আরেক ধরনের চর্বি থাকে ট্রাইগ্লিসারাইড। এটি খাবার থেকে পাওয়া অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে। তবে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি হলে, তার সঙ্গে যদি এলডিএল বেশি বা এইচডিএল কম থাকে, তাহলে হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
আবহাওয়া ও পরিবেশও দায়ী
হৃদরোগের ঝুঁকিতে আবহাওয়া ও পরিবেশের বড় ভূমিকা রয়েছে। গবেষণা বলছে, শীতকালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। ঠান্ডায় রক্তনালি সংকুচিত হয়, রক্ত ঘন হয়ে যায়, ফলে হার্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহও হার্টের জন্য ‘স্ট্রেস’ তৈরি করে, যা অনেক সময় মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
বায়ু দূষণও একটি বড় ঝুঁকি। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকলে ধমনীর দেয়ালে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে, পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
ঝুঁকির পূর্বাভাস
কোলেস্টেরল ছাড়াও আরও কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো হৃদরোগের ঝুঁকির পূর্বাভাস দেয়। ডা. সমীর গুপ্তা জানিয়েছেন অ্যাপো বি লেভেল টেস্ট বা অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন বি টেস্টের মাধ্যমে এই ঝুঁকির বিষয়ে জানা যেতে পারে। এর মাধ্যমে রক্তে এলডিএল-এর সঠিক সংখ্যা জানায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি আছে কি না সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়। এছাড়াও রয়েছে লাইপোপ্রোটিন (এ) টেস্ট । লাইপোপ্রোটিন (এ) এলডিএল কোলেস্টেরলের একটি জেনেটিক রূপ যা এথেরোস্ক্লেরোসিস, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।
হিমোগ্লোবিন এ ওয়ান সি টেস্টও গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষা গত দুই-তিন মাসের রক্তে উপস্থিত গড় শর্করার পরিমাণের বিষয়ে তথ্য দেয়। অন্যদিকে, সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিনের মাত্রা অটোইমিউনো ডিজিজ (লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস) এবং হৃদরোগের ঝুঁকিকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কোলেস্টেরলের রিপোর্ট দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত ব্যায়াম সবকিছু মিলিয়েই হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখা সম্ভব। অর্থাৎ কোলেস্টেরল কম থাকাটা ভালো খবর, তবে সেটাই শেষ কথা নয়। হৃদরোগের ঝুঁকি বুঝতে হলে পুরো শরীর ও জীবনযাপনের দিকটাই একসঙ্গে নজরে রাখতে হবে।
পড়ুন: সজল আলীর বিয়ের গুঞ্জন, ভক্তদের উচ্ছ্বাস
দেখুন: ছোলা বিরিয়ানি বিক্রি করে ঢাকায় বাড়ি কিনেছেন ইদ্রিস
ইম/


