ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচতে আকাশে সর্বাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে যুক্তরাষ্ট্র। কোনো আক্রমণই আমেরিকার মাটিতে আছড়ে পড়বে না। সুরক্ষিত থাকবেন মার্কিন নাগরিকরা।
মঙ্গলবার (২০ মে) এই ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিবিসি, রয়টার্স, এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর মেয়াদকালে দেশে নির্মিত হবে এক ‘পরবর্তী প্রজন্মের’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার নাম “গোল্ডেন ডোম”। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ যেমন আছে, তেমনি আশার আলোও দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
গোল্ডেন ডোম তৈরি হবে একাধিক স্তরে স্থল, সমুদ্র ও মহাকাশে। এতে থাকবে উন্নত সেন্সর ও ইন্টারসেপ্টর, যা শুধু ICBM নয়, শব্দের গতির চেয়েও দ্রুতগামী হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ মিসাইল প্রতিহত করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতির এক যুগান্তকারী ধাপ। যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে আকাশেই প্রতিহত করতে পারবে এবং এর সাফল্যের হার শতভাগ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প জানিয়েছেন এর জন্য বরাদ্দ থাকবে ১৭৫ বিলিয়ন ডলার, যার ২৫ বিলিয়ন ইতিমধ্যেই বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের মতে, শুধু মহাকাশভিত্তিক অংশের খরচই হতে পারে প্রায় ৫৪২ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, EMP বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস থেকে সুরক্ষা দিতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে পড়তে পারে। বিমান থেকে শুরু করে পানির সরবরাহ পর্যন্ত সব বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এমন ভয়াবহতা ঠেকাতে আংশিকভাবে তৈরি একটি গোল্ডেন ডোমও হতে পারে জীবনরক্ষা ব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থা প্রধানত আলাস্কা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থাপিত ৪৪টি গ্রাউন্ড-ভিত্তিক ইন্টারসেপ্টরের ওপর নির্ভর, যা সীমিত হামলা প্রতিরোধে সক্ষম। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশ থেকে একযোগে আসা শত শত ICBM ও হাজার হাজার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মুখোমুখি হলে এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অপ্রতুল।
বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. স্টেইসি পেটিজন বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল উত্তর কোরিয়ার জন্য। এটি রাশিয়ার মতো বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার তো দূরের কথা, এমনকি চীনের ছোট আকারের ভাণ্ডার সামলাতেও পারবেনা।”
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (CBO) বলেছে, “মিনিমাম প্রতিরক্ষা” গড়তেও “শত শত বা হাজার হাজার” মহাকাশভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন হবে, যার ব্যয় হবে বিপুল। CBO-এর হিসেব বলছে, কেবল মহাকাশভিত্তিক অংশেই ব্যয় হতে পারে ৫৪২ বিলিয়ন ডলার, ২০ বছরে। ফলে পুরো প্রকল্প শেষমেশ বিশাল মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় একটি অংশ খেয়ে ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ পাত্রিশিয়া বাজিলচিক বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “গোল্ডেন ডোম আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নীতিকে আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর দিকে পুনঃমুখী করে। আমাদের শত্রুরা দীর্ঘ-পাল্লার হামলা সক্ষমতা অর্জনে বিনিয়োগ করছে, যেগুলো সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।”
তবে চীন ও রাশিয়া এর কড়া সমালোচনা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই উদ্যোগ মহাকাশকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ বানিয়ে দিতে পারে।
গোল্ডেন ডোম নিয়ে চলতি বছর মার্চে প্রথম কথা বলেছিলেন। কংগ্রেসে দেয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের আয়রন ডোমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেছিলেন, “ইসরায়েলের এটা আছে, অন্য দেশেও আছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে কেন থাকবে না?”
ইসরায়েরের আয়রন ডোম ২০১১ সাল থেকে ছোট পরিসরের রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বাজিলচিক জানান, আয়রন ডোম মূলত গাজা বা দক্ষিণ লেবানন থেকে উৎক্ষেপণকৃত রকেট এর মতো “নিম্নস্তরের” হুমকির জন্য তৈরি। গোল্ডেন ডোম আরও দূর-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ উচ্চপর্যায়ের হুমকি শনাক্ত করতে পারবে।
‘গোল্ডেন ডোম’ যদি বাস্তবায়ন হয়, তবে এটি হবে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে তার আগে একে পার হতে হবে প্রযুক্তিগত জটিলতা ও রাজনৈতিক সমালোচনার বহু ধাপ।
পড়ুন: ভারতে আইফোন তৈরি নিয়ে অ্যাপলকে হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প
দেখুন: ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা, ট্রাম্প-মোদি সম্পর্কে ফাটল?
এস


